Published : 11 Oct 2025, 11:36 PM
ঋতু হিসেবে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে শরৎ, তেমনি শরৎকে কেন্দ্র করে আয়োজিত উৎসবও সংকুচিত হচ্ছে। একদিকে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, কাশফুল বিলীন হচ্ছে; অন্যদিকে শরতের উৎসব নিয়ে চলছে রাজনীতির খেলা। উভয় ক্ষেত্রেই দায়ী মানুষের নিয়ন্ত্রণলিপ্সা।
কথাগুলো মনে এল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎ উৎসব আয়োজনের খবর শুনে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর শরৎ উৎসব আয়োজনের অনুমোদন বাতিল করে আলোচনার সূত্রপাত করে। গত দুদিন ধরে এ নিয়ে যথেষ্ট জল ঘোলা করার পর চারুকলার ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম আজ বললেন, উৎসবটি এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শরতের একটি উৎসব করতেই পারে। তবে সেটা করার জন্য সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর শরৎ উৎসব বন্ধ করে দেওয়ার দরকার ছিল কোনো? একটি উৎসব বন্ধ করে আরেকটি উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে বলেই প্রশ্ন ওঠেছে এ কী সত্যিই শরতের আয়োজন, নাকি কর্তৃত্বের প্রকাশ?
শরৎ উৎসব কোনো ধর্মীয় আচার বা জাতীয় দিবস নয়। তাই এই উৎসব পালনের কোনো বাধ্যবাধকতা যেমন নেই, তেমন রহিম পালন করলে, রাম করতে পারবে না–এমনও নয়। দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি, প্রকৃতি কোনো ধর্ম, দল বা সংগঠনের সম্পত্তি নয়। শরৎকে দখল করা যায় না। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নয়, একে অন্যকে পরাজিত করার আনন্দে উৎসব বন্ধ এবং আয়োজন করি।
সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর শরৎ উৎসব আয়োজকদের কোনো একজনকে কেন্দ্র করে যদি আপত্তি ওঠে তার সমাধান কি উৎসব বন্ধ করে দেওয়ায়? নিশ্চয়ই না। উৎসব বন্ধ না করেও এর নিষ্পত্তি করা সম্ভব। চারুকলা অনুষদ ওই দূরদর্শিতার পরিচয় না দিয়ে সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার পথ বেছে নিল। অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগ দুটিকে নিয়ে ডাকসুর সহযোগিতায় এই উৎসব করবে বলে সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে।
হেমন্তের দুয়ারে দাঁড়িয়েও যখন প্রতিদিন বর্ষার মতো বৃষ্টি নামে, তখন মনে হয়—ঋতুর হিসাবপত্র যেন আমরাই গুলিয়ে ফেলেছি। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা নয়, কালো মেঘের ঘনঘটা বেশি। শরতের এই রূপবদলে আমরা উৎকণ্ঠিত হলেও প্রতিবছর শরৎ উৎসবের আয়োজন করি। ভাবছেন উৎসব আয়োজনে সমস্যা কোথায়? কোনো সমস্যা নেই। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শরৎ উৎসবের প্রচার দেখেই বুঝতে পারি এখন শরৎ ঋতু চলছে। এটাও কম কীসে। কাউকে না কাউকে তো মনে করিয়ে দিতেই হবে।
কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন দেখি এই উৎসবকেও জড়িয়ে ফেলা হয় রাজনীতির জালে। সবসময় যে মব জনতা এসব কাণ্ডকীর্তি করছে এমন নয়, কখনও কখনও মবকে ডেকে আনেন সংস্কৃতিকর্মীরাই, যারা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ক্ষমতাবান হয়েছেন। ক্ষমতা নাকি ব্যবহার না করলে জং ধরে, অতি ব্যবহারে যে পালাতেও হয়–হাসিনাসহ তার সাঙ্গপাঙ্গরা পালিয়ে প্রমাণ করেছেন।

চারুকলার বকুলতলায় সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজিত শরৎ উৎসব ১৯ বছরের ধারাবাহিক ঐতিহ্যের অংশ। গতবছর ৫ অগাস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পরও উৎসবটি হয়েছে এই বকুলতলাতে। চারুকলার বকুলতলা শুধু একটা অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা নয়—এটি বাংলাদেশের নাগরিক সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। বর্ষা, শরৎ, বসন্ত—প্রতিটি ঋতুতে এখানে নানান ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনের দেখা মেলে। এবারও সেখানে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ষড়ঋতু উদযাপন জাতীয় পর্ষদ’ নামে নবগঠিত একটি সংগঠন নানা শ্রেণি ও বর্ণের মানুষকে নিয়ে নাচ, গান, কবিতা আর কথামালায় ‘সবার বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে শরৎ উৎসব করেছে।
তাহলে প্রশ্ন আসে, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর ধারাবাহিক আয়োজনে ছন্দপতন ঘটাতে হল কেন? তারা তো আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ করে এনেছিল, যথাযথ অনুমতি নিয়েছিল, চারুকলায় বকুলতলার ভাড়াও পরিশোধ করেছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর আগের রাতে চারুকলা অনুষদ বলল, “অনেকের আপত্তি এসেছে, তাই অনুষ্ঠান করতে দেওয়া যাবে না।” এই ‘অনেকের আপত্তি’ বাক্যটাই যেন সবচেয়ে রহস্যময় ও প্রতীকী। কারণ, এই ‘অনেক’ কারা, তা স্পষ্ট করে জানা যায় না।
‘ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক, সাংবাদিক ও শিল্পীসমাজ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছে বলে বলেছেন চারুকলার ডিন। এই প্লাটফর্মের নেতৃত্বে কারা, তা-ও স্পষ্ট করা হয়নি। শুধু একটি অদৃশ্য শব্দের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে ভয়, রাজনীতি আর নীরবতা এবং এতেই বোঝা যায়, এটা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়।
চারুকলা অনুষদের যুক্তি, ‘গোলযোগের আশঙ্কা’ রয়েছে। অথচ এই একই উৎসব গত বছর যখন হয়েছিল, তখন রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল আরও তীব্র। তখন কোনো গোলযোগ হয়নি। এবার, তুলনামূলক শান্ত সময়েও, হঠাৎ এই আশঙ্কা কতটা যুক্তিসঙ্গত? আবার আয়োজকদের একজনকে বলা হচ্ছে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’। অথচ গতবছরের আয়োজনেও এই একই আয়োজক যুক্ত ছিলেন। এই ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ বা ‘গোলযোগের আশঙ্কা’ এখন একটি রাজনৈতিক পরিভাষা—যা ব্যবহার হয় সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণের পরোক্ষ হাতিয়ার হিসেবে। ভয় দেখিয়ে, অনিশ্চয়তার মুখোশ পরে, শিল্পের জায়গা সংকুচিত করা হয়—আইনের প্রয়োগ ছাড়াই।
আমরা বারবার দেখেছি—এই একই যুক্তিতে নাটক বন্ধ হয়েছে, কবিতা পাঠ স্থগিত হয়েছে, ঐতিহ্যবাহী মেলা বাতিল হয়েছে, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাও স্থগিত হয়েছে। কারণ, ‘গোলযোগ হতে পারে’–এ যেন এক ধরনের অদৃশ্য সেন্সরশিপ, যেখানে কোনো লিখিত নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু ভয়ের আবহ রয়েছে।
বাংলাদেশে সংস্কৃতি বরাবরই রাজনীতির ছায়ায় বেঁচে থাকে। কখনো নাটক ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বলে বন্ধ হয়েছে, কখনো কবিতা ‘অনৈতিক’, কখনো গান ‘ধর্মবিরোধী’। এবার সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর শরৎ উৎসবও ওই দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হল। বিষয়টি কেবল একটি অনুমতির প্রশ্ন নয়; এটি আসলে সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি।
এই রাজনীতি যেমন প্রকৃতিকে ধ্বংস করে জলবায়ু সংকট সৃষ্টি করেছে, তেমনি সংস্কৃতিতেও তার প্রতিচ্ছবি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তন প্রকৃতিকে মেরে ফেলছে ধীরে ধীরে, আর সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ ওই একই হাতেই মেরে ফেলছে শিল্পের প্রাণ।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলাদেশে সংস্কৃতি অঙ্গনেও দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত দ্বৈততা। কিছু সংগঠন সহজে অনুমতি পাচ্ছে, কিছু পাচ্ছে না। কারও আয়োজনকে বলা হচ্ছে ‘প্রগতিশীল’, কারওটিকে বলা হচ্ছে ‘সংবেদনশীল’। অর্থাৎ, কে আয়োজন করছে, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কী—তার ওপর নির্ভর করছে অনুমতির ভাগ্য। এভাবেই সংস্কৃতি এখন হয়ে উঠেছে ক্ষমতার কুসুম-কোমল রাজনীতি—যেখানে গান, নাটক, উৎসব, চিত্রকলা—সবই রাজনৈতিক আনুগত্যের অংশ।
‘ষড়ঋতু উদযাপন জাতীয় পর্ষদ’ প্রথমবারের মতো যে শরৎ উৎসবটি করেছিল, আমি নিজেও ওই উৎসবে গিয়েছিলাম। আয়োজকদের একজন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু; তার কাছ থেকেই শুনেছি, তারা পরিকল্পনা করছেন প্রতি ঋতুতেই সারা দেশে পর্যায়ক্রমিকভাবে এমন উৎসব আয়োজনের। ভাবনাটা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ।

জ শনিবার সকালেও আসাদ গেইটের সেন্ট যোসেফ স্কুল প্রাঙ্গণে শরৎ উৎসবের আয়োজন করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। তারা বলেছে, “এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে চায়।” এটিও আশা জাগানিয়া।
এমন উৎসব আয়োজন যদি একাধিক সংগঠন হাতে নেয়, তাহলে তা নিছক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং ঋতুচেতনা ও প্রকৃতিপ্রেমের বার্তা আরও জোরালোভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। সমাজে এমন উদ্যোগই প্রয়োজন, যা বৈচিত্র্যের ভেতর ঐক্যের সুর তোলে।
সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর বরাদ্দ বাতিল, 'শরৎ উৎসব' করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শরৎ উৎসব বাতিল নয়, 'স্থগিত': চারুকলার ডিন
এবার গেন্ডারিয়ায় পুলিশের বাধা, বন্ধ হল 'শরৎ উৎসব'
'আপত্তি' ওঠায় চারুকলায় হচ্ছে না শরৎ উৎসব