Published : 29 Apr 2026, 03:34 PM
নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়ে প্রাথমিক শোরগোল একটু থিতিয়ে এলেও এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মরণফাঁদগুলো ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার এক মহাপরিকল্পনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। অথচ একটি আদর্শ বাণিজ্য চুক্তির মূল শর্ত হওয়া উচিত পারস্পরিক সুবিধা ও সমতা, কিন্তু এই চুক্তির পাতায় পাতায় সেই নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন পরিলক্ষিত হয়।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক আইনের সাধারণ নীতি অনুযায়ী, বাণিজ্য চুক্তিকে দেশের শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির পরিপোষক হতে হয়। কিন্তু যখন একটি চুক্তি এর বাইরে গিয়ে একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখন তাকে আর স্বাভাবিক বাণিজ্য চুক্তি বলা যায় না।
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তড়িঘড়ি করে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির সময় এবং প্রক্রিয়া উভয়ই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চুক্তিটির শর্তাবলি এবং এর ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে সরকারের মধ্যে ও বাইরে তীব্র মতবিরোধ ও ক্ষোভ বিদ্যমান।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও জোট-নিরপেক্ষতার ঐতিহ্য
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’—এই মূলনীতি অনুসরণ করে এসেছে। জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের একটি সক্রিয় সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন পরাশক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেছে। এই নীতির সুফল হিসেবে বাংলাদেশ একই সময়ে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত—সবার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক রক্ষা করতে পেরেছে।
‘বাংলাদেশ এতদিন বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়েছে। অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক; রপ্তানি বাজার, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা—এই দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্যেই আমাদের কূটনীতি গড়ে উঠেছে।’ বর্তমান বাণিজ্য চুক্তির শর্তাবলির মাধ্যমে এই ভারসাম্যকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তির শর্তাবলি ও বিধিনিষেধ

এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করা হয়েছে, যা সরকারের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে:
১. বাংলাদেশকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে। বিমান কর্তৃপক্ষকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে মার্কিন বোয়িংকে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে হবে। ২. আগামী ১৫ বছরে ১,৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের তেল মার্কিন উৎস থেকে কিনতে হবে। ৩. প্রতি বছর ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কৃষিপণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে। ৪. মার্কিন সামরিক পণ্য ক্রয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। ৫. কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত রাখতে হবে। ৬. মার্কিন পণ্যে কোনো কোটা আরোপ করা যাবে না এবং অশুল্ক বাধা (Non-Tariff Barriers) দূর করতে হবে। ৭. মার্কিন পণ্যের সঙ্গে দেশীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় সুবিধাজনক অবস্থায় না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. দেশীয় শিল্পে সরকারি ভর্তুকি দেওয়া সীমিত বা বাতিল করতে হতে পারে, যার ফলে গার্মেন্টস, কৃষি ও পোলট্রি শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ৯. যুক্তরাষ্ট্রের সুতা ও তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকে পাল্টা শুল্ক না বসানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ১০. ৬,২১০টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। ১১. মার্কিন পণ্যের মান ও মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে, যদিও তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করুক বা না করুক।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি করার ফলে বাংলাদেশের পণ্যে শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে বাংলাদেশকে যে মূল্য দিতে হবে তা অনেক বেশি। চুক্তির এই সকল শর্তাবলির কারণে বাংলাদেশের স্বাধীন বাণিজ্য নীতি প্রণয়নের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রকে এই সুবিধা দেওয়ার কারণে ডব্লিউটিওভুক্ত দেশগুলোকেও একই সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।
চুক্তির ধারা ৪-এর ১, ২ ও ৩ উপধারায় বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ যদি এমন কোনো দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করে যারা বাজারমূল্যের চেয়ে কমে পণ্য বিক্রি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশকে তা মেনে চলতে হবে এবং সে অনুযায়ী রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হবে। বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি কিনতে পারবে না যারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করে।
এই বিধানের একটি তাৎক্ষণিক উদাহরণ হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প। রাশিয়ার রোসাটম কর্তৃক নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম সরবরাহ অপরিহার্য। চুক্তির এই বিধান কার্যকর হলে প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। এমনিতেই দেশে ২,৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে; রূপপুর জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে এই সংকট অনেকটাই কমার সম্ভাবনা ছিল।
অর্থনৈতিক ক্ষতির খাতওয়ারি বিশ্লেষণ
১. গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির মতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। WTO-র ‘Most-Favoured-Nation’ (MFN) নীতির আওতায় মার্কিন পণ্যে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হবে, তা অন্য সদস্য দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে—ফলে সামগ্রিক রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
২. প্রতি বছর ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের কৃষি, ডেইরি ও পোলট্রি খাতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বৃহদাকার শিল্পায়িত খামার ব্যবস্থায় উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক এবং মিল্কভিটার মতো প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না। এর ফলে লক্ষাধিক কৃষক পরিবার জীবিকা হারাবে এবং দেশীয় খাদ্য উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাবে।
এছাড়া জিনগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বাধা অপসারণের শর্ত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জিএম ফসলের বীজ ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলে কৃষকের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় বীজ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে এবং তারা বহুজাতিক বীজ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে—এই ঘটনা বিশ্বের অনেক দেশেই ঘটেছে।
৩. বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ সরবরাহ করে এবং এই খাতে প্রায় ৪২ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত, যাদের বেশিরভাগই নারী। সরকার ঐতিহ্যগতভাবে এই খাতে রপ্তানি প্রণোদনা, নগদ সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করে আসছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দেশীয় শিল্পে ভর্তুকি দেওয়া সীমিত হলে, গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাবে এবং এই বিশাল কর্মশক্তির জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।
৪. চলমান জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কেনার সুযোগ খুঁজছিল। কিন্তু এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে এমন কোনো কেনাকাটায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হবে। বাস্তবেও তাই ঘটেছে। রাশিয়া থেকে তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পর মাত্র ৬০ দিনের 'ছাড়পত্র' পাওয়া গেছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এটি কার্যত পরাধীনতার নামান্তর।
ভূরাজনীতি: চীন ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল
‘চুক্তির শর্ত যদি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য রাখতে বাধ্য করে, তবে চীন বা অন্য অংশীদারের সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি সহযোগিতা জটিল হতে পারে। অর্থনৈতিক চুক্তি তখন নিরাপত্তা রাজনীতির একটি উপাদানে পরিণত হয়।’
এই চুক্তিকে শুধু একটি অর্থনৈতিক বোঝাপড়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন কর্তৃত্ব বজায় রাখা এবং চীনের অর্থনৈতিক-প্রযুক্তিগত প্রভাব সীমিত করাই এই চুক্তির মূল কৌশলগত লক্ষ্য। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশীদার এবং চীনা বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে কার্যত মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের একটি সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যদিও বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সামরিক জোটের অংশ নয়।
তুলনামূলক পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে এবং ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। একটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে ভারতের পক্ষে এই কৌশলগত স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। ক্ষুদ্র অর্থনীতির বাংলাদেশের জন্য এই স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।
জাতীয় স্বার্থের বিপক্ষে হওয়ায় মালয়েশিয়া সরকার এই চুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেছে। ভারত চুক্তিটি স্থগিত রেখেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও চুক্তির শর্তে রাজি না হয়ে বেরিয়ে এসেছে। এই তিনটি শক্তিশালী অর্থনীতির এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তারা যদি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এই পদক্ষেপ নিতে পারে, বাংলাদেশ কেন পারবে না?
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন অনুযায়ী, চুক্তিতে ৬০ দিনের নোটিশে চুক্তি বাতিলের বিধান থাকলেও তা নির্দিষ্ট শর্ত ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই করতে হবে। এটি করলে বড় অঙ্কের জরিমানা ও ক্ষতি হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তির অধীনে থেকে যে ক্ষতি হবে, তার সঙ্গে স্বল্পমেয়াদী ক্ষতির তুলনামূলক হিসাব করা প্রয়োজন।
গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন
নির্বাচনের তিনদিন আগে এই ধরণের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি অনির্বাচিত সরকারের এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হওয়ার নৈতিক ও সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়েও বিতর্ক আছে।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যমন্ত্রী হওয়ার পর খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, চুক্তির প্রতিটি ধারা দেশের স্বার্থ বিবেচনায় পর্যালোচনা করা হবে। কিন্তু বাস্তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কেনাকাটার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থায় চুক্তির পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রচণ্ড সংশয় আছে।
এই চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর ও রাষ্ট্রদূত ব্রেন ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। এই সক্রিয় কূটনৈতিক তদবির ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটন এই চুক্তিটিকে কেবল একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নয়, বরং একটি কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।
এই পরিস্থিতিতে করণীয় কী?
১. সরকারের উচিত একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করে চুক্তির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক শর্তগুলো চিহ্নিত করা। ২. সিপিডিসহ দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সুপারিশের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে ক্ষতিকর শর্তগুলো পরিবর্তন বা বাতিলের চেষ্টা করা। ৩. একই পরিস্থিতিতে থাকা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা। ৪. যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে চীন, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করা। ৫. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে চুক্তির শর্তগুলো WTO বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা যাচাই করা। ৬. চুক্তির পূর্ণ পাঠ জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করা এবং নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মতামত সংগ্রহ করা।
পুরো চুক্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। চুক্তিটিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বা বাণিজ্যের সক্ষমতা ও বাস্তবতা—কোনোটিই প্রাধান্য পায়নি। বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে: হয় এই চুক্তির শর্তগুলো মুখ বুজে মেনে নেওয়া, অথবা সক্রিয় কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা। যে জাতির শাসক স্বদেশের স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার হয় না, ইতিহাস তাকে ক্ষমা করে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে এই চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন ও চুক্তিতে সমতা আনা অত্যন্ত জরুরি।