Published : 22 Apr 2026, 02:45 PM
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বলেছেন, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার শিক্ষককে ইংরেজি ভাষায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশে মোট প্রাথমিক শিক্ষকের সংখ্যা পৌনে চার লাখের মতো। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষক ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। বাকিরা জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’র আওতায় প্রশিক্ষণ পাবেন।
খবরটি পড়ার পর মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন এসে জড়ো হলো। এই যে আগের সরকার ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষককে ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তার ফলাফল কী? তারা সবাই কি ইংরেজি বলতে ও পড়াতে পারেন?
প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ থেকে ৬ জন শিক্ষক থাকেন। তাদের প্রত্যেক পড়ানোর জন্য মোটামুটি একটি বিষয় নির্ধারণ করা থাকে। যিনি বাংলা পড়ান, তিনি খুব বেশি ব্যতিক্রম না হলে সবসময় বাংলাই পড়ান। গণিত যিনি পড়ান, তাকে শিক্ষার্থীরা ’অংক স্যার’ বলে ডাকেন। এখন অংক, বাংলা বা ধর্ম স্যারের ইংরেজি না জানলে তেমন কোনো ক্ষতি নেই। তাহলে তাদেরকেও এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে কেন?
এই প্রশিক্ষণ কত দিনের তা জানা নেই! ধরে নিচ্ছি, ১০ বা ২০ দিনের প্রশিক্ষণ। এই স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণে কি ইংরেজিতে কথা বলা বা ইংরেজি শেখা সম্ভব? সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও আরও নানা মাধ্যমের প্রাথমিক শিক্ষক আছেন, যাদের মোট সংখ্যা ৭ লাখ। এখন ৭ লাখের মধ্যে পৌনে চার লাখ বা ৫২ শতাংশকে কেন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে? বাকিরা কেন প্রশিক্ষণ পাবেন না?
সবশেষ প্রশ্নটি হলো, প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১২টি ক্লাস পড়েও যেখানে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বলতে পারে না, সেখানে ১০ বা ২০ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে কি কোনো লাভ হয়?
এসব প্রশ্ন মাথায় জড়ো হতে হতে গত বছরের কথা মনে পড়ল। তখনো তারেক রহমান দেশে ফেরেননি। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি একাধিক ওয়েবিনারে বলেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে স্কুল পর্যায়ে কয়েকটি ভাষা বাধ্যতামূলক করা হবে। বাচ্চারা নিজের পছন্দ অনুযায়ী একটি ভাষা বেছে নেবে। ইংরেজির পাশাপাশি আরেকটি ভাষাও বাধ্যতামূলক থাকবে, যাতে বিদেশে গেলে কোনো সমস্যায় না পড়ে। তাহলে এই প্রশিক্ষণ কি ওই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন?
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শেখে মূলত শিক্ষকদের কাছ থেকে। কিন্তু বাস্তবে প্রাইমারি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত অধিকাংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন না। দুটো শুদ্ধ লাইন বলতে বা লিখতে গেলে বেকায়দায় পড়ে যান।
আজকাল অনেক অভিভাবককে অভিযোগ করতে শুনি যে, ইংরেজি তো দূরের কথা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী নাকি ভালোভাবে বাংলা রিডিংও পড়তে পারে না। এই যদি পরিস্থিতি হয়, তাহলে খুঁজে দেখা দরকার যে সমস্যাটা আসলে কোথায়। যে শিশু নিজের মাতৃভাষা ভালোভাবে বলতে ও পড়তে পারে না, তার পক্ষে বিদেশি ভাষা রপ্ত করা কঠিন। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত লাইনটি মনে পড়ে যায়, “আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শিক্ষার পত্তন।” অথবা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের “প্রথমে মাতৃভাষা, পরভাষা পরে” লাইনটিও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।
শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বলতে পারে না কেন?
উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা এক একজন শিক্ষার্থী প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইংরেজি ভাষা শেখে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে ইংরেজি বই পাঠ্য হিসেবে থাকে। সেখানে গ্রামার, প্যারাগ্রাফ, রচনা সবকিছুই সে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো নম্বরও পায়। তবু বাস্তব জীবনে যখন ইংরেজিতে দুই মিনিট কথা বলতে বলা হয়, তখন সে দ্বিধায় পড়ে যায়, থেমে যায়, কিংবা একেবারেই বলতে পারে না।
এর প্রধান কারণ লুকিয়ে আছে আমাদের ইংরেজি শেখানোর পদ্ধতিতে। শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শেখানো হয় মূলত গ্রামার, অনুবাদ এবং প্রশ্ন-উত্তর মুখস্থ করার মাধ্যমে। শিক্ষার্থীরা শেখে কীভাবে বাক্য গঠন করতে হয়, কীভাবে বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ করতে হয় কিংবা কীভাবে পরীক্ষার খাতায় সঠিক উত্তর লিখতে হয়। কিন্তু কথা বলার অনুশীলন, বাস্তব কথোপকথন কিংবা শ্রবণভিত্তিক শিক্ষা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে ইংরেজি তাদের কাছে একটি ব্যবহারিক ভাষা নয়, বরং একটি তাত্ত্বিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই তাত্ত্বিক বিষয়ের প্রতি শুরু থেকেই আতঙ্ক তৈরি হয়।
আমাদের পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এই সমস্যাকে আরও গভীর করেছে। পরীক্ষায় লেখা, মুখস্থ আর গ্রামার ঠিক রাখলেই নম্বর মেলে। কিন্তু ‘কথা বলতে পারা’ কখনো পরীক্ষার অংশ হয় না। যে দক্ষতার মূল্যায়ন হয় না, সেটা শেখার আগ্রহও থাকে না।
আরেকটা বড় সমস্যা ইংরেজি ব্যবহারের পরিবেশের অভাব। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা ইংরেজি পড়াতেও বেশিরভাগ সময় বাংলায় বলেন। শিক্ষার্থীরাও বাংলাতেই কথা বলে। কেউ ইংরেজিতে কথা বলতে গেলে লজ্জা পায়, সহপাঠীরা হাসাহাসি করে, ভুল হলে ধমক খায়। ভুল ইংরেজি বললেই ট্রলের শিকার হতে হয়।
সেই সাংবাদিক কিংবা গাইবান্ধার ‘নট ফর মাইন্ড’ বলা গ্র্যাজুয়েটের কথা মনে করুন। শুধু ভুল ইংরেজি বলার জন্য যাদের কী পরিমাণ ট্রল সহ্য করতে হয়েছে! ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ইংরেজি না জানলে ক্ষতি নেই; কিন্তু ভুল বললে আর রক্ষা নেই। এই ভয় শিক্ষার্থীদের চেষ্টা করার আগেই থামিয়ে দেয়।
শ্রবণভিত্তিক অনুশীলন আরেকটি জরুরি বিষয়। ভাষা শেখার জন্য ওই ভাষা শোনা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু শিক্ষার্থীরা খুব কমই নেটিভ উচ্চারণ, বাস্তব কথোপকথন কিংবা ইংরেজি অডিও-ভিডিও শোনার সুযোগ পায়। শোনা ছাড়া বলা বা শেখা সম্ভব নয়, অথচ এই কিষয়টি আমাদের শিক্ষায় প্রায় অনুপস্থিত।
এরপর আসতে পারে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের দিকটি। অনেক ইংরেজি শিক্ষক নিজেও ইংরেজিতে সাবলীল নন। তারা পাঠ্যবই বুঝিয়ে দিতে পারেন, গ্রামার শেখাতে পারেন, কিন্তু কথা চালানো বা ইংরেজিতে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন না। ফলে শ্রেণিকক্ষ হয়ে ওঠে একমুখী; যেখানে ভাষা শেখা হয় নিয়মের মাধ্যমে, ব্যবহারের মাধ্যমে নয়।
সব মিলিয়ে আমরা দেখি, আমাদের দেশে ইংরেজিকে ‘ভাষা’ হিসেবে নয়, ‘বিষয়’ হিসেবে শেখানো হয়। তাই শিক্ষার্থীরা প্যারাগ্রাফ লিখতে পারে, গ্রামার বলতে পারে, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পায়, কিন্তু নিজের মনের কথা ইংরেজিতে প্রকাশ করতে পারে না। বিষয় হিসেবে ইংরেজি শেখা হয় বটে; ভাষা হিসেবে নয়।
করণীয় কী?
১০ বা ২০ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে ভাষা শেখা যাবে না। এসব প্রশিক্ষণের নামে আনন্দ-ফূর্তি, যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়ার ভাতা উত্তোলন ছাড়া কাজের কাজ কিছু হয় না।
প্রশিক্ষণ দিতে হলে শুধু ইংরেজি শিক্ষকদের টার্গেট করতে হবে। তাদের দীর্ঘমেয়াদি, ধাপে ধাপে ভাষা শেখার আন্তর্জাতিক মানের কোর্সে নিয়ে আসতে হবে। যারা পাস করবেন না, তাদের ইংরেজি পড়ানোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
ইংরেজি শেখানোর গোটা ধরনটিই বদলাতে হবে। দক্ষ পরামর্শকদের সাহায্যে নতুন শিখন উপকরণ তৈরি করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি ব্যবহার বাড়াতে হবে, কথা বলাকে মূল্যায়নের অংশ করতে হবে, ভুলকে স্বাভাবিকভাবে নিতে হবে এবং নিয়মিত শ্রবণ ও কথোপকথনের অনুশীলন চালু করতে হবে। আর তখনই ইংরেজি কেবল খাতার ভাষা না হয়ে জীবনের ভাষা হয়ে উঠবে।
ভাসা ভাসা প্রশিক্ষণ দিয়ে আর যাই হোক, ভাষা শেখা হয় না।