Published : 02 Mar 2026, 01:43 AM
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ নাটক নতুন নয়। এবার মঞ্চে মুখোমুখি পাকিস্তান ও আফগানিস্তান, কেন্দ্রবিন্দুতে তালেবান প্রশ্ন। কিন্তু নেপথ্যে কি আমেরিকান কোনো কৌশল লুকানো আছে?
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, তালেবান নাকি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সশস্ত্র জঙ্গিদের আফগানিস্তানে জড়ো করছে এবং সেখান থেকে সন্ত্রাস ‘রপ্তানি’ করছে। অভিযোগ এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি ইঙ্গিত করেছেন, তালেবানের সঙ্গে ভারতেরও সম্পর্ক রয়েছে—যে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব বহুদিনের। অর্থাৎ নিরাপত্তা প্রশ্নকে আবারও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাঠামোয় বসানো হয়েছে।
অভিযোগের ভাষা যতটা কূটনৈতিক, সীমান্ত পরিস্থিতি তারও বেশি রক্তাক্ত। পাকিস্তানি বাহিনীর দাবি, তাদের হামলায় তিন শতাধিক তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে, আহতের সংখ্যা শত শত। ৩০টি আফগান পোস্ট ধ্বংস এবং ৯টি দখলের কথাও বলা হচ্ছে। অন্যদিকে আফগান বাহিনীর পাল্টা দাবি, তারা শতাধিক পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং ১৯টি পোস্ট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে নানগারহার, নুরিস্তান, কুনার, খোস্ত, পাকতিয়া ও পাকতিকা সীমান্ত প্রদেশে—যেখানে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি আর বিতর্কিত সীমারেখা দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনার উৎস। এই অঞ্চলগুলো শুধু ভৌগোলিক সীমান্ত নয়; এগুলো ইতিহাসের ক্ষতবিক্ষত অধ্যায়, যেখানে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আঞ্চলিক শক্তির হিসাব-নিকাশ বহুবার রক্তক্ষয় ডেকে এনেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—দুই পক্ষের বক্তব্যে যুদ্ধ যেন বাস্তবতার পাশাপাশি প্রচারযুদ্ধেও পরিণত হয়েছে। কে কত পোস্ট দখল করল, কে কতজনকে হত্যা করল—এসব তথ্যের নিরপেক্ষ যাচাই কঠিন। কিন্তু যা স্পষ্ট, তা হলো সীমান্ত আবারও অস্থির এবং রাজনৈতিক বক্তব্য সামরিক উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছে।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের হামলা-পাল্টা হামলাকে আপাতদৃষ্টিতে সীমান্ত বিরোধ মনে হলেও এর নেপথ্যে আরও গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু প্রায় দুই হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন।

ডুরান্ড লাইন নামটি এসেছে ব্রিটিশ কূটনীতিক মর্টিমার ডুরান্ডের নাম থেকে। তিনি উনিশ শতকের শেষদিকে ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে কাজ করতেন। ১৮৯৩ সালে তিনি আফগান আমির আব্দুর রহমান খানের সঙ্গে একটি সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা ইতিহাসে ডুরান্ড লাইন চুক্তি নামে পরিচিত।
তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপট ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও রাশিয়ার মধ্যকার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—যাকে ‘গ্রেট গেম’ বলা হতো। ব্রিটিশ ভারত তার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে চেয়েছিল এবং সেই জন্য আফগানিস্তানের সঙ্গে একটি বাফার জোন তৈরি করা ছিল কৌশলগত লক্ষ্য। ১৮৯৩ সালের চুক্তির মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তরেখা নির্ধারণ করা হয়, যা আজকের আফগানিস্তান ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যকার আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সীমান্ত নিয়ে বিতর্কের কারণ, এটি শুধু ভূগোল ভাগ করেনি, ভাগ করেছে একই জাতিগোষ্ঠী পাখতুনদের। আফগানিস্তানের অনেক রাজনৈতিক শক্তি মনে করে, ঔপনিবেশিক আমলে চাপিয়ে দেওয়া এই সীমান্ত জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উনিশ শতকের শেষদিকে এই সীমান্ত নির্ধারণের সময় পাকিস্তান নামে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। তখন এই অঞ্চল ছিল ব্রিটিশ ভারতের অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পাকিস্তান উত্তর-পশ্চিমের সীমান্তসহ ডুরান্ড লাইন উত্তরাধিকারসূত্রে পায়। কিন্তু রাজতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট বা ইসলামপন্থি—কোনো আফগান সরকারই ডুরান্ড লাইনকে বৈধ আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকার করেনি।
১৯৯০-২০০১ সালের পর পাকিস্তান তালেবানকে সমর্থন দেয় এই প্রত্যাশায় যে, কাবুলে একটি সহযোগী সরকার গড়ে উঠবে, যা এই সীমান্ত প্রশ্নে স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে এবং ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত সহায়তা দেবে। তবে ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর স্পষ্ট হয় যে, তারা পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল অংশীদার নয় এবং ডুরান্ড লাইনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে ডুরান্ড লাইনে সংঘর্ষ নিয়মিত রূপ নেয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সংঘর্ষে ১৯টি আফগান পোস্ট দখল করে—যা উত্তেজনার চূড়ান্ত প্রকাশ। এছাড়া পাকিস্তানের ভেতরে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সক্রিয়, যারা প্রধানত পশতুন এবং পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা চায়। এই গোষ্ঠীর উপস্থিতি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক। পাকিস্তান অভিযোগ করেছে যে, আফগানিস্তান ভারতের সঙ্গে সামরিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। আফগানিস্তান বলছে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তারা যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পারে। পাকিস্তানের অন্যতম অস্ত্র সরবরাহকারী চীন একই সঙ্গে তালেবান ও পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় আগ্রহী। চাবাহার বন্দর ভারতের সহায়তায় উন্নত হচ্ছে—যা পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরের বিকল্প। এতে ভারত সরাসরি আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকার পাচ্ছে পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে। পাকিস্তান এ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন।
পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের বিরোধ সুপ্রাচীন হলেও ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্কোন্নয়নও মাত্র সেদিনের নয়, কয়েক বছর ধরেই ভারতের বিজেপি সরকার আফগান তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে চলেছে। কিন্তু ২৬ ফেব্রুয়ারিতে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের অতর্কিতে ব্যাপক হামলা আমার মতো আরও অনেকের মনেই মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। কেন এই সন্দেহ. সেটাই বলছি এবার।
২৬ ফেব্রুয়ারি ছিল সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন-ইরান দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা রোধে একটি চুক্তি ও সমঝোতার লক্ষ্যে বৈঠক। আলোচিত সেই বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ১৯ ফেব্রুয়ারি ১০ দিনের একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেন ইরানকে। এই সময়ের মধ্যে হয় চুক্তি না হয় যুদ্ধ। সেই সময় শেষ হতে না হতেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে আমেরিকা-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ব্যাপক হামলা চালায়। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ডজনখানেক নিহত হন।

প্রশ্ন করতে পারেন, এটার সঙ্গে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের হামলার সম্পর্ক কী? সম্পর্ক হচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ইরানের সীমান্তজুড়ে অবস্থিত মুসলিম দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অবস্থান। তাই আফগানিস্তানে পাকিস্তানের এবারের হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান হামলার সম্ভাব্য সংযোগ ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়।
আমরা জানি, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুদিনের এবং কৌশলগতভাবে গভীর। পাকিস্তান এমন অবস্থানে নেই যে, সহজে আমেরিকার স্বার্থ ও প্রয়োজনের বাইরে গিয়ে দাঁড়াবে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে পাকিস্তান ওয়াশিংটনের পক্ষেই অবস্থান নেবে—এমন ধারণা অমূলক নয়। প্রয়োজন হলে তারা নিজেদের ভূমি এবং আকাশসীমাও ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে পারে।
এমনই একটি তথ্য ১৪ জানুয়ারি আফগানিস্তান ডিফেন্স নামের একটি ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে প্রকাশ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করে মার্কিন বিমানবাহিনী মহড়া পরিচালনা করেছে। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানকে ঘিরে এ ধরনের দাবি তাদের জন্য স্বস্তিকর হওয়ার কথা নয়।
আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভূরাজনৈতিক সমীকরণটি বেশ জটিল। পাকিস্তানকে সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র—বিশেষ করে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতির ক্ষেত্রে। আফগানিস্তানের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। তারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছে, বিশেষ করে আফগান তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ও রক্তাক্ত সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক চরম বৈরী এবং কয়েক দশক ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবরোধের মুখে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আফগানিস্তানের বর্তমান কট্টর ইসলামি শাসনব্যবস্থা নীতিগতভাবে ইরানের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল অবস্থান নিতে পারে—যদিও শিয়া মুসলিম প্রধান ইরানের পক্ষে সরাসরি সামরিক সমর্থন বা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
এই প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ মনে করছেন, আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তির কৌশলগত স্বার্থও এখানে কাজ করছে। এমন ধারণাও সামনে আসে যে, আফগানিস্তান যেন ইরানের পক্ষে সক্রিয় হতে না পারে—সেজন্য তাদের সীমান্ত উত্তেজনায় ব্যস্ত রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে। তবে এটি একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী অনুমান; এর পক্ষে সরাসরি প্রমাণ উপস্থাপন করা কঠিন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন ঘটনাগুলো সাধারণত বহুমাত্রিক স্বার্থ, নিরাপত্তা কৌশল ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জটিল সমীকরণের অংশ হিসেবেই দেখা হয়।
আমেরিকা–ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের এই সংঘাতকে অনেক বিশ্লেষকই মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের সংকট হিসেবে দেখছেন। বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশই ইরানের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে তারা দূরত্ব বজায় রেখেছে। এর একটি কারণ হলো, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান মাঝেমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে, চালিয়ে যাচ্ছে, যা এ অঞ্চলের দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন ধারণাও আলোচিত হয় যে, সামরিক হামলার সময়, লক্ষ্যবস্তু এবং কৌশলগত পরিকল্পনা অনেক আগেই নির্ধারিত থাকে। কূটনৈতিক চুক্তি বা আলোচনার সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের অংশ হতে পারে—যাতে সামরিক প্রস্তুতি, গোয়েন্দা তথ্য যাচাই এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার হিসাব-নিকাশ করার জন্য সময় পাওয়া যায়।
কেন এবং কিসের ভিত্তিতে বলছি এ কথা? ট্রাম্প প্রশাসন ভালো করেই জানে, তারা চুক্তির জন্য ইরানকে যেসব শর্ত দিয়েছে, সেগুলো একটি স্বাধীন দেশের পক্ষে—বিশেষত ইরানের মতো কট্টরপন্থী ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষে মানা অসম্ভব। তাদের এই অযৌক্তিক শর্ত মানা ও আত্মসমর্পণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

ইরানের সবচেয়ে বড় বিপদ তার নিজের ঘরে। এই বছর জানুয়ারিতে খামেনি বিরোধী ব্যাপক জনবিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের রক্তের দাগ এখনো রাস্তায় ও দেয়ালে লেগে আছে। খামেনি নিহত হওয়ার পর তাই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, কেউ শোক করছে, উল্লাসও করছে বহুমানুষ। দশকের পর দশক ধরে চলা অবদমিত ক্রোধ ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। ইরানিদের অনেকেই রাস্তায় নেমে এসেছে; খামেনি নিহত হওয়ার তারা লোকালয়ে নেমে উল্লাস করছে। তারা দখল নিতে শুরু করছে রাজপথ, সরকারি ভবন ও স্থাপনা। দেশের অভ্যন্তর থেকে গড়ে ওঠা এই প্রতিবাদই এখন শাসকের জন্য বড় বাধা। বিদেশি আগ্রাসন ও আক্রমণ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্য ও সংহতি একান্ত প্রয়োজন; সেটা না হয়ে দেশের ভিতরে থাকা খামেনি বিরোধী পক্ষগুলো তার পতনে সোচ্চার হয়েছে এবং আগ্রাসী শক্তিকে সমর্থন করছে ও স্বাগত জানাচ্ছে। পুলিশ কি এখন তাদেরকে দমন করবে? ইরানের বড় সংকট ও বিপদ এখানেই।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, আইআরজিসি প্রধান, সামরিক কমান্ডারসহ দুই শতাধিক মানুষ নিহত হলেন। এটা হলো মার্কিন আগ্রাসনের শুরু। ইরানে আরেক অধ্যায়ের অভিষেক? তবে ইরানও বসে নেই; তারাও তাদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে পাল্টা জবাব দিচ্ছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোয় থাকা মার্কিন সামরিক বেসসহ নানা স্থাপনায় ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে ইরানের জবাব বা প্রতিশোধ নেওয়া হলো ঠিকই, কিন্তু প্রতিবেশী সব দেশই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে এবং ইরানকে অভিযুক্ত করছে। এতে আমেরিকা-ইসরায়েলের ছক আরেক ধাপ সাফল্য ও সুবিধা পেয়েছে।
এই যুদ্ধে ইরান নিঃসঙ্গ ও একা। যে বড় পরাশক্তিগুলো আলোচনায় আছে, তারা ধিক্কার, ঘৃণা ও নিন্দার মাধ্যমে তাদের দায় সারছে। তারাও আটকে আছে ভূ-রাজনীতির নানা সমীকরণে। তাহলে দাঁড়াল এই যে, ইরানকে এ যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হবে একাই। তাকে মোকাবেলা করতে হবে: ১. আমেরিকা ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক আক্রমণ ও আগ্রাসন। ২. ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে যত আক্রমণ করবে, তারা ততই ক্ষুব্ধ হবে। এতে তাদের পক্ষ থেকে পাল্টা আক্রমণের বাড়তি বিপদ তৈরি হবে। ৩. , দেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করাও শাসনব্যবস্থার জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়াবে। ৪. এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এখন ইরানের ভরসা হামাস, হিজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাক-সিরিয়া-বাহরাইনে থাকা তাদের প্রক্সি ইউনিটগুলো। তারা এই যুদ্ধের অংশীদার হয়ে আসলে কতটা প্রতিরোধ করতে পারবে, সেটা প্রশ্ন। কেননা প্রতিবেশীরা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের কথা উল্লেখ করে ইতোমধ্যে ইরানকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে।
তাহলে এই যুদ্ধের পরিণতি কী হবে—ইরান কি সত্যিই পরাজয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার নীতি সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশলের অংশ নয়। অনেক ক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলো বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামে, যাতে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিশ্চিত ফল বলে কিছু নেই; অপ্রত্যাশিত মোড় সব সময়ই সম্ভব।
যদি যুদ্ধের শুরুতেই কোনো রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহলে সেই দেশের রাষ্ট্রীয় মনোবলে চাপ পড়া স্বাভাবিক। কারণ নেতৃত্বের নিরাপত্তা ব্যর্থ হলে জনগণের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তবে ইতিহাস বলে, এমন পরিস্থিতিতেও কোনো কোনো দেশ জাতীয়তাবাদী সংহতি ও প্রতিরোধের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চান না—এমন মতও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে শোনা যায়। তিনি ইতোমধ্যে ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) আহ্বান জানিয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানি জনগণকে বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ গ্রহণের কথা বলেছেন। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ইরানের সাবেক রাজপরিবারের প্রতিনিধি রেজা পাহলভি, যিনি ইরানের সরকারবিরোধীদের জনতার কাতারে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে এই ধরনের সংঘাতের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে কূটনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভারসাম্যের ওপর। কোনো একপেশে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে দেখা গেছে—যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, জনমত, তথ্যযুদ্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও।
এই বিশ্লেষণে হয়তো অনেকেই হতাশ হবেন, দ্বিমত পোষণ করবেন। সেটা করতে পারেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি সাম্রাজ্যবাদী নগ্ন ছোবলকে সমর্থন করি না, কিন্তু কোনো পরিস্থিতির ভুল ব্যাখ্যায়ও আমার মন সায় দেয় না। শুধু শুধু অমূলক মিথ্যা আবেগের বয়ান তৈরি করে সাময়িক উত্তেজনা বা স্বস্তি তৈরি হবে ঠিকই, কিন্তু পরিস্থিতি বা বাস্তবতাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা হবে না।