Published : 23 Apr 2026, 06:37 PM
শুরুর দিকে ভারতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনকে ‘তিন দিনের তামাশা’ বলা হতো। ডিসেম্বর মাসের ২৬-৩০ তারিখের যেকোনো তিনদিন অনুষ্ঠিত হতো নরমপন্থিদের এই তামাশার রঙ্গশালা। ১৮৯৭ সালে কথাটা বলেছিলেন বরিশালের নেতা অশ্বিনী কুমার দত্ত। আজকালকার সংসদ অধিবেশন নিয়েও সেটাই মনে হচ্ছে! এমনিতে ২০১৪ সালের পর সংসদ অধিবেশন নিয়ে স্বভাবতই আর কোনো বিশেষ আগ্রহ ছিল না। এবারের সংসদ ভিন্ন এক পরিস্থিতিতে হচ্ছে বলে জনআগ্রহ ব্যাপক। কিন্তু, বদলায়নি কিছুই!
ট্রেজারি বেঞ্চে বসার সুবিধা হিসেবে সাত মিনিট পাওয়া সদস্যরা তিন মিনিট ব্যয় করেন তৈলমর্দনে। দুই মিনিট ইতিহাসে। এক মিনিট জনসমস্যার কথা বলতে না বলতেই ‘মাননীয় স্পিকার আরও দুই মিনিট সময় চাই’ বলতে থাকেন প্রত্যেকেই৷ স্পিকার এক-দুই মিনিট সময় দেন, তারপর কোনো রকমে মাননীয় সদস্য তার এলাকার সমস্যা বলতে বলতে মাইক বন্ধ হয়ে যায়। বিরোধী বেঞ্চেও এই একই চিত্র!
বিদ্যুতের যে সংকট সারাদেশে চলছে, তা কি সংসদকে প্রভাবিত করে না? বরাদ্দকৃত সময়ের চেয়ে যদি হরহামেশাই সময় বেশি ব্যয় হয়, তাহলে প্রতিদিনের আলোচনা সূচিতে যেমন প্রভাব পড়ে, তেমন প্রভাব তো জ্বালানির ওপরেও পড়ে, নাকি?
২.
সারা পৃথিবীতে এই মুহূর্তে জ্বলন্ত ইস্যু হলো জ্বালানি শক্তির প্রাণভ্রোমরা তেল ও এর সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের আগ্রাসী যুদ্ধই এর একমেবাদ্বিতীয়ম কারণ। পরিষ্কার যা চোখে দেখা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট জ্বালানিমন্ত্রী অযথাই রাজনীতি করতে গিয়ে সকলকে হতবুদ্ধ করে দিয়েছেন। মাত্রই একটা সরকার গঠিত হয়েছে, তার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, স্বাভাবিক যে সংকট, সেটিকে যুদ্ধের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই অনেক সমালোচনার দফারফা হয়ে যেত। অথচ, মন্ত্রী বললেন, দেশে তেলের সংকট নেই! বিদ্যুতেরও সংকট নেই!
যে সংকট বৈশ্বিক ‘মহামারী’র পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, তাকে নাকচ করে ফ্রন্টফুটে খেলতে গিয়ে মন্ত্রী খোদ সরকারকেই বেকায়দায় ফেলেছেন। এখন ব্যাকফুটেও যেতে পারছেন না, ফ্রন্টফুটেও আসতে পারছেন না। এজন্যই গুরুজনেরা বলেছেন, ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না!’
পাম্পে তেল সংকট, তেলের অভাবে বিদ্যুতের সংকট, বিদ্যুতের অভাবে দাবদাহের কালেও ঠান্ডার সংকট—এই শৃঙ্খলা বা চেইন চাইলে বাড়তেই থাকবে। এদিকে মহাগুরুত্বপূর্ণ এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। অথচ, প্রান্তিক বাংলাদেশের কথা বাদই থাক, ঢাকার অদূরেই বিদ্যুতের বলিহারি অবস্থা। অবস্থা এমনই যে, আশির ও নব্বইয়ের দশকের একটি ব্যঙ্গ মনে করে গেল, ‘বিদ্যুৎ যায় না, আসে!’ এর মধ্যে আবার ‘হারিকেন’ ব্যবহারেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই শুনে আমাদের এখন ‘হাতে হারিকেন, মাথায় হাত’ দেওয়ার দশা!
৩.
ব্যতিক্রম যা হচ্ছে, তা আসলে হচ্ছে সংসদেই। ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে তুমুল বিতর্ক আইনি মারপ্যাঁচে এখন কোথায় অবস্থান করছে, তা বলা মুশকিল। কিন্তু, জনগণের সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান সংসদ থেকে মজা নেওয়ার ঘটনা কম ঘটছে না। তৈলমর্দনের ব্যাপারটি তো আছেই। এ ব্যাপারে দুই বেঞ্চেরই একই অবস্থা। সরকারি-বেসরকারি যে সদস্যই হন, নিজেদের স্বার্থের পক্ষে কথা বললেই, উপস্থিত সকলে মিলেই হাত তালি দিচ্ছেন!
এই যেমন, উপজেলা প্রশাসনিক ভবনে সংসদ সদস্যদের বসার ব্যবস্থার বিষয়টি। এমন আবদার মিটতেই ‘আজ আমি বিরোধিতা করতে নয়, ধন্যবাদ জানাতে দাঁড়িয়েছি, মাননীয় স্পিকার’—এই সুর শোনা গেছে। তাতে সবাই খুশি। এমনিতে স্থানীয় সরকারে স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিশেষত সরকার দলীয় সংসদ সদস্যের ব্যাপক প্রভাব। আমল বদলালেও, আদত বদলাবে, সে লক্ষণ আপাতত নেই। বলাবাহুল্য, স্থানীয় সরকার স্বাধীন নয়, পরাধীনই বটে। এর মধ্যে আবার সংসদ সদস্যের অন্দরমহলে প্রবেশ! আইনে নেই, তাই বসার জায়গার নাম হয়েছে ‘পরিদর্শন কক্ষ’! আইনে যেহেতু নেই, সেহেতু এটা কি সাংবিধানিক হলো, মাননীয় মন্ত্রী?
তবে, এ ব্যাপারে আর কেউ রা পর্যন্ত করলেন না! কবি কামিনী রায় লিখেছিলেন, ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি/ এ জীবন মন সকলি দাও।’ আর এ দিকে ঘটছে আরেক, যথারীতি নিজের স্বার্থে এ জীবন-মন উৎসর্গ করতে নেমেছেন আমাদের রাজনীতিকরা!
নিঃসন্দেহে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় বসার জায়গার প্রয়োজন আছে। কিন্তু, সেটাকে যেভাবে সংসদ সদস্যের চেয়ে নিম্নপদধারীদের সঙ্গে তুলনা করে সামনে আনা হয়েছে, তা শুধু সমালোচনারই যোগ্য নয়, নিন্দনীয়ও বটে। অর্থ সংকোচনের জন্যই হয়তো বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই একটি কক্ষ বা কার্যালয় বরাদ্দ করা হচ্ছে। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতিতে, যেখানে অর্থ-সংকট আছে বলে সরকারই জানাচ্ছে, সেখানে এ-ও তো অর্থেরই অপচয়। সঙ্গে এর রক্ষণাবেক্ষণের খরচও তো সরকারি খাত থেকেই মেটাতে হবে।
৪.
যে কারণে কক্ষ-প্রসঙ্গের অবতারণা, সেটাই বরং বলা যাক। একটা আবদার যেহেতু সমস্বরে পাস হয়েছে, এবার আমাদের দ্বিতীয় ও অধিকতর বড় আকাঙ্ক্ষা হয়েছে। শৈশবে শুনেছি, বাড়ি হলে নাকি গাড়িও চায় আমাদের মন। কিন্তু, ছোটদের আবদার মাত্রই ইতিবাচকভাবে দেখতে হয়—এমন অদ্ভুত কথা কদাপি শুনিনি। গরীব ঘরের ক্ষেত্রে এ কথা তো আরও সত্য। গরীর দেশের কোষাগারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য নয় কি?
কে আগে শুল্ক-মুক্ত গাড়ি ও প্লট বরাদ্দ নাকচ করেছিল—এই নিয়ে যুযুধান দুই বেঞ্চে ঠাট্টা-তামাশা চলতে দেখে মনে হয়েছে, এ ইস্যুতে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী!’ অবস্থা আমাদের। অথচ, আইনটা বাতিল করতে কারোরই মন সায় দেয়নি! যারাই বলুক, কথাটা তো খুবই মনহারী, উদার ও প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু, এর আগে-পরে সংসদের দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম বিরোধী সদস্য যে আবদার করে বসলেন, তা দেখে আমাদের এখন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা আওরাতে হয়—‘ছেড়ে দে মা [বাবা], কেঁদে বাঁচি!’
সরকারি গাড়ি চাওয়ার যুক্তিটাও সেই একই, কক্ষ চাওয়ারই মতো। সংসদ সদস্যের চেয়ে যারা নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, তারা সরকারি গাড়ি পেলে, সংসদ সদস্যরা কেন ভাড়া গাড়ি ব্যবহার করবেন! এই শুনে শুল্ক-মুক্ত গাড়ির সুবিধা না-নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া উভয় পক্ষের সদস্যরা নিজেদের প্রাক-অবস্থান বেমালুম ভুলে গিয়ে হাততালিতে ফেটে পড়লেন। ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে ‘সকল কাজের কাজী’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর শুল্ক-মুক্ত গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার ‘অনুশাসন’টি মনে করিয়ে দিলেন বটে, কিন্তু, প্রধানমন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট ‘আবদার’টি ভেবে দেখার অনুরোধ করতে ভুললেন না।
নিশ্চয়ই, সংসদ সদস্যরা বলতে পারেন, শুল্ক-মুক্ত গাড়িও নিতে পারব না, আবার সরকারি গাড়িও পাব না—এ কেমন অনুশাসন ‘হে মহারাজ!’ কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী নিজেই যখন সরকারি কাজ ব্যতীত সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন না, পতাকাও ব্যবহার করেন না, তখন তিনি আগত অনুরোধটি কীভাবে বিবেচনা করেন, তা এখন দেখার বিষয়। এর বিপরীতে, শুল্ক-মুক্ত গাড়ি সুবিধা নিতে না চাওয়ার মধ্যেই যে অন্তত গাড়ির ক্ষেত্রে সরকারি সুবিধা না নেওয়ার সুপ্ত স্পিরিটটি লুকিয়ে আছে, তা বোধহয় সংশ্লিষ্ট উত্থাপক ও তার সমর্থকবৃন্দ নৈতিকভাবে খেয়াল করেননি। ফলে, এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ‘অনুশাসন’ পূর্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে বলেই আশা করা যায়।
৫.
অবশ্য এ প্রসঙ্গে ‘কেঁচো খুড়তে সাপ’ বেরিয়ে আসার মতো এখন সামনে চলে এসেছে আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের পাওয়া আর্থিক সুবিধার দিকগুলো। ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ ১৯৭৩’ অনুযায়ী বর্তমানে (সময়ের প্রেক্ষিতে এ ভাতা বিভিন্ন সময়ে সমন্বয় হয়েছে) একজন সংসদ সদস্যের মাসিক পারিশ্রমিক প্রতি মাসে ৫৫ হাজার টাকা, যাতায়াত ভাতা ৭০ হাজার টাকা, নির্বাচনি এলাকা ভাতা সাড়ে ১২ হাজার টাকা, আপ্যায়ন ভাতা ৫ হাজার টাকা, টেলিফোন ভাতা ৭ হাজার ৮০০ টাকা, ধোলাই ভাতা ১৫০০ টাকা ও চিকিৎসা ভাতা ৭০০ টাকা। অর্থাৎ সাকুল্যে মাসে দাঁড়ায় ১৫২,৫০০ টাকা, যা সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত। অথচ, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের কোনো উপার্জনই আয়করমুক্ত নয়।
এছাড়া, নির্বাচনি এলাকায় অফিস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৫ হাজার, এবং নিত্য ব্যবহার্যপণ্য কেনা বাবদ ৬ হাজার টাকাও যুক্ত হবে। শুধু মাসিক পারিশ্রমিক, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা দেখলেই হবে না। সংসদ অধিবেশন ও সংসদীয় কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে পরিবহন ভাতা প্রতি কিলোমিটারে ১০, দায়িত্ব পালনকালে ঢাকায় অবস্থানের জন্য প্রতিদিন ৭৫০ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা ৭৫ টাকা। সঙ্গে প্রতিদিনের হিসাবে ৮০০ টাকা ও ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পান তারা। এ হিসাবে ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব ভেদে সংসদ অধিবেশন ও বৈঠককালেই তারা প্রতিদিন পান কমপক্ষে ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা (এ হিসাব কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে)। এ হিসাবে, শুধু সংসদের প্রথম অধিবেশনেই, ঈদের ছুটির ১৩ দিন বাদ দিলে গত ১২ মার্চ থেকে আগামী ৩০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরা কত টাকা পেয়েছেন বা পাবেন, সেটা সাধারণ নাগরিকদের চিন্তারও বাইরে। সঙ্গে প্রতি সংসদ সদস্যের জন্য আছে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকার বাৎসরিক স্বেচ্ছাধীন তহবিল, ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ভ্রমণ ভাতা এবং ১০ লাখ টাকার বিমাসুবিধা। আর ঐ যে শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট!
সরকারি কক্ষ বরাদ্দ পাওয়ার পর এখন কার্যালয় রক্ষণাবেক্ষণ ও নিত্যপণ্য কেনার ২১ হাজার টাকা কি সংসদ সদস্যরা ছেড়ে দেবেন? যাতায়াত ও ভ্রমণভাতা বাবদ এত এত টাকা পাওয়ার পরও কি তারা বলবেন, গাড়ি কিনতে পারছেন না, ভাড়ায় চলতে হয়?
৬.
সংসদ নির্বাচনে জয়ের আগে যিনি বলেছিলেন, আমরা কি গাড়ির সুবিধা নিতে সংসদে যাব, তিনি এখন তার অবস্থানের সমালোচনা করায় মিডিয়াকে দোষারোপ করছেন! নিজের দাবির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে পরের দিন ফের অযাচিতভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি-সুবিধার প্রসঙ্গ টেনেছেন। ‘কোটাসংস্কার আন্দোলনে’র স্পিরিট ছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্য কমানো এবং এর পক্ষে বাংলাদেশের আপামর জনতা ছিল। সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেওয়ায় রাজনীতিতে প্রভূত পটপরিবর্তন ঘটেছে।
আন্দোলন কোটা সংস্কারে শেষ হয়ে গেলে, ধরে নেওয়া যায়, আন্দোলনের সমন্বয়ক থেকে কর্মী—সকলেই সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ফিরে যেতেন। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের যে আকাঙ্ক্ষা, তার সঙ্গে অনেক কিছুই যুক্ত থাকে। এর মধ্যে সরকারি নানান সুবিধা ও অদৃশ্য ক্ষমতার হাতছানি থাকে উপরের দিকেই। এখন একজন জনপ্রতিনিধি যদি সেসব সরকারি সুবিধাই ‘অধিগ্রহণ’ করতে চান, তাহলে রাজনীতিতে না প্রবেশ করে, জনপ্রশাসনেই তো যেতে পারতেন!
একজন সংসদ সদস্যের প্রধানতম কাজ আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু, জনগণের সঙ্গে দেখা করার জন্য যিনি প্রকৃতপ্রদত্ত দুটি পা ব্যবহার করতে পারেন না, চার চাকার উপর নির্ভর করতে হয়, সেটার জন্য সংসদের জ্বালানি অপচয় করে আবদার-অনুযোগ করতে হয়, তখন আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না যে, ব্যবস্থার পরিবর্তন তো হয়ইনি, বন্দোবস্তও আগের মতোই রয়ে গেছে। অথচ, চার চাকা চাওয়ার সময় এটুকু মাথায় এলেই হতো যে, দেশে সত্যই তেলের সংকটে জনগণের নাভিশ্বাস অবস্থা, পাম্পে পাম্পে সাধারণ মানুষ তেলের জন্য রাত-দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন!
৭.
হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য, মানে চর্যাপদের আবিষ্কারক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ বিষয়ক একটি মাস্টারপিস প্রবন্ধ আছে। তো তিনি বাঙালির খাসলত বর্ণনা করতে গিয়ে বলছেন, ‘যে সর্ব্বশক্তিময় তৈল ব্যবহার করিতে জানে, সে সর্ব্বশক্তিমান্। তাহার কাছে জগতের সকল কাজই সোজা। তাহার চাকরির জন্য ভাবিতে হয় না—উকীলিতে পসার করিবার জন্য সময় নষ্ট করিতে হয় না, বিনা কাজে বসিয়া থাকিতে হয় না, কোন কাজেই শিক্ষানবিশ থাকিতে হয় না।... তেলের মহিমা অতি অপরূপ। তৈল নহিলে জগতের কোন কার্য্য সিদ্ধ হয় না। তৈল নহিলে কল চলে না, প্রদীপ জ্বলে না, ব্যঞ্জন সুস্বাদু হয না, চেহেরা খোলে না, হাজার গুণ থাকুক তাহার পরিচয় পাওয়া যায় না, তৈল থাকিলে তাহার কিছুরই অভাব থাকে না।’ প্রবন্ধের শেষ বাক্যে তিনি লিখেছেন, ‘এক তৈলে চাকাও ঘোরে আর তৈলে মনও ফেরে।’
জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুধু তাই ‘তামাশা’রই জায়গা না, বরাবরের মতো জ্বালানি নষ্টকারী ‘তৈলমর্দনে’রও জায়গা হয়েছে। বিরোধীদলীয় এক সদস্যের মতানুসারে, দেশে তেলের সংকট থাকলেও সংসদে নাকি তেলের অভাব নেই! তার দলীয় সদস্যদের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই কথাটি প্রযোজ্য? বেশ!
বিদ্যুৎ, হারিকেন, চার চাকা সমাচার—সব দেখে-শুনে বলতেই হচ্ছে, শাস্ত্রী মহাশয়ের কথাই ঠিক। অতএব, তেলমর্দনবিরোধী একটি ‘অনুশাসন’ দিতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আজ্ঞা হয়!