Published : 29 Sep 2025, 01:08 AM
প্রাক্তন সাংবাদিক এবং ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অস্টিনের সাংবাদিকতার শিক্ষক ম্যারি অ্যাঞ্জেলা বক যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়া ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। সময়টা ছিল ২০১৩-১৪ সাল। ততদিনে মার্কিন মুল্লুকে নাগরিক জনপরিসর বসার ঘর, ক্লাব বা কফিশপ থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে। ফেইসবুক, ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো হয়ে উঠেছে নাগরিক আলোচনার মাঠ।
বক লক্ষ্য করলেন, কিছু মানুষ পুলিশের কার্যক্রম অনুসরণ করে ভিডিও রেকর্ড করছেন এবং সেগুলো তাদের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এসব পেইজে মতামতের ঘরে তাদের কাজ নিয়ে নানামুখী জনমত গড়ে উঠছিল।
মূলধারার সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ—আইন, কার্যনির্বাহী ও বিচার বিভাগকে নজরদারি ও জবাবদিহিতার মধ্যে রাখার কাজ করে বলে একে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কিন্তু এখানে নাগরিকরা নিজেরাই পুলিশ বা কার্যনির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারির দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নিচ্ছিলেন। অল্টারনেটিভ জার্নালিজম বা মূলধারার বাইরের সাংবাদিকতা নিয়ে আগ্রহী অধ্যাপক বকের মনে প্রশ্ন জাগল, মোবাইল বা ক্যামেরার সহজলভ্যতা, ভিডিও করতে পারা এবং তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতার কারণে কি এমন ঘটনা ঘটছে? নাকি এটি নাগরিক সাংবাদিকতার একটি নতুন ধারা? যারা এটি করছেন, তারা কারা, কেন করছেন, কীভাবে করছেন এবং তারা নিজেদের কাজকে কীভাবে দেখেন?
এমন সব প্রশ্ন নিয়ে বক নেমে পড়লেন তাদের খোঁজে। পেয়েও গেলেন। প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি তাদের কাঠামোগত পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাৎকার এবং তাদের সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনার মাধ্যমে ২০১৬ সালে তার গবেষণাপত্র ‘Film the Police! Cop-Watching and Its Embodied Narratives’ প্রকাশ করলেন।
তার গবেষণায় বক দেখলেন, বিভিন্ন মতাদর্শ, ধারা এবং বর্ণের মানুষ এই সামাজিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব গল্প নিয়ে এসেছেন। তরুণ থেকে শুরু করে অবসরে আসা বুড়ো অনেকেই আছেন এই দলে। তারা প্রায় প্রতিরাতে শহরের ওইসব এলাকায় যেতেন, যেখানে পুলিশি তৎপরতা থাকত। তারা পুলিশের কার্যক্রম ক্যামেরায় ধরতেন এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করতেন। কেউ কেউ পুলিশের সঙ্গে তর্কেও জড়াতেন।
ততদিনে ‘কপ ওয়াচিং’ নামে এই সামাজিক আন্দোলন পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিল। তারা প্রশিক্ষণ, সেমিনার আয়োজন করতেন, কখনো কখনো প্রতিবাদে রাস্তায় নামতেন। বক সবই পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তবে এই কপ ওয়াচাররা নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে চাইতেন না, বা সাংবাদিকদের মতো ভিডিও করলেও নিজেদের সাংবাদিক বলে স্বীকৃতি নিতে আগ্রহী ছিলেন না। তারা মোটাদাগে এটিকে জনগণের কাছে ক্ষমতার জবাবদিহিতা হিসেবে দেখছিলেন।
বক তার গবেষণায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, নাগরিকরা তাদের শরীর, উপস্থিতি এবং প্রযুক্তি একসঙ্গে ব্যবহার করে এক ধরনের ‘জীবন্ত সাক্ষ্য’ তৈরি করছেন। এটি সাংবাদিকতার বাইরে গিয়ে এক প্রকার নজরদারি, যেখানে ওপরের ক্ষমতাকে নিচ থেকে পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন করার একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া গড়ে উঠছে।
এর প্রায় কাছাকাছি আরেক রূপ আমরা বাংলাদেশে দেখছি। তবে এখানে আরেকটি ধাপ যুক্ত হচ্ছে। নাগরিকরা কেবল ক্যামেরা ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে সাক্ষ্য তুলে ধরছেন না, বরং নিজেদের বিশ্বাস ও ভাবধারা অনুযায়ী সমাজকে রূপ দেওয়ার জন্য নানা কার্যক্রম নিজ হাতে তুলে নিচ্ছেন। বকের কপ ওয়াচাররা যেখানে নজরদারি ও প্রচারে সীমাবদ্ধ ছিলেন, বাংলাদেশে এটি নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এখানে আলাদা আলাদা সামাজিক পরিচয়ভিত্তিক দলীয় ‘অ্যাকশন’ বা ‘পারফরম্যান্স’ যুক্ত হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়েছে, যেখানে কয়েকজন মিলে প্রকাশ্যে একজন বৃদ্ধের চুল কেটে দিচ্ছেন। এই বৃদ্ধ কোনো ভবঘুরে নন, তিনি সেই এলাকারই বাসিন্দা এবং পরিবারের সদস্য। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি তার চুল কাটতে আগ্রহী নন, বারবার আকুতি করছেন। কিন্তু তার সামান্য শক্তি দিয়ে তিনি নিজের চুল রক্ষা করতে পারলেন না, পারলেন না ভিডিওতে এমন নাজেহাল হওয়া থেকে বেঁচে যেতে, নিজের পরিচিত সমাজে একজন অসহায় হিসেবে প্রতীয়মান হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে। ধরাশায়ী হয়ে কেবল বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহ তুই দেহিস’।
এই ঘটনা থেকে প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশের ডিজিটাল জনপরিসরে ক্যামেরা আসলে কী ভূমিকা পালন করছে? এটি কি কপ ওয়াচিংয়ের মতো নাগরিক জবাবদিহিতার শক্তিশালী হাতিয়ার, নাকি সামাজিক শাসন ও মবের অস্ত্র হয়ে উঠছে?
এই বৃদ্ধের চুল কেটে দেওয়ার ভিডিওর পর আরও এমন ভিডিও সামনে আসছে। এখানে এই জায়গায় নজর দেওয়া জরুরি যে, এসব ভিডিও কারা করছেন, কেন করছেন? ঠিক বকের মতোই প্রশ্ন। এসব কাজের বেশিরভাগই হচ্ছে ‘মানবতার’ নামে। কিন্তু এই ‘মানবতা’ কী এবং কীভাবে তা রক্ষা করা হবে, তা প্রত্যেকে নিজের মতো করে ঠিক করছে। এখানে মোটাদাগে দুই ধরনের পক্ষ দেখা যাচ্ছে।
প্রথমত, বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বৃদ্ধের চুল কাটার এই কাজটি ‘হিউম্যান সার্ভিস বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন করেছে। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে এই ধরনের কাজ করে এবং সামাজিক মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম ভিডিও করে প্রচার করে। তাদের নির্দিষ্ট ধর্মীয় আদর্শ রয়েছে, যা থেকে তারা অনুপ্রাণিত।
অন্যদিকে, আরেকটি পক্ষকে দেখা যাচ্ছে যারা নিজেদের প্রায় এনজিওর মত করে উপস্থান করতে চান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নামে। তারা হারিয়ে যাওয়া মানুষ, মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি বা ভবঘুরেদের ধরে তাদের চুল কাটে, খাওয়ায়, নতুন কাপড় দেয় এবং পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়। এসবও তারা ক্যামেরায় ধরে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে, যার ব্যাপক দর্শকও রয়েছে।
কিন্তু এখানে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, এই দুই ক্ষেত্রেই তারা একজন মানুষের জীবনের সঙ্গে কিছু করার দায়িত্ব কীভাবে পাচ্ছেন? কে তাদের এই দায়িত্ব দিচ্ছে, নাকি তারা নিজেরাই এটি নিচ্ছেন? উত্তর হয়তো তাই। কিন্তু এই দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যাদের সাহায্য করার কথা বলা হচ্ছে, তাদের প্রকৃত সম্মতি নেওয়া হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, এই বৃদ্ধ সম্মতি দেননি, তবুও তার চুল কাটা হয়েছে।
আবার, মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের বেলায় ভিন্ন যুক্তি থাকতে পারে। তবে, তাদের আরও বেশি সংবেদনশীলতা ও সাবধানতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত কম। যদি কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ বা হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার মহৎ কাজ করেন, তবে পরিবারের সম্মতি নেওয়া জরুরি। পরিবার কি চায় যে, বাংলাদেশের মতো অসংবেদনশীল সমাজে তাদের সদস্যকে প্রকাশ্যে গোসল করানো, চুল কাটা বা তাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক? এই সম্মতি একটি মৌলিক বিষয়। দ্বিতীয়ত, এই কাজের জন্য ভিডিও ধারণ কেন প্রয়োজন? এবং যদি প্রয়োজন হয়, তবে ব্যক্তির চেহারা, অসহায়ত্ব বা আকুতি কেন প্রচার করতে হবে? পরিবার কি চায় যে, তাদের সদস্যের এমন দুর্বিষহ অবস্থা ডিজিটাল জনপরিসরে প্রকাশিত হোক? এর ফলে সৃষ্ট ট্রমার দায় কে নেবে? মানুষের মানসিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে তার সম্মতিকে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে, ওই বৃদ্ধ ব্যক্তির ক্ষেত্রে ওই ঘটনার পর তার জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তা কিন্তু আমরা তাকে বলতে শুনেছি।
চুল কেটে দেয়া, ভিডিও ধারণ ও প্রচার—এসব ঘটনার একটি ধারা, কিন্তু এর বাইরেও আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ক্যামেরা ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে ফলোয়ার, লাইক-শেয়ার এবং জনমত নিয়ন্ত্রণের জন্য। ক্যামেরা ব্যবহৃত হচ্ছে সামাজিক পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণা ছড়াতে, নির্দিষ্ট বিশ্বাসের মানুষের প্রতি আঘাত বা অপমান করতে এবং মবের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য। গত এক বছরে আমরা দেখেছি, ভিডিওর মাধ্যমে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে, ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে মাজার বা বাউল আসরে আক্রমণ হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ক্যামেরা ও সামাজিক মাধ্যম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে আইন নিজ হাতে তুলে নিয়ে শাসনের ভয় ছড়ানো হচ্ছে এবং সমাজে এটিকে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে যে, এটাই শাসনের পথ।
তাহলে পথ কোনটি? প্রথম পথটি হলো রাষ্ট্রের দিকে তাকানো। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে পথ ও মত কী হবে ওই বিষয়ে। সামাজিক শাসন বা মবের ভিডিও ভাইরাল হলে তা কেবল ‘অভিব্যক্তির স্বাধীনতা’ হিসেবে দেখলে তা সাংবিধানিক ধারা ও আইনের লঙ্ঘন হবে। এসব ভিডিওতে মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইন ভঙ্গ, এবং মানুষ ও সম্পত্তির ওপর আঘাতের প্রমাণ থাকে। রাষ্ট্রকে এগুলো আমলে নিয়ে আইন প্রয়োগ করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে রাষ্ট্র নিজেই এই নিপীড়নের অংশ হয়ে দাঁড়াবে।
দ্বিতীয় পথ হলো নাগরিক সচেতনতা। আপনি একজন নাগরিক হিসেবে ক্যামেরা ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে সঠিক পথে রাখতে পারেন। তবে, কোথায়, কেন এবং কীভাবে এটি ব্যবহার করছেন, তা অন্যের ব্যক্তিগত, সামাজিক বা নাগরিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি না, সেদিকে নজর রাখতে হবে। আশার কথা হলো, কিছু ক্ষেত্রে নাগরিকদের এই জবাবদিহিতা রাজনৈতিক দল বা সিস্টেমকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, রাজনৈতিক দলগুলো এখন অনুষ্ঠানের পর মাঠ পরিষ্কার করে যাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলছে, কারণ নাগরিকরা একটি ছবি, ভিডিও বা লাইভের মাধ্যমে তাদের জবাবদিহি করতে পারছে।
বাংলাদেশের সংবিধান বলে, কারও ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে তার আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র যদি এমন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ না করে, যারা সমাজ শাসনের দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নিয়ে ভিডিও করে জনপরিসরকে প্রভাবিত করছে, তবে সংবিধান ও আইনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দুর্বল হবে এবং তারা ভীত হবে। তখন আমাদেরও ওই বৃদ্ধের মতো করেই বলতে হবে, ‘আল্লাহ তুই দেহিস’।