Published : 24 Dec 2025, 01:30 PM
মৃত্যুর মুখে দিপু চন্দ্র দাস বারবার বলেছিলেন, ‘আমি নবীকে নিয়ে কিছু বলিনি। আমাকে মাইরেন না। বিশ্বাস করেন, আমি কিছু বলিনি।’ পুড়তে পুড়তে ছোট্ট শিশু আয়েশা বলেছিল, ‘আব্বু আমাকে নাও, আমাকে নাও।’ সাম্প্রতিক যে তিনটি ঘটনা সারা বাংলাদেশকে কাঁদিয়েছে, দুঃখ দিয়েছে, যন্ত্রণা দিয়েছে, তার দুটির কথা বললাম। এই তিনটি ঘটনার প্রথমটি শরীফ ওসমান হাদির নির্মম মৃত্যু।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই জন্য ভোট চাইতে মাঠেও নেমে পড়েছিলেন। গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে আক্রান্ত হন তিনি। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুলিটি লাগে হাদির মাথায়। প্রকাশ্য দিবালোকে হাদিকে গুলি করে আততায়ী পালিয়ে গেছেন, পালিয়ে আছেন। গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার মৃত্যু হয়। হাদি শহীদের মতো মৃত্যু কামনা করতেন। একটা ভিডিওতে দেখলাম, হাদি কান্নাকাতর কণ্ঠে বলছেন, ‘ভাই, আমার বাচ্চাটাকে দেইখেন।’ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাদি আর কথা বলতে পারেননি। হাদিকে মেরে ফেলা হতে পারে, তিনি সেটি টের পেয়েছিলেন, প্রকাশ্যে জানিয়েও ছিলেন এ কথা। কিন্তু তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র।
এ তিনটি ঘটনাই যে প্রথম—মোটেও তা নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৬ মাসে এমন অনেক বর্বর, বীভৎস ঘটনা ঘটেছে—যা এখনও চলমান।
বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের নজর এখন তারেক রহমানের দিকে। এ বিষয়টি কোনো একক দলের রাজনৈতিক প্রত্যাশা নয়, কিংবা নিছক দলীয় আনুগত্যের প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ—যারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, তারাও এক ধরনের নীরব প্রতীক্ষায় রয়েছে। এই প্রতীক্ষা কেন— এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যর্থতার গভীরে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ আজও একই রাজনৈতিক সংকটের জটিল বৃত্তে আবদ্ধ। এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; এটি হলো দীর্ঘ দিনের ক্ষমতার অপব্যবহার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয়, প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং জনগণকে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়ার ফল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন হয়ে পড়েছে প্রহসন, সংসদ হয়েছে নির্বাক, বিচারব্যবস্থা আর প্রশাসন হয়েছে দলের অনুগত দাস। এর ফলে রাজনীতি জনতার আস্থা হারিয়েছে, রাষ্ট্র হারিয়েছে তার নৈতিক ভিত্তি। নাগরিক অধিকার হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের ইচ্ছানির্ভর অনুগ্রহ।
এই প্রেক্ষাপটে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল ইতিহাসের অনিবার্য প্রতিক্রিয়া। জনগণ রাজপথে নেমেছিল শুধু সরকার বদলানোর জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর দাবিতে। তারা জানিয়েছিল— ভয়, দমন, বৈষম্য ও নিঃশব্দতার রাজনীতি আর সহ্য করা হবে না। কিন্তু, দুঃখজনক সত্য হলো, অভ্যুত্থানের পরও রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয়নি; বরং তা আরও জটিল, বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
জনগণের একটি বড় অংশ ভেবেছিল—শেখ হাসিনার বিদায়ের মধ্য দিয়েই দেশে শান্তি ফিরবে। কারণ তার সরকারের অধীনে ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সম-অধিকার কার্যত বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। বিরোধী দল দমন, গুম, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি ও ভয়ভিত্তিক শাসন এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো— গত এক বছর চার মাসে সেই চর্চার কি অবসান ঘটেছে? বাস্তবতা হচ্ছে—সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা আজও অধরা। রাষ্ট্র এখনও জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারেনি।
এই শূন্যতা, এই অনিশ্চয়তা এবং এই গভীর আস্থাহীনতার ভেতর থেকেই জনগণ তাকিয়ে আছে তারেক রহমানের দিকে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কি বিকল্প রাষ্ট্রদর্শনের প্রত্যাশা, যেখানে রাজনীতি আবার জনগণের হাতে ফিরবে, আর রাষ্ট্র তার গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনরুদ্ধার করবে, পূরণ করতে পারবেন?
‘এদেশের লাখো কোটি মানুষ চায় তারেক রহমানের জীবন সফল হোক। আমিও তাদের একজন। তার পথের দুপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য কণ্টক। এসবকে এড়িয়ে চলতে হবে তাকে, আর খুঁজে পেতে হবে সৎ, সাহসী, সৃজনশীল বান্ধবদের। জাগ্রত রাখতে হবে সর্বক্ষণ তার বিবেককে। বুদ্ধির পরিবর্তে প্রজ্ঞার নির্দেশ মেনে চলতে হবে। মস্তিষ্কের চেয়ে অন্তকরণের নির্দেশনাই এদেশে অধিক কার্যকর হয়েছে, সবসময়। তারও পথনির্দেশনা দিক তার বিবেক, তার অন্তঃকরণ।’–অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর এ কথাগুলো লিখেছিলেন।
তারেক রহমানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হলো জনগণ–তিনি নিজেই আমাদের এমন ধারণা দিয়েছেন। বারবার বলেছেন—‘বাংলাদেশের জনগণ আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা’। আরও বলেছেন, তার রাজনীতি হবে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক। নারী শিক্ষা, শিশু অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও প্রান্তিক জনগণের অন্তর্ভুক্তিই তার কাজের মূল দিক। তার মতে, রাজনীতি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত হয়।
শ্রমিকের জীবনযাত্রা আজ ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত— ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত নয়, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নেই, দীর্ঘ শ্রমঘণ্টা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিত্যসঙ্গী। কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত, মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের কারণে সাধারণ মানুষের আয় ক্রমেই কমে যাচ্ছে। অর্থনীতির চিত্রও উদ্বেগজনক—মূল্যস্ফীতি, খাদ্য ও জ্বালানির লাগামছাড়া দাম নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। লুটপাট, টেন্ডারবাজি ও অর্থপাচার রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত দুর্বল করেছে, দারিদ্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তা সংকট গভীর চলছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত কার্যত অকার্যকর—সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো দুর্বল, চিকিৎসা ব্যয় মানুষের নাগালের বাইরে, শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য প্রকট, গ্রামীণ শিশু ও যুবকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা বৃদ্ধি, কিশোর গ্যাং, মাদক ও অপরাধের বিস্তার রাষ্ট্রের দুর্বলতারই প্রতিফলন। আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনে দায়বদ্ধতার অভাব, আর রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দোষারোপ জনগণকে রাষ্ট্র থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে কার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। দেশপ্রেম, ইতিহাসের শিক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে সমসাময়িক বিশ্লেষকরা তারেক রহমানকে ভরসার জায়গা হিসেবে মূল্যায়ন করছেন—যার নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং জনগণের ক্ষমতায়নের এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার রয়েছে। বর্তমানে এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান— যিনি অতীতের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের শিক্ষা যেমন ধারণ করছেন, তেমনি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জকেও বাস্তবসম্মতভাবে মোকাবিলার রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একাত্তরের আত্মত্যাগ ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশাকে একসূত্রে গেঁথে তিনি নতুন প্রজন্মের সামনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার দিগন্ত উন্মোচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তারেক রহমান স্পষ্টভাবে ‘সবার বাংলাদেশ’ নির্মাণের রাজনৈতিক অঙ্গীকার করেছেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে যে রাষ্ট্রচিন্তা— তা ‘সবার বাংলাদেশ’ নির্মাণের ভিত্তি। এই দর্শন গণতন্ত্র, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক।
কিন্তু ‘সবার বাংলাদেশ’ গড়তে হলে আগে বাংলাদেশকে জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। গত ৫৪ বছরে গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশকে বারবার রক্ত দিতে হয়েছে। একাত্তর ও ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এটাই— এবার আর থামা যাবে না। সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতেই হবে।
আজ বাদে কাল ফিরছেন তারেক রহমান। এই ফেরা কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়—বহু মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কাছে প্রত্যাবর্তন। আমরা আশা করতে চাই, তিনি বাংলাদেশকে খাদের কিনার থেকে টেনে তুলতে পারবেন। চাওয়াগুলো খুব অলৌকিক কিছু নয়। আমরা চাই নিরাপত্তা—রাস্তায়, ঘরে, মত প্রকাশে। চাই কাজের সুযোগ, ন্যায্য মূল্য, ন্যূনতম সম্মান।
চাই এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে আইন শক্তিশালীদের ঢাল নয়, দুর্বলদের ভরসা হবে। কোনো দিপুকে পুড়িয়ে মারা হবে না। কোনো আয়েশাকে আগুনে পুড়তে পুড়তে কান্না করতে হবে না। আর কোনো হাদি পথের ধারে নিহত হবেন না।