Published : 18 Mar 2026, 12:31 AM
কিউবা আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। জ্বালানি সংকট, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মুহূর্তে রাশিয়া প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে যে, তারা হাভানাকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এই ঘোষণা নিছক কূটনৈতিক বিবৃতি নয়, লাতিন আমেরিকায় রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক উপস্থিতি পুনর্গঠনের অংশ। বর্তমান সংকটকে বোঝার জন্য কিউবা–সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, সোভিয়েত পতনের পর রাশিয়া-কিউবা সম্পর্কের পুনর্গঠন এবং কিউবা–মার্কিন সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতাকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কেননা এই তিনটি স্তরই বর্তমান পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করছে।
কিউবা-সোভিয়েত সম্পর্কের সূচনা ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পরপরই। ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বাতিস্তা সরকারের পতন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। ওয়াশিংটন দ্রুত বুঝতে পারে যে, নতুন কিউবা তাদের প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং ১৯৬১ সালের বে অফ পিগস আক্রমণের ব্যর্থতা কিউবাকে আরও বেশি ঠেলে দেয় সোভিয়েত ব্লকের দিকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন কিউবাকে শুধু আদর্শিক মিত্র হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় একটি কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করে।
১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট এই সম্পর্ককে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও শেষপর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়, তবুও কিউবা সোভিয়েত নিরাপত্তা ছাতার নিচে থেকে যায়। সোভিয়েত ভর্তুকি, তেল, খাদ্য, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা কিউবার অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিউবার অর্থনৈতিক কাঠামো কার্যত সোভিয়েত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কিউবার জন্য ছিল এক গভীর সংকট। ‘স্পেশাল পিরিয়ড’ নামে পরিচিত ওই সময়ে দেশটি তীব্র খাদ্য সংকট, জ্বালানি ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক পতনের মুখোমুখি হয়। রাশিয়া তখন নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যস্ত; কিউবার দিকে তাকানোর সঙ্গতি তার ছিল না। বরিস ইয়েলৎসিনের শাসনামলে রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে যে সুস্পষ্ট পশ্চিমমুখী পুনর্গঠনের ধারা গড়ে ওঠে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাবে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে শীতল হয়ে পড়ে। এই সময়ে মস্কোর কৌশলগত অগ্রাধিকার ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান পুনঃসংজ্ঞায়িত হওয়ায় পূর্ববর্তী সহযোগিতামূলক ধারা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
২০০০ সালের পর পুতিন ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া আবারও লাতিন আমেরিকায় নিজের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করে। ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া ও কিউবা—এই তিন দেশকে কেন্দ্র করে মস্কো একটি নতুন অ্যান্টি‑আমেরিকান আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চায়। কিউবা ওই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে প্রতীকী অংশ, কারণ এটি সোভিয়েত যুগের স্মৃতি বহন করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিকটতম ভৌগোলিক অবস্থান রাশিয়াকে কৌশলগত সুবিধা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে কিউবা-রাশিয়া সম্পর্ক আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বর্তমান সংকটে রাশিয়ার ভূমিকা তাই এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই অংশ। কিউবা এখন তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার ফলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় রাশিয়া বলছে, তারা কিউবাকে জ্বালানি সরবরাহ, আর্থিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। যদিও এখনো বড় কোনো তেলের চালান প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি, তবুও মস্কোর বক্তব্য স্পষ্ট, তারা কিউবাকে একা ছেড়ে দেবে না। এটি শুধু মানবিক সহায়তা নয়; এটি রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান পুনঃবিন্যাসের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
কিউবা-মার্কিন সম্পর্কের ইতিহাসও এই সংকটকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬০ সাল থেকে কিউবার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ বজায় রেখেছে। ওবামা প্রশাসনের সময় কিছুটা উষ্ণতা দেখা গেলেও ট্রাম্প প্রশাসন আবারও নিষেধাজ্ঞা কঠোর করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী হলেও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বাস্তবতা ওই পথকে জটিল করে তুলেছে। ফলে কিউবা বাধ্য হচ্ছে বিকল্প শক্তির দিকে তাকাতে—যেখানে রাশিয়া ও চীন উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রাশিয়া এই সুযোগকে ব্যবহার করে কিউবাকে আবারও নিজের প্রভাববলয়ে টেনে নিতে চাইছে।
রাশিয়া-কিউবা সামরিক সম্পর্কও নতুন করে জোরদার হচ্ছে। ২০২৫ সালে রাশিয়ার দুমা কিউবার সঙ্গে একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি অনুমোদন করেছে। এই চুক্তির আওতায় দুই দেশ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে যে কিউবান নাগরিকদের ইউক্রেইন যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে, যদিও হাভানা বলছে এটি মানবপাচার চক্রের কাজ। তবুও এই অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে। রাশিয়া এই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে কিউবাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে নিজের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছে।
বর্তমান সংকটে রাশিয়ার ভূমিকা তাই তিনটি মাত্রায় কাজ করছে। প্রথমত, তারা কিউবাকে জ্বালানি ও মানবিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা কিউবার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, তারা কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করছে। ওয়াশিংটন যখন কিউবার মানবাধিকার পরিস্থিতি বা রাজনৈতিক দমন‑পীড়নের সমালোচনা করে, তখন রাশিয়া পাল্টা যুক্তি দেয় যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাই কিউবার সংকটের মূল কারণ। তৃতীয়ত, লাতিন আমেরিকায় তাদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য হিসেবে রাশিয়া কিউবার সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করছে।
তবে প্রশ্ন হলো, রাশিয়া কি সত্যিই কিউবাকে বাঁচাতে পারবে? রাশিয়ার নিজস্ব অর্থনীতি এখনো ইউক্রেইন যুদ্ধের চাপের মধ্যে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, সামরিক ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট মস্কোর সক্ষমতাকে সীমিত করেছে। কিউবাকে বড় আকারে সহায়তা দিতে গেলে রাশিয়াকে নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে হবে। তবুও রাশিয়া জানে, কিউবাকে হারানো মানে লাতিন আমেরিকায় তাদের প্রতীকী ও কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়ে যাওয়া। তাই মস্কো যতটা সম্ভব কিউবাকে ধরে রাখতে চাইবে।
কিউবার জন্যও রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। চীন অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু সামরিক ও কৌশলগত সমর্থনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কিউবা বাধ্য হচ্ছে বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা।
বর্তমান কিউবা সংকট তাই শুধু একটি মানবিক বা অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি লাতিন আমেরিকায় শক্তির নতুন সমীকরণ গঠনের মুহূর্ত। রাশিয়া এই সংকটকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম গোলার্ধে চাপে রাখতে চাইছে। কিউবা এই সংকটকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সমর্থন খুঁজছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এই সংকটকে দেখছে দীর্ঘদিন ধরে দোরগোড়ায় ঝুলে থাকা এক সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক সংকট মোকাবেলার বিরল ও কৌশলগত সুযোগ হিসেবে। ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া তাই আবারও কিউবাকে ঘিরে উপস্থিত হয়েছে—সোভিয়েত পর্বের অভিজ্ঞতা, শীতল যুদ্ধের কাঠামোগত উত্তেজনা এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার উদীয়মান বাস্তবতা বর্তমানে নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সামনের দিনগুলিতে কিউবার ভবিষ্যৎ।