Published : 08 Feb 2026, 08:36 PM
প্রকৃতির আদিম রূপ আর পাহাড়ের নিজস্ব ছন্দকে বলি দিয়ে যে উন্নয়ন আসে, তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংসও ডেকে আনে। তাই অনেক সময় দুর্গমতাও হয়ে ওঠে প্রাণ-প্রকৃতির রক্ষাকবচ। খাগড়াছড়ির ‘মায়ুং কপাল’ বা ‘হাতি মাথা’র সেই খাঁড়া সিঁড়ি আর এবড়োথেবড়ো মাটির পথই হয়তো এখনও এই জনপদটিকে নাগরিক আগ্রাসন থেকে আড়াল করে রেখেছে। দুর্গম পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে থাকা সরল জীবনবোধ, মাটির ঘরের ঘ্রাণ আর কুয়োর পানির স্নিগ্ধতা যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—সবখানে গাড়িতে চড়ে পৌঁছে যাওয়ার রাস্তা বানাতে নেই। কিছু পথ কেবল পায়ের ছাপ আর ঘামের গন্ধেই সার্থক; কারণ এই দুর্গমতাটুকুই বাঁচিয়ে রাখে পাহাড়ের আত্মা।
মায়ুং কপাল বা ‘হাতি মাথা’, যা অনেকের কাছে ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ নামেও পরিচিত, সেখানে যাওয়া সহজ নয়—এমনটা শুনে আসায় আমিও এতদিন সেখানে যাওয়ার সাহস দেখাইনি। কিন্তু এবারের নিয়মিত আড্ডায় হঠাৎ মায়ুং কপাল জয় করার সিদ্ধান্ত হলে সেই সুযোগটি আর হাতছাড়া করিনি।
খাগড়াছড়ি সদর থেকে পানছড়ি সড়ক ধরে টমটমে করে ১০ মিনিট গেলেই সিঙ্গিনালা। সেটি পেরিয়ে জামতলিতে নেমে পশ্চিম দিকে কিছুক্ষণ হাঁটলেই চেঙ্গী নদী। শীতকাল এলে নদীটির পানি একেবারে তলানিতে ঠেকে যায়, ফলে সহজেই হেঁটে পার হওয়ার উপযোগী হয়ে ওঠে। ভরা মৌসুমে অবশ্য নৌকা দিয়ে পারাপারের সুবিধা থাকে। তবে নদী শুকিয়ে গেলে নৌকার বদলে বাঁশ ও কাঠের সাঁকো তৈরি করে দেওয়া হয়, যা ব্যবহারের জন্য মাঝিরা ১০ টাকা করে নিয়ে থাকেন। অবশ্য কেউ যদি সাঁকো ব্যবহার না করে হেঁটে নদী পার হয়, তবে এই টাকা দিতে হয় না।
নদী পার হয়ে ওপরে উঠলেই পল্টন জয় পাড়া। পাড়ার মাঝবরাবর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকলে বড় প্রজাতির কিছু শুকর দেখা যায়। আমাদের দলের একজন বড় জাতের শুকর দেখে বলে উঠলেন, ‘মংদা, ছবি তোলেন, অনেক বড় প্রাণী!’ পাহাড়ে এক সময় স্থানীয় ছোট প্রজাতির শুকরের চাষ হতো, কিন্তু এখন সবখানে বড় প্রজাতির শুকর ভরে গেছে।
এখানে কোনো ইট বিছানো পাকা রাস্তার অস্তিত্ব নেই, ফলে গাড়ি-ঘোড়ার শব্দ শোনার সুযোগও নেই। নদীর পাড়ে পল্টন জয় পাড়া, তারপরই লারমা পাড়া। এখানে মূলত চাকমা ও ত্রিপুরাদের বসবাস। লারমা পাড়া ও পল্টন জয় পাড়া একটি ছোট ছড়াকে (পাহাড়ি ঝরনা বা খাল) কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়েছে। মূলত এই ছড়াকে কেন্দ্র করেই এখানকার কৃষি ও ক্ষেত-খামার গড়ে উঠেছে। তবে ছড়াটির পানি শুকাতে শুকাতে এখন অনেকটা মৃতপ্রায়।
ছড়া মানেই যেখানে ছোট ছোট মাছের ছোটাছুটি থাকার কথা, সেখানে এখন তার চিহ্নমাত্র নেই। বর্ষা মৌসুমে ছড়ার পানি বাড়লে চেঙ্গী নদী থেকে কিছু মাছ উজানে আসলেও আসতে পারে। লারমা পাড়া ছাড়াও এখানে বেলতলী ও চেলাছড়া নামে আরও দুটি পাড়ার নাম পাওয়া যায়। পাড়াগুলোতে এখনো মাটির তৈরি অনেক ঘরের উপস্থিতি দেখা যায়; এমনকি অনেকে নতুন করে মাটির ঘর নির্মাণও করছেন।
পাহাড় চড়ার আগে একটি ছোট চায়ের দোকান আছে। উঁচু পাহাড়ে ওঠার শক্তি সঞ্চয় করতে তাজা কলা খেয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যই যেন এই দোকানটি এখানে বসানো হয়েছে। পাহাড়ের চড়াই শুরু করলে আর থামাথামির অবকাশ নেই, শুধু ওপরে উঠতেই হয়। টানা ৩০-৪০ মিনিট আঁকাবাঁকা আর এবড়োথেবড়ো মাটির পথ ধরে ওঠার পর একসময় আশার আলো হিসেবে দেখা মেলে কলাবাগান, কয়েকটি ঘর এবং বিশাল এক বটবৃক্ষের ছায়ায় ঘেরা একটি দোকানের। দেখলেই বোঝা যায়, এটিই পাড়ার কেন্দ্রবিন্দু। তরুণদের অলস সময় পার করার জন্য সেখানে সারাদিন ক্যারাম খেলার সুযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, তরুণরা এখানে বাজি ধরে খেলে এবং ক্যারাম বোর্ডের মালিক প্রতি খেলায় ১০ টাকা করে পান। পর্যটকদের শক্তি জোগাতে ভাগ্য ভালো থাকলে এখানে তাজা ডাবও পাওয়া যায়। যাওয়ার সময় আমরা ডাব না পেলেও ফেরার পথে ডাব খেয়ে যেন অমৃতের স্বাদ পেয়েছি। বড় জাতের প্রতিটি ডাবের দাম রাখা হয়েছে ১০০ টাকা। এছাড়া এখানে চা, বিস্কুট কিংবা বোতলজাত পানীয় জলেরও কোনো অভাব নেই।

তবে স্থানীয়দের পানীয় জলের একমাত্র অবলম্বন হলো সেই পুরোনো দিনের কুয়োর পানি। এই পাড়ায় কোনো টিউবওয়েল নেই; হয়তো পাথুরে মাটি হওয়ার কারণে টিউবওয়েল স্থাপনে মিস্ত্রিদের আগ্রহ কম। আমি নিজে নারীদের পাশাপাশি শিশুদেরও কুয়ো থেকে পানি সংগ্রহ করতে দেখেছি। পাড়াটির নাম ‘কাপতলা’, যার অর্থ হলো সিঁড়ি। এটি একটি ত্রিপুরা শব্দ। এই পাড়ায় প্রায় ৬৫টি পরিবারের বসবাস।
পাড়ার ছেলেমেয়েদের জন্য কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। ২০১৩ সালে স্থাপিত একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষকরা কোনো বেতন-ভাতা পান না বলে জানালেন শহীদ ময় ত্রিপুরা, সুমন ত্রিপুরা ও লালু ত্রিপুরা। শহীদ ময় ত্রিপুরার ছেলে কাপতলা পাড়া থেকে পল্টন জয় পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশোনা করে। শহীদ ময় বললেন, তার বড় ভাই ৩২ বছর বয়সী রনেশ ময় ত্রিপুরা এই পাড়ার একমাত্র ব্যক্তি যিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণ করেছেন।
কাপতলা পাড়া থেকে মায়ুং কপালের সিঁড়ি পর্যন্ত যাওয়ার পথটি অনেকটা সমতল, তাই খুব একটা কষ্ট হয়নি। যাওয়ার পথে দেখা যায় ত্রিপুরা নারীরা আপন মনে নিজেদের মাটির ঘর কিংবা শনের চালের ঘরের উঠানে বসে একাগ্রচিত্তে কোমর তাঁত বুনছেন। পাহাড়ে আম চাষের বিপ্লবের জোয়ারে দেশীয় আমগাছগুলো এখন বিলুপ্তির পথে হলেও, এই পাড়ায় এখনো পুরোনো দিনের বিশাল সব আম ও কাঁঠাল গাছ সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। সুমন ও শহীদ ত্রিপুরারা প্রতি সপ্তাহে নিজেদের বাগানের কলা বিক্রি করেন। বাজার পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারলে শহর থেকে ব্যবসায়ীরা এসে সেগুলো কিনে নিয়ে যান। তাদের মতে, এখন কলার দাম বেশ ভালো; যে কোনো আকারের এক ছড়া কলা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।
সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছাতে আরও ২০-২৫ মিনিট সময় লাগল। জানা গেল, এই আধুনিক সিঁড়ি তৈরির আগে এখানকার বাসিন্দারা বাঁশের সিঁড়ি বানিয়ে চলাচল করতেন। সিঁড়ির গোড়ায় একটি নির্মাণ ফলক রয়েছে। সেখানে লেখা আছে—পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে ২০১৫ সালে এটি নির্মিত হয় এবং তৎকালীন পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা এটি উদ্বোধন করেন।

যাদের উচ্চতাভীতি রয়েছে, তাদের জন্য এই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা বেশ সাহসিকতার ব্যাপার হতে পারে। খাড়া সিঁড়ি দেখে যাদের ভয় লাগে, তারা হয়তো আর না এগোনোর সিদ্ধান্তই নেবেন। আমি পাহাড়ের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ওপরে ওঠার সময় একপর্যায়ে ভয় আমাকে জাপটে ধরেছিল। উঠব কি উঠব না—এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলে সম্প্রতি তাইওয়ানে ১০১ তলায় কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই আরোহণকারী সেই ব্যক্তির কথা ভেবে সাহস সঞ্চয় করি এবং ধীরে ধীরে উঠতে থাকি।
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় মনে হলো, যারা নিচের দিকে তাকিয়ে বা চারপাশ দেখতে দেখতে ওঠার চেষ্টা করবেন, তাদের জন্য এটি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে পারে; এমনকি হাত-পা কাঁপা শুরু হওয়াও বিচিত্র নয়। তবে সিঁড়িতে হাত দিয়ে ধরার জন্য রেলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে, তাই পড়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। ভয় কাটিয়ে শুধু সামনের দিকে অর্থাৎ ওপরের দিকে তাকিয়ে এগোলে একসময় চূড়ায় পৌঁছানো নিশ্চিত।
চূড়ায় দাঁড়িয়ে পূর্ব দিকে তাকালে ভয় কাটিয়ে ওপরে ওঠার সমস্ত কষ্ট মুহূর্তে মিলিয়ে যাবে। আমি আলুটিলা পাহাড় থেকে অনেকবার খাগড়াছড়ি শহরটি দেখেছি; কিন্তু আলুটিলা থেকে খাগড়াছড়ি দেখার সঙ্গে মায়ুং কপাল থেকে দেখার অনুভূতির কোনো তুলনা হয় না। এখান থেকে শহর দেখার অভিজ্ঞতা দারুণ আনন্দের। চারদিকে শুধু চোখজুড়ানো সবুজের সমারোহ; এর মাঝে মাঝে কেবল দু-একটি উজ্জ্বল মানবস্থাপনা দেখা যায়, বাকি সবটুকুই নিবিড় অরণ্য। সিঁড়ির শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে পারলে পাহাড় ভেদ করে বেড়ে ওঠা নানা প্রজাতির গাছের পাতা, ফুল ও ফল ছোঁয়ার এক অদ্ভুত আনন্দ পাওয়া যায়। সিঁড়ির একদম চূড়ায় উঠতে পারলেই কেবল ‘সম্রাংখ্রং’ গাছের চূড়ায় ফুটে থাকা ফুলের সঙ্গে মিতালি করা সম্ভব।
চূড়ায় ওঠার আনন্দ আর চারপাশের প্রকৃতি দেখার রেশ কাটতে না কাটতেই আপনার ভুল ভাঙিয়ে দিতে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে পাহাড়টি যেন ডেকে বলবে—‘যেখানে উঠেছ, সেখানেই শেষ নয়’। আরও উঁচুতে থাকা চকচকে পাথুরে পাহাড়ের দেয়ালের সেই ডাকে সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। সাহস নিয়ে এগিয়ে চললে আরও ২৫ মিনিট ব্যয় করে অনায়াসেই কয়েক ধাপ পেরিয়ে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব। ঢেউখেলানো পাহাড়ি পথ বেয়ে এগোতে থাকলে একসময় দেখবেন সমস্ত পাহাড়ের চূড়ায় কেবল আপনিই দাঁড়িয়ে আছেন। আপনাকে কাছে পেয়ে পাহাড়টি যেন আশেপাশের সব চূড়াকে চিৎকার করে বলবে—‘দেখো, আমিই এখন সবার ওপরে!’ আপনার পায়ের ছোঁয়া পেয়ে পাহাড়টি যে আনন্দে নাচছে, তা আপনি নিজেই তখন উপলব্ধি করতে পারবেন।
এত এত পাহাড় পেরিয়ে পাহাড়ের বাসিন্দারা কত কষ্টে আমাদের জন্য তাদের উৎপাদিত সেরা ফসলগুলো বাজারে নিয়ে আসছেন, আর কতটা ঘাম ঝরিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পরিবারের জন্য বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন—তা কাছ থেকে দেখার এক দারুণ উপায় হতে পারে মায়ুং কপাল সিঁড়ি দেখার এই ভ্রমণটি। শহরে বসবাসকারীদের কাছে এই অভিযানটি কেবল আনন্দ ভ্রমণ নয়, বরং স্কুলহীন ও পানীয় জলের আধুনিক প্রযুক্তিহীন পরিবেশে মানুষ কীভাবে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তার একটি বাস্তব শিক্ষা সফরও হয়ে উঠতে পারে। শহীদ ময় ত্রিপুরা তো বলেই ফেললেন, ‘আপনারা আমাদের কুয়োর পানি পান করা দেখে অবাক হতে পারেন, কিন্তু আমরা শহরে গিয়ে টিউবওয়েলের পানি পান করলে আমাদের গলায় ঠান্ডা লেগে যায়।’
হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এই পাড়াটি তথাকথিত উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের নজরে পড়বে। পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার কথা বলে একদিন এখানে পাকা রাস্তাঘাট হবে। তারপর বিত্তবানরা নানা কৌশলে পাহাড় ও জমিগুলো কিনে নিয়ে আদি বাসিন্দাদের গ্রামছাড়া করবে—এ কথাগুলো হয়তো কেউ কোনোদিন বলবে না, কোথাও লেখাও হবে না। আমরা শহরবাসীরা ‘উন্নয়ন’ বলতে কেবল রাস্তাঘাট আর প্রযুক্তিকেই বুঝি; গ্রামবাসীদের তাদের স্বকীয়তায় রেখে নাগরিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা যে প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে, তা আমরা শিখিনি। রাস্তাঘাট হয়ে গেলে শহরের পাশে সুন্দর একটি ট্রেকিং করার সুবিধা হয়তো বাড়বে, কিন্তু গ্রামবাসীর সরল জীবনযাপন, বুনন শিল্প, মাটির ঘর আর কুয়োর পানি পান করে বেঁচে থাকার গল্পগুলো হারিয়ে যাবে।
আমি উন্নয়নের বিপক্ষে নই; আমি মনে করি তাদের জন্য স্কুল দরকার, কারণ সেখানকার শিশুদের পড়াশোনার কোনো সুযোগ নেই। স্কুল গড়ার পাশাপাশি যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু তার জন্য বড় ট্রাক চলাচলের উপযোগী আধুনিক পাকা রাস্তার প্রয়োজন নেই। গাড়ির রাস্তা হলে বন ও গাছপালা উজাড় হবে; শহরের পাশে মেঠো পথে হাঁটার যে আনন্দ এবং প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা গাছগাছালির যে সজীবতা—তা আর থাকবে না। পাহাড়ের অনেক এলাকা ইতিমধ্যে সেগুন গাছে ভরে গেছে। এমন উন্নয়ন হলে একদিন পাহাড়গুলো চলে যাবে বিত্তবানদের দখলে, স্থানীয়রা হবে ভিটেমাটি ছাড়া। দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের উচ্ছেদ করার নাম উন্নয়ন হতে পারে না।
মায়ুং কপাল এবং এর বাসিন্দারা যে অবস্থায় আছেন, তেমনটিই থাকুন—যাতে ভবিষ্যতে কাউকে তাদের আপন গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে না হয়। ট্রেকিং করতে গিয়ে যদি কয়েক জায়গায় বসে জিরিয়ে নিতে না হয়, তবে সেই ভ্রমণের আনন্দই থাকে না। হাঁটতে হাঁটতে শরীর ঘেমে নেয়ে না উঠলে সেই অভিজ্ঞতায় পূর্ণতা আসে না। খাগড়াছড়ি জেলার একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র মানেই সেখানে গাড়ির রাস্তা বা আধুনিক সব নাগরিক সুবিধা থাকতে হবে—এমন ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। মায়ুং কপাল বর্তমানে যে রূপে আছে, সেটি বজায় রাখা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এই জায়গাটির গুরুত্ব আরও বাড়বে। পর্যটন কেন্দ্র মানেই কেবল কোলাহল, ভিড় আর উচ্চস্বরে গান-বাজনা—এই প্রথা থেকে বের হতে পারলে আমাদের পর্যটন শিল্প যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি বাঁচবে পাহাড়, বন আর ঝরনা। সর্বোপরি, পাহাড়ি মানুষগুলো তাদের নিজেদের মতো করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবেন।
আমাদের সাতজনের দলের মধ্যে চারজন সর্বোচ্চ চূড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলাম। একজন সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে আর এগোয়নি, বাকি দুজন সিঁড়ির অর্ধেক পথ উঠে থামতে বাধ্য হয়েছে। আমার মতে, এটাই ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য। আধুনিক রাস্তা করে দিলে তো সবাই অনায়াসেই চূড়ায় উঠে যাবে; তখন সেই ভ্রমণে বা ট্রেকিংয়ে কোনো সার্থকতা বা আনন্দ খুঁজে পাওয়া যাবে না।