Published : 03 May 2026, 10:06 AM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরান যুদ্ধ শুরু করার সময় ধরে নিয়েছিল এই যুদ্ধ হবে দিন দুয়েকের। তাদের ধারণা ছিল ইরানের প্রথম সারির নেতাদের হত্যা করলে ইরান সাদা পতাকা হাতে নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু দু দিনের মাথায় যুদ্ধ শেষ না হলে কী হবে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে কী হবে বা সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে কী হতে পারে—এসব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রস্তুতিই ছিল না।
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলো। কীভাবে যে এই যুদ্ধ শেষ হতে পারে ডনাল্ড ট্রাম্প কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না, বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোও কোনো কূল-কিনারা পেল না। তুরস্ক ছাড়া ন্যাটোর অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ইরানের কোনো যোগাযোগ নেই। আবার ন্যাটোর দেশগুলো যেহেতু ট্রাম্পের কথা মতো যুদ্ধে যোগ দেয়নি, তাই ট্রাম্প তাদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন।
দুই পক্ষই যুদ্ধ বন্ধ করতে চাচ্ছে, কিন্তু তাদের দুই পক্ষের কথাবার্তা বিপরীতমুখী এবং আক্রমণাত্মক। এই সময় প্রয়োজন একজন মধ্যস্থতাকারী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গে কথা বলতে পারে এমন দেশ খুঁজে পাওয়া গেল মাত্র দুটি: তুরস্ক ও পাকিস্তান। ইরান বলল, দুই দেশের যেকোনোটির সঙ্গে কথা বলতে তাদের আপত্তি নেই। ট্রাম্প বেছে নিলেন পাকিস্তানকে। নিশ্চয়ই অনেকে আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। কারণ তুরস্ক পশ্চিমা জোট ন্যাটোর সদস্য, তা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুব জটিল। সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের রয়েছে প্রতিরক্ষা চুক্তি, আবার ইরানের সঙ্গে রয়েছে পাকিস্তানের স্থল সীমান্ত। ট্রাম্প কারো কথা শোনার লোক নন, তাই এই নিয়ে বড় শক্তিগুলোরও কোনো উৎসাহ ছিল না। এটা ছিল পাকিস্তানের জন্য কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে মধ্যস্থতা করার জন্য পাকিস্তানের এগিয়ে আসাও কম আশ্চর্যের নয়; এ যেন ‘হাতি-ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল!’
কিন্তু ট্রাম্প কেন পাকিস্তানকে বেছে নিলেন? ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তারপর অনেকগুলো বছর পাকিস্তান ছিল কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত। যারা বিগত বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের অবস্থানের ওঠানামা দেখেছেন, তারা আশ্চর্যের সঙ্গে দেখলেন ইরান যুদ্ধ কীভাবে আবার পাকিস্তানকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। কেনইবা পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের বদনজরে চলে গিয়েছিল এবং কীভাবে আবার সুনজরে ফিরে আসল—সেই এক লম্বা গল্প।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিন লাদেনকে দায়ী করে এবং হন্যে হয়ে তাকে খুঁজছিল। তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের একটা রুটিন কাজ ছিল প্রতি তিন মাস পরপর যুক্তরাষ্ট্র সফর করে তাদেরকে আশ্বস্ত করা যে, বিন লাদেন পাকিস্তানের নাগালের মধ্যে এবং যেকোনো সময় ধরা পড়তে পারেন। তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রচুর অনুদান দিয়েছিল পাকিস্তানকে। অথচ আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসন এবং পরে তালেবান সরকারের পতনের পর পাঁচ বছর ধরে ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানেই বসবাস করছিলেন—অনেক সাংবাদিকের মতে পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর আশ্রয়ে।
২০১১ সালের মে মাসের শুরুর দিকে এক পরিষ্কার রাতে মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো দল ‘সিলস’ পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহরে ওসামা বিন লাদেনের গোপন আস্তানা খুঁজে পায় এবং তাকে হত্যা করে। এই ঘটনা ছিল পাকিস্তানের জন্য দারুণ লজ্জাজনক। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করার মার্কিন প্রচেষ্টায় পাকিস্তান সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়েছে—যদিও দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সহায়তা পেয়ে থাকে।” প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, বিন লাদেনের উপস্থিতির বিষয়ে পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সবকিছুই জানতেন।
এরপর পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্ক একদম ভেঙে পড়ে এবং গত বছরের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগপর্যন্ত পাকিস্তান ছিল মার্কিনিদের কালো তালিকায়। ২০২৪ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনাধ্যক্ষ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ‘বীরত্ব’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চোখে পড়ে এবং তিনি আসিমকে হোয়াইট হাউসে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ালেন। গত বছর ইসরায়েল ছাড়া পাকিস্তান ছিল অন্য আরেকটা দেশ, যে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিতে সুপারিশ করেছিল। তারপর থেকে পাকিস্তান রয়েছে ট্রাম্পের দারুণ সুনজরে।
তবে এইবারই প্রথম নয়, এর আগেও পাকিস্তান একসময় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের খুব ঘনিষ্ঠ। ষাট ও সত্তর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার স্নায়ুযুদ্ধ যখন তুঙ্গে ছিল, পাকিস্তান ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কমিউনিস্টবিরোধী জোটের সদস্য। ভারত ছিল রাশিয়ার বন্ধু। প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে ভারতের ছিল সীমান্ত নিয়ে তুমুল বিরোধ। সেই সূত্রে চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিল বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান যখন বাংলাদেশে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র কোনো চেষ্টাই করেনি পাকিস্তানকে নিবৃত্ত করতে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল আরেক কূটনীতি—কীভাবে পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়া যায়! এই প্রয়াসে তখন দূতিয়ালি করেন পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দ।
১৯৭১ সালের মাঝামাঝি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে বহনকারী পাকিস্তানের একটি সরকারি বিমান রাতের আঁধারে ইসলামাবাদ থেকে বেইজিংয়ে যায়। এই সফরটি ছিল অত্যন্ত গোপন; এর মধ্যস্থতাকারী ছিল পাকিস্তান এবং এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী। সেই সফরের সূত্র ধরে পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীন সফর করেন এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, চীন কূটনীতিতে সহায়তা করার কারণে যুক্তরাষ্ট্র পুরস্কারস্বরূপ বাংলাদেশে গণনিধন চালিয়ে যেতে পাকিস্তানকে সহায়তা করে এবং অনেকদিন ধরে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি।
কিন্তু পাকিস্তানের ভাগ্যও বেশিদিন সুপ্রসন্ন থাকেনি। পরে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধ শিথিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নত হতে থাকে এবং একটা সময় ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের উষ্ণতা পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যায়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মোদি-ট্রাম্প বন্ধুত্ব পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এখন আসিম মুনির ও ট্রাম্পের বন্ধুত্ব এবং বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে পাকিস্তানের প্রচেষ্টা যেভাবে সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে, তা ভারতের জন্য দারুণ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। ভারতের প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করতে গিয়ে বিবিসি বলেছে, “দিল্লিতে গুঞ্জন স্পষ্ট: পাকিস্তান যখন মার্কিন-ইরান সংকটে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে, তখন কি ভারতকে কোণঠাসা করা হচ্ছে? ইসলামাবাদ অস্বাভাবিক তৎপরতার সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছে।”
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার অকর্মণ্যতা এবং অপ্রাসঙ্গিকতার জন্য কটাক্ষ করা হচ্ছে। অবশ্য দিল্লিতে সর্বদলীয় এক বৈঠকে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের ভূমিকাকে ‘দালালি’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন।
পাকিস্তানের সীমিত সামর্থ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়ে অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, নিজেদের প্রভাব ছাড়া মধ্যস্থতা করার বিপদও আছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ যুদ্ধ নিয়ে দারুণ উত্তেজনাকর সময় পার করছেন। তাদের যেকোনো একপক্ষের রোষে পড়লে দূতিয়ালি করতে যাওয়া পাকিস্তানের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্পের যে অস্থির স্বভাব, তার নেকনজরে পাকিস্তান কতদিন টিকবে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তবে এটাও ঠিক—আন্তর্জাতিক রোলার কোস্টারে ওঠানামা করার অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের এই প্রথম নয়। শেষ পর্যন্ত যদি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়, তবে পাকিস্তান অনেকভাবেই পুরস্কৃত হবে—নিঃসন্দেহে উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক অনুদান আসবে এবং বিশ্বের অনেক দেশই পাকিস্তানকে আরও মর্যাদার চোখে দেখবে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক