২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

পণ্যের মোহে মগজের বন্দিদশা

নতুন মডেলের ফোন কিনতে ইচ্ছে করছে? সেই চাহিদাও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যা আপনি টেরও পাচ্ছেন না।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 22 Sep 2026, 04:33 PM

Updated : 22 Sep 2026, 04:33 PM

নতুন একটি দামি স্মার্টফোন বাজারে আসা মাত্রই সেটি কেনার তীব্র বাসনা জাগা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা দেখে নিজের জীবন ও রূপ নিয়ে হঠাৎ হীনম্মন্যতায় ভোগা আধুনিক নাগরিক জীবনে যেন পরিচিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেকেই ভাবেন, এই প্রাত্যহিক ইচ্ছা বা চাহিদাগুলো সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বাভাবিক মানসিক প্রবৃত্তি।

তবে আধুনিক আচরণ বিজ্ঞান, দর্শন এবং সমাজ-মনস্তত্ত্বের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষের অবচেতনের এই চাহিদাগুলো আসলে সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়; বরং বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতি বা পুঁজিবাদ অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে মানুষের মন ও মস্তিস্ককে নিয়ন্ত্রণ করছে।

মনস্তাত্ত্বিক দর্শনে একে বলা হয় ‘প্রোডাক্টিভ ডিজায়ার’ বা আকাঙ্ক্ষার পুঁজিবাদী রূপান্তর, যা মানুষকে অনবরত এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে অংশ নিতে বাধ্য করে।

মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক পোর্টাল ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, স্পেনের বার্সেলোনার লেখক, দার্শনিক ও ‘মাইন্ডফুলনেস’ প্রশিক্ষক ড. ফিন জ্যানিং বলেন, “আপনার মূল্য কেবল আপনার উৎপাদন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না’ — এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি অনুধাবন করাই পুঁজিবাদের মানসিক অবসাদ থেকে স্নায়ুতন্ত্রকে মুক্ত রাখার প্রধান চাবিকাঠি।

পুঁজিবাদের এই ছদ্মবেশী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং মানুষের ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণের ৩টি রূপরেখা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তিনি।

ফরাসি দর্শন ও পুঁজিবাদি প্রভাব

ড. ফিন জ্যানিং, বিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী ফরাসি দার্শনিক গিলস দেলেউজ এবং মনোবিদ ফেলিক্স গুয়াত্তারি-র মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, “দেলেউজ, তার বই ‘ডিফারেন্স অ্যান্ড রিপেটিশন’-এ উল্লেখ করেছেন, ‘দর্শনের প্রধান কাজই হল, মানুষের চিন্তাকে সেইসব ‘মেকি ফ্রেম’ বা ‘ইমেজ’ থেকে মুক্ত করা, যা তাকে অবচেতনে বন্দি করে রাখে।”

প্রথানুযায়ী ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বে, ইচ্ছাকে কোনো কিছুর ‘অভাব’ হিসেবে দেখা হলেও, দেলেউজের মতে আকাঙ্ক্ষা আসলে একটি সক্রিয় উৎপাদনকারী শক্তি। এটি মানুষের শরীর, অর্থ, প্রযুক্তি, স্ট্যাটাস এবং সামাজিক সম্পর্ককে একটি অদৃশ্য শেকলে অনবরত যুক্ত করে মানুষের দৈনিক আচরণে প্রভাব ফেলতে থাকে।

পুঁজিবাদের ছদ্মবেশী আগ্রাসন ও ‘স্ট্যাটাসের চাপ’

গবেষণায় দেখা গেছে, পুঁজিবাদ কেবল মানুষের শারীরিক শ্রমই শোষণ করে না, বরং এটি মানুষের অবচেতন মনের ভেতর প্রবেশ করে তাকে শেখায়— কী চাওয়া উচিত, কাকে সম্মান করা উচিত এবং নিজেকে সমাজে টিকিয়ে রাখতে কেমন মানুষ হওয়া দরকার।

নিজেকে প্রজেক্ট ভাবার মানসিক বাতিক

ড, জ্যানিং সতর্ক করে বলেন, “আধুনিক মানুষ দিন দিন নিজেকে এক একটি বাণিজ্যিক প্রজেক্ট ভাবতে শুরু করেছে।”

মানুষ সারাক্ষণ নিজের ‘স্কিল’, ‘বডি প্যারামিটার’, ‘ক্যারিয়ার’ ও সম্পর্কের উৎপাদন ক্ষমতা নিজেই মনিটর বা পরখ করে এবং অন্যের সঙ্গে তুলনা করে অবিরত ভাবেন— ‘আমি কি আদৌ যোগ্য বা যথেষ্ট?’

এই সর্বগ্রাসী মানসিকতা, মস্তিস্কে তীব্র চাপ তৈরি করে এক অন্তহীন ‘স্ট্যাটাস অ্যাংজাইটি’ বা সামাজিক মর্যাদার আতঙ্কের জন্ম দেয়।

ফলে আলঝেইমার’স রোগ বা ‘ক্রনিক বার্নআউট’-এর মতো স্নায়বিক ধকলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

অর্থনৈতিক মূল্য বনাম মানুষের আত্মিক সার্থকতা

পুঁজিবাদ এবং বাণিজ্যিক বাজার মানুষের বাস্তবতাকে এক ধরনের অবাস্তব মোড়কে বন্দি করে ফেলে। যেমন, ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা ‘হিউম্যান রিসোর্স’ (মানব সম্পদ)-এর মতো কর্পোরেট পরিভাষাগুলো মানুষের অন্তিম মূল্যকে শুধুই তার উৎপাদন বা বাজারের অর্থনৈতিক মূল্যের সঙ্গে গুলিয়ে দেয়।

ড. জ্যানিং একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “যদি একজন মানুষের মূল্য কেবল তার উৎপাদন ক্ষমতার ওপরই মাপা হয়, তবে যেদিন সে আর উৎপাদন করতে পারবে না, সেদিন তার অস্তিত্বের সার্থকতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?”

এই বিপজ্জনক ফাঁদ থেকে বাঁচতে নিজের ইচ্ছার গতিপথকে পুঁজিবাদী চাহিদার ছক থেকে সচেতনভাবে মুক্ত করা অপরিহার্য।

পুরানো খবর:

প্রতিদিন আনন্দ লাভের রুটিন গড়তে

পুরানো খবর:

মাস শেষে মানিব্যাগ ফাঁকা করতে না চাইলে

পুরানো খবর:

যে মানসিক অবস্থার কারণে বেশি কেনাকাটা করা হয়