'ফাব্বিং': কথোপকথনের মাঝে ফোন ব্যবহারের ক্ষতিকর অভ্যাস
আড্ডার মাঝে প্রিয় মানুষের সামনে অনবরত ফোন দেখার অভ্যাসে সম্পর্ক বিষিয়ে যেতে পারে।
আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে স্মার্টফোন দৈনন্দিন অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। অফিসের জরুরি কাজ সামলানো থেকে শুরু করে বিনোদনের জন্য অনবরত স্ক্রিন স্ক্রোল করা এখন একটি সার্বক্ষণিক অভ্যাসে যেন পরিণত হয়েছে।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তির প্রতি এই অতিরিক্ত আসক্তি কেবল মনোযোগের ক্ষমতা বা কর্মক্ষমতাই কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং এটি সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে অলক্ষ্যে ধ্বংস করে চলেছে।
‘টুডে ডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আড্ডার মাঝে বা প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় অবচেতনভাবে ফোন হাতে নেওয়ার এই ক্ষতিকর অভ্যাসকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘ফাব্বিং’ বলা হয়, যা মূলত ‘ফোন’ এবং ‘স্নাবিং’ বা ‘অবহেলা’ শব্দ দুটির সংমিশ্রণ।
মস্তিষ্কে ডোপামিনের চাহিদা ও ফাব্বিং-এর শুরু
মার্কিন মনোরোগ চিকিৎসক নিরো ফেলিসিয়ানো প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “মানুষ সাধারণত তখন ‘ফাব্বিং’ করে যখন সে সামনের মানুষের সঙ্গে চলমান কথোপকথনে সাময়িক একঘেয়েমি অনুভব করে বা মগজ অতিরিক্ত উদ্দীপনা খোঁজে।”
স্মার্টফোনের নোটিফিকেইশন, লাইক বা মেসেজ থেকে এক ধরনের তাৎক্ষণিক আনন্দের রাসায়নিক বা ‘ডোপামিন হিট’ পায় মস্তিষ্ক। ফলে অবচেতন মন যখনই সামান্য একঘেয়ে বোধ করে, তখনই সে হাত বাড়িয়ে ফোনটি তুলে নেয়।
“এটি সামাজিক যোগাযোগের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে এবং অপর পক্ষের মনে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভাবার মানসিক হীনমন্যতা তৈরি করে”, বলেন নিরো ফেলিসিয়ানো।
সম্পর্কের গুণগত মান ও দীর্ঘায়ু হ্রাস
মার্কিন মনোবিদ ডা. সামান্থা বোর্ডম্যানের মতে, “ফাব্বিং’ যেকোনো চমৎকার ও অর্থবহ কথোপকথনের গুণগত মানকে মুহূর্তের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনে. কারণ ফোনে মগ্ন থাকা ব্যক্তি সামনের মানুষের কথার প্রতিক্রিয়ায় অনেক বেশি সময় নেন এবং তার উত্তরগুলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা খাপছাড়া হয়।”
দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা, ‘হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট’-এর তথ্য উল্লেখ করে নিরো ফেলিসিয়ানো জানান, দীর্ঘায়ু বা ‘লনজেভিটি’, শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক শান্তির প্রধান চাবিকাঠি হল- মানুষের সঙ্গে মানুষের অর্থবহ ও গভীর মানসিক সংযোগ।
তিনি বলেন, “আমরা যখন ফাব্বিং-এর মাধ্যমে সেই সামাজিক বন্ধনের অবমূল্যায়ন করি, তখন সেটা মানুষের ‘ইমিউন সিস্টেম’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অবসাদ ও একাকিত্বের জন্ম দেয়।
নিজের ভুল স্বীকার ও খোলামেলা আলোচনা
এই ক্ষতিকর ডিজিটাল অভ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হল— নিজের আচরণ সম্পর্কে আত্মসচেতন হওয়া.
ফেলিসিয়ানো পরামর্শ দেন, “বন্ধু, জীবনসঙ্গী বা সন্তানদের সঙ্গে অত্যন্ত সততা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। প্রিয়জনকে সরাসরি প্রশ্ন করুন: ‘যখন তোমার পাশে থাকি, তোমার কি মনে হয় আমি মানসিকভাবে উপস্থিত আছি? আমি কি খুব সহজেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি?’
মানুষের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় নিখুঁত হয় না, তবে চারপাশের প্রিয় মানুষেরা আপনার আচরণ সম্পর্কে যে সৎ উত্তর দেবেন, সেটিই হবে আপনার ডিজিটাল আসক্তি ভাঙার এবং সম্পর্ক সংস্কার করার মূল ভিত্তি।”
ডিজিটাল সীমারেখা তৈরি করা
ডা. সামান্থা বোর্ডম্যান এবং ফেলিসিয়ানো যৌথভাবে, ‘ফাব্বিং’ প্রতিরোধে শক্তিশালী ব্যবহারিক কৌশলের কথা জানান।
গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক আলোচনা, দাম্পত্যে অন্তরঙ্গ সময় কাটানো বা ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার খাওয়ার সময় ফোনটি কেবল চোখের আড়াল বা সাইলেন্ট করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেটা সম্পূর্ণ অন্য কোনো ঘরে রেখে আসতে হবে।
ইয়ারপড বা এয়ারপডস খুলে রেখে, ফোনকে অন্য ঘরে নির্বাসনে দিয়ে যখন সম্পূর্ণ মনোযোগ সামনের জনের চোখের ভাষায় বা কুশল বিনিময়ে বিনিয়োগ করে, তখন শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয়।
