লবণ কম খাওয়া কঠিন নয়, শুধু জানতে হবে সঠিক পরিমাণ
লবণ বেশি গ্রহণে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ-সহ নানান স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
লবণে থাকা সোডিয়াম শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ক্রিয়াকলাপের জন্য প্রয়োজনীয়, যা মূলত মানবদেহে তরল বা পানির ভারসাম্য রক্ষা, স্নায়ুতন্ত্রের সংকেত আদান-প্রদান এবং পেশির সংকোচন-প্রসারণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক প্রক্রিয়া সচল রাখে।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের অভ্যাস শরীরের রক্তনালী ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে।
তবে সুস্থ থাকার জন্য লবণকে খাদ্যতালিকা থেকে পুরোপুরি বর্জন করার প্রয়োজন নেই; বরং দৈনিক কতটা সোডিয়াম শরীরে প্রবেশ করছে সেদিকে নজর রাখা এবং ধীরে ধীরে লবণ কমানোর অভ্যাস গড়ে তোলাই হল নিরাপদ পদ্ধতি।
প্রতিদিন কতটা লবণ খাওয়া উচিত?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পুষ্টি নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ৫ গ্রামের কম (প্রায় এক চা-চামচ) লবণ খাওয়া উচিত। এই পরিমাণ লবণ থেকে শরীর প্রায় ২,০০০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম পায়, যা দেহের দৈনিক প্রয়োজনের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপদ সীমা।
তবে হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ এবং কিডনি বা বৃক্কের জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই সোডিয়ামের মাত্রা আরও কমিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের ঝুঁকি
দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক চাহিদার চেয়ে বেশি লবণ বা সোডিয়াম গ্রহণ করলে শরীরে নিচে উল্লেখিত জটিল রোগগুলো বাসা বাঁধতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি: রক্তে অতিরিক্ত সোডিয়াম জমা হলে, শরীরকে বেশি পানি ধরে রাখতে বাধ্য করে। ফলে রক্তনালীর ভেতরে তরলের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা সরাসরি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ‘হার্ট ফেইলিউর’ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
কিডনি বা বৃক্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ: শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম ‘ফিল্টার’ বা বের করে দিতে কিডনি বা বৃক্ককে অনবরত বাড়তি কাজ করতে হয়।
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বেশি লবণ বিপজ্জনক, কারণ এটি কিডনির কার্যকারিতা দ্রুত নষ্ট করে দেয়।
পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে যে, অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার—যেমন লবণ দিয়ে সংরক্ষিত শুঁটকি মাছ, নোনতা আচার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসার বা গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারের সরাসরি সংযোগ রয়েছে।
অতিরিক্ত সোডিয়াম পাকস্থলীর ভেতরের সংবেদনশীল শ্লেষ্মাঝিল্লি বা মিউকোসাল আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এই মরণব্যাধি তৈরি করে।
শুধু রান্নার লবণে নয়, সোডিয়াম থাকে গোপন উৎসেও
অনেকেই মনে করেন, রান্নায় বা ভাতের পাতে বাড়তি যে কাঁচা লবণ যোগ করা হয়, সেটিই সোডিয়ামের একমাত্র উৎস।
তবে আসল সোডিয়াম লুকিয়ে থাকে বিভিন্ন মুখরোচক সস ও মসলাজাতীয় খাবারের মধ্যে।
রান্নার স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত সয়া সস, ফিশ সস, চিংড়ির পেস্ট, বিভিন্ন সিজনিং পাউডার এবং টেস্টিং সল্ট বা ‘এমএসজি’— এসবে উচ্চমাত্রায় সোডিয়াম থাকে।
তাই শুধু রান্নার লবণ কমালেই হবে না, এই গোপন উৎসগুলো থেকেও সোডিয়াম গ্রহণের পরিমাণ সীমিত করতে হবে।
লবণের ব্যবহার কমানোর ৩টি সহজ উপায়
খাবারের স্বাদ ঠিক রেখে লবণ গ্রহণ কমাতে তিনটি সহজ কৌশল রয়েছে।
ধীরে ধীরে পরিমাণ কমানো ও বিকল্প মসলার ব্যবহার: হঠাৎ করে লবণ অনেক কমিয়ে দিলে খাবার বিস্বাদ লাগতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই পদ্ধতি ধরে রাখতে বাধা দেয়।
তাই পরিমাপের চামচ ব্যবহার করে প্রতি সপ্তাহে অল্প অল্প করে লবণের ব্যবহার কমাতে হবে।
খাবারের স্বাদ ও সুগন্ধ বাড়াতে অতিরিক্ত লবণের ওপর নির্ভর না করে প্রাকৃতিকভাবে আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, লেবুর রস ও ভিনেগারের মতো স্বাস্থ্যকর উপাদান ব্যবহার করা যায়।
সস ও অতিরিক্ত ঝোল পরিহার করা: ফিশ সস, সয়া সস বা অন্য কোনও ডিপিং সস সরাসরি খাবারের ওপর বেশি ঢেলে না দিয়ে, চামচে মেপে অল্প পরিমাণে ব্যবহার করতে হবে।
প্রয়োজনে পানি বা লেবুর রস দিয়ে সস পাতলা করে নেওয়া যায়।
এছাড়া ঝোলযুক্ত তরকারি বা স্যুপে সোডিয়ামের ঘনত্ব বেশি থাকে, তাই খাবারের অতিরিক্ত ঝোল এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ।
বাজার করার সময় পুষ্টিগুণ বা লেবেল পড়া: প্যাকেটজাত খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিপস, সসেজ, প্রক্রিয়াজাত বা টিনজাত মাংস এবং আচার কেনার সময় প্যাকেটের পেছনে থাকা সোডিয়াম লেখার অংশটি পরীক্ষা করতে হবে।
পুষ্টিবিজ্ঞানের নির্দেশিকা অনুসারে নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি পরিবেশনে যদি দৈনিক চাহিদার ৫ শতাংশ বা তার কম সোডিয়াম থাকে, তবে সেটি কম সোডিয়ামযুক্ত খাবার।
অন্য দিকে, যদি ২০ শতাংশ বা তার বেশি সোডিয়াম থাকে, তবে সেটিকে উচ্চ সোডিয়ামযুক্ত ক্ষতিকর খাবার হিসেবে গণ্য করতে হবে।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
