দীর্ঘায়ু ও সুখী জীবনের মন্ত্রটা কী?
৮৫ বছরের গবেষণায় প্রমাণ মিলিছে টাকা থাকলেই সুখ পাওয়া যায় না।
সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবনের খোঁজে মানুষ সাধারণত পুষ্টিকর ডায়েট চার্ট, নিয়মিত ব্যায়ামাগারে যাওয়া, ক্ষতিকর চর্বি বর্জন বা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখার পেছনেই বেশি ছোটেন।
বাহ্যিক সুস্থতার জন্য এই নিয়মগুলো জরুরি হলেও, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের গবেষকেরা এক নতুন সত্য উন্মোচন করেছেন। তাদের মতে, ভালো কোলেস্টেরল বা ব্যায়াম করার চেয়েও মানুষের দীর্ঘায়ু, সুখ এবং রোগমুক্ত জীবনের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ অন্য এক জায়গায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘সোশ্যাল ফিটনেস’ বা ‘সামাজিক সুস্থতা’।
এর আসল বিষয় হল, মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর, ইতিবাচক ও অর্থপূর্ণ সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন ধরে রাখা, যা শরীর ও মনকে প্রাকৃতিকভাবে বুড়িয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।
মানব গবেষণা ও ‘সোশ্যাল ফিটনেস’
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা ও মনস্তত্ত্ব বিভাগ ১৯৩৮ সাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ ৮৫ বছর ধরে দীর্ঘমেয়াদী এবং বিশদ মানব জীবনযাত্রা সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনা করে আসছে, যার দাপ্তরিক নাম ‘হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট’।
এই গবেষণার বর্তমান পরিচালক ও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ডা. রবার্ট ওয়ালডিঙ্গার এবং তার সহ-গবেষক ডা. মার্ক ক্র্যাডল, তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, যারা জীবনে বেশি সুখী এবং সুস্থ ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই ডায়েট বা ব্যায়ামের চেয়েও নিজেদের পরিবার, বন্ধু ও সমাজের সঙ্গে নিবিড় মানসিক বন্ধনে যুক্ত ছিলেন।
বিজ্ঞানীদের এই পর্যবেক্ষণে প্রমাণিত হয়েছে যে, শক্তিশালী সম্পর্ক কেবল মনের আনন্দ বাড়ায় না, বরং তা সরাসরি মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করে এবং বার্ধক্যের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বহু গুণ শাণিত রাখে।
সামাজিক একাকিত্বের শারীরিক ক্ষতি
হার্ভার্ডের এই গবেষণার দীর্ঘমেয়াদী তথ্য এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে একাকিত্বকে একটি নীরব মহামারী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের মস্তিস্ক ও শরীরের ওপর ৩টি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অভ্যন্তরীণ প্রদাহ: ডা. রবার্ট ওয়ালডিঙ্গার ব্যাখ্যা করেন, “যখন একজন মানুষ নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বা একা অনুভব করেন, তখন তার শরীর সার্বক্ষণিকভাবে এক ধরনের ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ বা অদৃশ্য বিপদের মেজাজে চলে যায়। ফলে রক্তে স্ট্রেস হরমোন বা কর্টিসল বেড়ে গিয়ে ধমনীগুলোতে ‘ক্রনিক ইনফ্লামেইশন’ বা দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ তৈরি করে, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি প্রায় ২৯ শতাংশ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩২ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।
মস্তিষ্কের আকার সংকুচিত হওয়া: স্নায়ুবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন মানুষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ যোগাযোগের অভাবের কারণে মস্তিস্কের ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’ বা ধারণক্ষমতা দ্রুত কমে যায় এবং মস্তিস্কের আকার প্রাকৃতিকভাবেই সংকুচিত হতে শুরু করে, যা বার্ধক্যের ডিমেনশা ও আলৎঝেইমার’স গতি বাড়িয়ে দেয়।
সোশ্যাল ফিটনেস বা সামাজিক সুস্থতা বাড়ানোর ৩ নিয়ম
শারীরিক যোগ্যতার জন্য যেমন প্রতিদিন পেশির কসরত করতে হয়, তেমনি সামাজিক সুস্থতা ধরে রাখতে বিশেষজ্ঞরা ৩টি সহজ নিয়ম অনুশীলনের পরামর্শ দিয়েছেন।
সম্পর্কের মানকে প্রাধান্য দেওয়া
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহু ‘ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড’ বা অনুসারী থাকার অর্থ ‘সোশ্যাল ফিটনেস’ নয়।
ডা. রবার্ট ওয়ালডিঙ্গারের মতে, “সম্পর্কের সংখ্যার চেয়ে সম্পর্কের গভীরতা বা গুণগত মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে এমন অন্তত একজন বা দুজন মানুষ থাকা জরুরি, যার কাছে যেকোনো গভীর বিপদে বা মধ্যরাতে কোনো সংকোচ ছাড়াই সম্পূর্ণ মানসিক নিরাপত্তা পাওয়া যায়।”
ক্ষুদ্র ও অর্থপূর্ণ সংযোগের নিয়মিত চর্চা
ব্যস্ত রুটিন থেকে আলাদা করে বড় কোনো আড্ডার সময় বের করা কঠিন হলে প্রতিদিনের রুটিন কাজের মাঝেই ছোট ছোট সামাজিক যোগাযোগের জায়গা তৈরি করা উপকারী।
যেমন: বিকেলের হাঁটার সময় কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করা, পুরানো কোনো বন্ধুকে একটি সাধারণ ‘হ্যালো’ মেসেজ পাঠানো কিংবা কাঁচাবাজারের বিক্রেতার সঙ্গে একটু হাসিমুখে কথা বলা।
এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো মস্তিস্কে ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের মতো আনন্দের হরমোন নিঃসরণ করে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দেয়।
ডিজিটাল স্ক্রিন বর্জন ও প্রত্যক্ষ আড্ডা
ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে চ্যাটিং করার চেয়ে সরাসরি মুখোমুখি বসে কথা বলার কোনো বিকল্প নেই। সপ্তাহে অন্তত একটি দিন পরিবারের সবার সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়া এবং খাওয়ার সময় সব ধরনের মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভি বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
মুখোমুখি আড্ডায় একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বললে, মানুষের স্নায়ুতন্ত্র প্রাকৃতিকভাবেই শান্ত ও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ফিরে আসে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবনের রহস্য কেবল ব্যায়ামাগারে প্রশিক্ষণ বা সালাদের বাটিতে সীমাবদ্ধ নয়।
হার্ভার্ডের ৮৫ বছরের এই পর্যবেক্ষণ মানবজাতিকে বার্তাই দেয় যে, মানুষের সঙ্গে উষ্ণ ও মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলাই হল দীর্ঘায়ু ও সুখী জীবনের চাবিকাঠি।
তাই ‘সোশ্যাল ফিটনেস’ বা সামাজিক সুস্থতাকে আবেগীয় বিষয় না ভেবে, বরং নিজের প্রতিদিনের সুস্বাস্থ্যের এক অপরিহার্য ও বৈজ্ঞানিক অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়াই দীর্ঘ ও কর্মক্ষম জীবনের মূল ভিত্তি হতে পারে।
আরও পড়ুন
