০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

শীতের আমেজে সুস্থ থাকতে ৬টি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান

শীতের শুরুতেই সর্দি-কাশি, শুষ্ক ত্বক আর বাতের ব্যথা থেকে দূরে থাকতে চাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর খাদ্যাভ্যাস।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Nov 2026, 06:24 PM

Updated : 04 Nov 2026, 06:24 PM

শীতের আগমনী বার্তায় তাপমাত্রা কমতে থাকার পাশাপাশি বাতাসের আর্দ্রতা হ্রাস পাওয়ার কারণে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক ও প্রাণহীন হয়ে পড়তে পারে।

একই সঙ্গে এই শুষ্ক আবহাওয়ায় সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পায়।

এই সময়ে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য এবং প্রতিদিনের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সুষম খাবার খাওয়া জরুরি।

অনেকে এই ঘাটতি পূরণে বাজারচলতি বিভিন্ন কৃত্রিম সম্পূরক বা সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা সবার জন্য মোটেও প্রয়োজনীয় নয়।

শীতকালীন নানান স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এবং সুস্থ থাকতে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ৬টি পুষ্টি উপাদান রাখা উপকারী।

ভিটামিন বি৬

এই ভিটামিন স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে, প্রোটিনের বিপাক বা মেটাবলিজম প্রক্রিয়া উন্নত করতে এবং রোগ প্রতিরোধকারী কোষের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

এছাড়া এটি রক্তে হিমোগ্লোবিন এবং মস্তিস্কে ভালো লাগার হরমোন ‘সেরোটোনিন’ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতি হলে রক্তস্বল্পতা, ত্বকের সমস্যা, মানসিক বিভ্রান্তি এবং খিটখিটে মেজাজ দেখা দিতে পারে।

উৎস: কলা, আলু, ছোলা, সামুদ্রিক ও সাধারণ মাছ, মুরগির মাংস, বাদাম এবং গোটা শস্য।

দৈনিক চাহিদা: ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক প্রায় ১.৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি৬ প্রয়োজন।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড

হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক এবং শরীরের প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড গুরুত্বপূর্ণ। এটি শরীরের ক্ষতিকর দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এটি রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জয়েন্টের তীব্র ব্যথা ও সকালের জড়তা কমাতে সাহায্য করে।

তবে সব ধরনের বাতের ব্যথা বা শীতকালীন হৃদরোগ প্রতিরোধে এর কার্যকারিতা এখনও শতভাগ নিশ্চিত নয়।

উৎস: ইলিশসহ যেকোনও তৈলাক্ত মাছ, ছোট মাছ, তিসি ও চিয়া বীজ, আখরোট এবং সয়াবিন।

দৈনিক চাহিদা: প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের জন্য দৈনিক ১.১ গ্রাম এবং পুরুষদের জন্য ১.৬ গ্রাম উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ বা ‘এএলএ’ গ্রহণ পর্যাপ্ত মাত্রা হিসেবে নির্ধারিত।

আয়রন বা লোহা

আয়রন মানবদেহে লোহিত রক্তকণিকার প্রধান উপাদান ‘হিমোগ্লোবিন’ তৈরিতে সরাসরি সাহায্য করে, যা ফুসফুস থেকে শরীরের প্রতিটি কোষে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।

আয়রনের ঘাটতি হলে ‘অ্যানিমিয়া’ বা রক্তস্বল্পতা, প্রচণ্ড ক্লান্তি, শারীরিক দুর্বলতা এবং মাথা ঘোরার মতো সমস্যা দেখা দেয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সুরক্ষায় এটি অপরিহার্য।

উৎস: গরু ও খাসির মাংস, মাছ, ডাল, ছোলা, কলিজা এবং সবুজ শাকসবজি।

দৈনিক চাহিদা: সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের দৈনিক ৮ মিলিগ্রাম এবং ঋতুস্রাব হয় এমন নারীদের ১৮ মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় এই চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে ২৭ মিলিগ্রাম হয়।

আয়রনের ঘাটতি সন্দেহ হলে ঘরে বসে না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত।

ভিটামিন ‘সি’

ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা শরীরের কোষগুলোকে ফ্রি-র‌্যাডিক্যালের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। এটি ত্বকের টানটান ভাব ও লাবণ্য ধরে রাখার প্রধান প্রোটিন ‘কোলাজেন’ তৈরিতে ভূমিকা রাখে, যা রক্তনালি, হাড় ও তরুণাস্থির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া এটি যেকোনো ক্ষত দ্রুত নিরাময় করতে এবং উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন শোষণে শরীরকে সাহায্য করে।

উৎস: আমলকী, পেয়ারা, লেবু, কমলা, পেঁপে, টমেটো এবং কাঁচা মরিচ।

দৈনিক চাহিদা: যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা (এনএইচএস) -এর সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক প্রায় ৪০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ প্রয়োজন, যা একটি সুষম খাদ্যতালিকা থেকেই অনায়াসে পূরণ করা সম্ভব।

ভিটামিন ‘ডি’

শরীরকে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সরাসরি সাহায্য করে, ফলে হাড় ও দাঁত মজবুত থাকে এবং পেশির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

শীতকালে কুয়াশা বা মেঘলা আকাশের কারণে সূর্যালোকের সংস্পর্শ কমে গেলে ত্বকে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরির পরিমাণ হ্রাস পায়, যা বাতের ব্যথা বাড়িয়ে দেয়।

উৎস: ডিমের কুসুম, তৈলাক্ত মাছ এবং ‘ভিটামিন ডি ফোর্টিফাইড’ বা যোগ করা দুধ।

দৈনিক চাহিদা: যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯ থেকে ৭০ বছর বয়সিদের দৈনিক ৬০০ আন্তর্জাতিক একক বা ১৫ মাইক্রোগ্রাম এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সিদের ৮০০ আন্তর্জাতিক একক বা ২০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ‘ডি’ প্রয়োজন।

জিঙ্ক

শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কোষের বিভাজন, ডিএনএ তৈরি, ক্ষত নিরাময় এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সচলতার জন্য জিঙ্ক প্রয়োজনীয় খনিজ। এর ঘাটতি হলে চুল পড়া, ক্ষুধামন্দা, খাবারের স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি কমে যাওয়া এবং ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগার মতো জটিলতা দেখা দেয়।

উৎস: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, ছোলা, বাদাম, তিল এবং কুমড়োর বীজ।

দৈনিক চাহিদা: প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের দৈনিক প্রায় ১১ মিলিগ্রাম এবং নারীদের ৮ মিলিগ্রাম জিঙ্ক প্রয়োজন।

বিশেষ সতর্কবার্তা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত জিঙ্ক সম্পূরক বা সাপ্লিমেন্ট দীর্ঘদিন ধরে গ্রহণ করলে শরীরে তামার বা কপারের মারাত্মক ঘাটতিসহ নানান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।

সুস্থ থাকার জন্য চাই সঠিক খাদ্যাভ্যাস

শীতকালে সুস্থ থাকতে কোনও জাদুকরী ওষুধের বা কৃত্রিম সম্পূরকের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে প্রতিদিনের মূল খাবারে বৈচিত্র্য আনা উচিত।

থালায় নিয়মিত মাছ, ডিম, ডাল, তাজা শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম ও গোটা শস্য রাখতে হবে। পাশাপাশি শীতের অলসতা কাটাতে পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং প্রতি রাতে সঠিক ঘুম নিশ্চিত করা আবশ্যক।

মনে রাখতে হবে, কোনও একটি একক পুষ্টি উপাদান একাই সব রোগ থেকে অলৌকিকভাবে সুরক্ষা দিতে পারে না।

শরীরে পুষ্টির বড় কোনও ঘাটতি দেখা দিলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের নির্দেশিকা অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।

পুরনো খবর:

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে একটি পানীয়
ত্বক, চুল ও নখের সার্বিক সুস্থতা যেভাবে বজায় রাখা যায়
সবজি রান্নার ৮ ভুলে কমে পুষ্টিগুণ, জেনে নিন সঠিক নিয়ম