ত্বক, চুল ও নখের সার্বিক সুস্থতা যেভাবে বজায় রাখা যায়
শুধু রূপচর্চায় কাজ হয় না। সঙ্গে চাই ভেতর থেকে পুষ্টি।
উজ্জ্বল ত্বক, ঘন চুল এবং মজবুত নখকে সাধারণত সুস্বাস্থ্যের বাহ্যিক প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলো কেবল সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ নয়, বরং শরীরের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ ও হরমোনের ভারসাম্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
স্বাস্থ্য-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথলাইন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ত্বক, চুল এবং নখ- এই তিন উপাদানই মূলত শরীরের ‘ইনটেগুমেন্টারি সিস্টেম’ বা বহিরাবরণী তন্ত্রের অংশ।
লন্ডনের ত্বক-বিশেষজ্ঞ ও ‘লন্ডন প্রফেশনাল অ্যাস্থেটিকস’-এর পরিচালক এলিজাবেথ রিমার বলেন, “এই তিন উপাদানেরই মূল ভিত্তি হল বিশেষ কোষ, যাকে ‘কেরাটিনোসাইট’ বলা হয়। এই কোষগুলো ‘স্টেম সেল’ থেকে তৈরি হয় এবং শরীরে ‘কেরাটিন’ নামক বিশেষ আঁশ সমৃদ্ধ প্রোটিন তৈরি ও মজুত করে। যা আমাদের ত্বক, চুল ও নখকে প্রাকৃতিকভাবে শক্ত, নমনীয় এবং পানিনিরোধক করে তোলে।”
খাদ্যাভ্যাস ও রক্ত সঞ্চালনের ভূমিকা
গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হসপিটালের পরামর্শক ও প্লাস্টিক সার্জন ডা. আমির সাদ্রি একই প্রতিবেদনে বলেন, “মানুষের ত্বকের স্তরগুলো একটি বিশাল এবং জটিল রক্তনালীর নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। এমনকি চুলের ফলিকল বা গোড়াও সরাসরি রক্তের পুষ্টি থেকে শক্তি সংগ্রহ করে।”
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাতে অবস্থিত ‘এ.টি. স্টিল ইউনিভার্সিটি’র করা গবেষণা সূত্র ধরে ডা. আমির জানান, শরীরে ভিটামিন ‘বি’, চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন (‘এ’, ‘ই’, ‘কে’), জিঙ্ক, আয়রন, কপার এবং সেলেনিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদানের অভাব হলে সরাসরি একজিমা, সোরিয়াসিস বা চুল পড়ার মতো সমস্যা তৈরি করে।”
এলিজাবেথ রিমারের মতে, “এই প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে দৈনিক খাদ্যাভ্যাসে বিভিন্ন রংয়ের ফলমূলের পাশাপাশি শিম ও মসুর ডাল রাখা জরুরি, যা নতুন কোষ গঠনে সাহায্য করে।”
অন্য দিকে, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন চুলকে শুষ্ক ও ভঙ্গুর করে এবং অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে ত্বকের মূল গাঠনিক উপাদান ‘কোলাজেন’ এবং ‘ইলাস্টিন’ ধ্বংস হয়ে দ্রুত বলিরেখা ও চামড়া ঝুলে পড়ে অকাল বার্ধক্যের ছাপ ফেলে।
ঘুম এবং মানসিক চাপের প্রভাব
ত্বক, চুল ও নখের সুস্থতা বজায় রাখতে দৈনিক পর্যাপ্ত ঘুমের কোনও বিকল্প নেই।
ডা. আমির সাদ্রি বলেন, ঘুমের অভাব হলে শরীরে স্ট্রেস বা চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’-এর নিঃসরণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই অতিরিক্ত কর্টিসল রাতের বেলা শরীরের স্বয়ংক্রিয় টিস্যু মেরামত প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দেয়। ফলে নখ ভঙ্গুর হওয়া, ত্বকের তীব্র প্রদাহ এবং চুলের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার মতো স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়।”
এলিজাবেথ রিমার মন্তব্য করেন, “শরীরে কোলাজেন প্রোটিনের উৎপাদন ঘুমের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শীর্ষে থাকে। তাই এই তিন বাহ্যিক উপাদানকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিন অন্তত ৭ ঘণ্টা গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম বাধ্যতামূলক, অন্যথায় ঘুমহীনতার প্রথম সংকেতটি এই অঙ্গগুলোতেই সবচেয়ে আগে দৃশ্যমান হয়।”
ঘরে বসে রূপচর্চার পন্থা
এই বিশেষজ্ঞরা ঘরোয়া যত্নে কেমিক্যাল বা রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সতর্কতা দিয়েছেন।
চুলের ঘনত্ব বাড়াতে এবং মাথার ত্বকের ছত্রাক সংক্রমণ রোধ করতে চিকিৎসকরা ‘কিটোকোনাজল’ সমৃদ্ধ শ্যাম্পু এবং ফলিকলের পুষ্টির জন্য রোজমেরি অয়েল ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
তবে শ্যাম্পু কেনার সময় অবশ্যই ক্ষতিকর ‘সালফেট’ মুক্ত পণ্য বেছে নিতে হবে। কারণ এই রাসায়নিক উপাদান মাথার ত্বকের প্রাকৃতিক তেল শুষে নিয়ে চুলের বৃদ্ধি ব্যাহত করে।
ত্বকের যত্নে প্রতিদিন নিয়ম করে একটি তেল-মুক্ত এসপিএফ বা সানস্ক্রিন ব্যবহার করা এবং ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে ভিটামিন ‘এ’-র উপাদান ‘রেটিনল’ ব্যবহার করা কার্যকর।
নখের কিউটিকল বা চারপাশের চামড়ার শুষ্কতা দূর করতে প্রতিদিন রাতে প্যারাবেন-মুক্ত ‘নেইল অয়েল’ মালিশ করা এবং নখের প্রাকৃতিক শ্বাসপ্রশ্বাস সচল রাখতে কিছুদিন পরপর নেইল পলিশ বা জেল ব্যবহার থেকে বিরতি নিতে হবে।
