শারীরিক সুস্থতায় বীরভদ্রাসন-১ অনুশীলনের নিয়ম
পা ও কোমর শক্তিশালী করার সঙ্গে মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে বীরভদ্রাসন-১।
আধুনিক ও গতিশীল জীবনযাত্রায় সুস্থ শরীর এবং শান্ত মনের মেলবন্ধন ধরে রাখা বেশ কঠিন। এই ব্যস্ততার মধ্যে শারীরিক সুস্থতা, পেশির নমনীয়তা এবং মানসিক একাগ্রতা বাড়াতে যোগাসন অনন্য ভূমিকা পালন করে।
যোগশাস্ত্রের শক্তিশালী একটি দাঁড়ানো আসন হল ‘বীরভদ্রাসন-১’।
এই আসন শরীরের নিম্নভাগের পেশিগুলোকে সক্রিয় করার পাশাপাশি স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।
যোগ শিক্ষক শিবানী দে-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, এই আসনের সঠিক পদ্ধতি ও চিকিৎসাগত সতর্কতার বিবরণ নিচে দেওয়া হল।
বীরভদ্রাসন–১ করার সঠিক পদ্ধতি
যোগাসনের প্রকৃত সুফল পেতে হলে প্রতিটি কদম নিখুঁতভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। আসনটি করার সুনির্দিষ্ট নিয়মগুলো হল-
১. প্রথমে একটি সমতল স্থানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দুই পায়ের মধ্যে শরীরের উচ্চতা ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী প্রয়োজনমতো দূরত্ব তৈরি করতে হবে।
২. এরপর ডান পা সামনে রেখে বাঁ পা পেছনের দিকে প্রসারিত করতে হবে।
৩. সামনের ডান হাঁটু ধীরে ধীরে ভাঁজ করতে হবে, তবে খেয়াল রাখতে হবে হাঁটু যেন কোনওভাবেই গোড়ালির সীমানা অতিক্রম না করে ঠিক ওপরের অবস্থানে থাকে।
৪. পেছনের বাঁ পা মাটিতে দৃঢ়ভাবে চেপে রেখে শরীরের ভর দুই পায়ের মাঝখানে সমতা এনে স্থির করতে হবে।
৫. এই অবস্থায় দুই হাত মাথার ওপর সোজা করে তুলে হাতের তালু পরস্পরের মুখোমুখি বা একসঙ্গে জোড় করে রাখতে হবে।
৬. বুক সোজা ও প্রসারিত রাখতে হবে এবং কোনও অবস্থাতেই শ্বাস বন্ধ না করে, সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে ও ছাড়তে হবে।
৭. এই ভঙ্গিতে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছুক্ষণ অবস্থান করে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে হবে এবং অপর পাশেও একইভাবে পা পরিবর্তন করে অনুশীলনটি সম্পন্ন করতে হবে।
নিয়মিত অনুশীলনের চিকিৎসাগত ও শারীরিক উপকারিতা
বীরভদ্রাসন–১ মানবদেহে একাধিক পেশিকে একসঙ্গে সক্রিয় রাখে। এর প্রধান উপকারিতাগুলো হল-
পেশির শক্তি বৃদ্ধি: এটি ‘কোয়াড্রিসেপস’, হ্যামস্ট্রিং এবং কাফ মাসল বা পা ও উরুর পেশিকে প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলে।
নমনীয়তা ও ভারসাম্য উন্নত করা: কোমর এবং ‘হিপ জয়েন্ট’ বা উরুসন্ধি অর্থাৎ নিতম্বের সংযোগস্থলের নমনীয়তা বৃদ্ধিতে সহায়ক, যা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের স্থিরতা ও সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বুক ও কাঁধের প্রসারণ: হাত মাথার ওপরে তোলার কারণে কাঁধ এবং বুকের পেশি প্রসারিত হয়, যা ফুসফুসের অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
মানসিক মনোযোগ ফোকাস ও আত্মবিশ্বাস: এই আসন শরীরে রক্ত সঞ্চালন সচল রাখার সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাস, মনোযোগ এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সাহায্য করে।
কারা করবেন না বা কোন ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে
বীরভদ্রাসন–১ কার্যকরী হলেও সবার শারীরিক অবস্থা এক নয়। তাই নিচের চিকিৎসাগত সতর্কতাগুলো মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
সাম্প্রতিক আঘাত: হাঁটু, গোড়ালি, ‘হিপ জয়েন্ট’ বা কোমরে তীব্র ব্যথা অথবা সাম্প্রতিক সময়ে কোনও সার্জারি বা আঘাতের ইতিহাস থাকলে এই আসন সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।
কাঁধের সমস্যা: কাঁধে গুরুতর কোনও জটিলতা বা ‘ফ্রোজেন শোল্ডার’-এর সমস্যা থাকলে হাত জোর করে মাথার ওপর না তুলে বুকের কাছে ক্ষমা প্রার্থণার ভঙ্গিতে বা কোমরে হাত রেখে সহজ উপায়ে করা যেতে পারে।
ভারসাম্যের অভাব: মাথা ঘোরা বা রক্তচাপের তারতম্যের কারণে ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হলে একা না করে দেয়াল বা শক্ত কোনও আসবাবপত্রের সহায়তা নেওয়া নিরাপদ।
দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা: উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, গর্ভাবস্থা বা অন্য কোনও জটিল শারীরিক সমস্যা থাকলে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক অথবা যোগ্য যোগ শিক্ষকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরামর্শ নিয়ে এটি করা উচিত।
মনে রাখতে হবে
যোগাসনের প্রকৃত উপকার পেতে আসনের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে সঠিক পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস এবং নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বীরভদ্রাসন–১ নিয়মিত ও সঠিকভাবে অভ্যাস করলে শরীরকে রোগমুক্ত, নমনীয় ও দীর্ঘায়ু অর্জনে সচল রাখা সম্ভব।
তবে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত এড়াতে একজন অভিজ্ঞ যোগ শিক্ষকের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ধীরে ধীরে অনুশীলনের অভ্যাস গড়ে তোলাই শ্রেয়।
