০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

সপ্তাহে কতটা ব্যায়াম প্রয়োজন?

প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা করা উপকারী।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Aug 2026, 04:14 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:55 PM

ব্যায়াম শরীরের জন্য ভালো। তাই স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ কিংবা শরীরচর্চায় বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত শরীরচর্চার পরামর্শও দেন। কিন্তু সুস্থ থাকতে সপ্তাহে আসলে কতটা ব্যায়াম প্রয়োজন? প্রতিদিন কতক্ষণ শরীরচর্চা করাই যথেষ্ট?

ব্যস্ততা, কাজের চাপ বা দায়িত্বের মধ্যেও কি সেই সময় বের করা সম্ভব?

শরীরচর্চাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ থেকে বোঝা যায়, সুস্থ থাকার জন্য ব্যায়াম মানেই দীর্ঘ সময় কঠিন শরীরচর্চা করা নয়। নিয়মিত শরীরকে সক্রিয় রাখাই আসল বিষয়।

অর্থাৎ শরীরচর্চার উপকার পেতে নির্দিষ্ট একটি নিয়মে প্রতিদিন ব্যায়াম করতেই হবে, এমন নয়। নিজের জীবনযাত্রা, বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী শরীরকে নিয়মিত সক্রিয় রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সপ্তাহে কতটা ব্যায়াম দরকার

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা অথবা ৭৫ মিনিট বেশি মাত্রার শরীরচর্চা করা প্রয়োজন।

এই ধরনের ব্যায়াম হতে হবে এমন, যেখানে শরীরের বড় পেশিগুলো নিয়মিতভাবে কাজ করে এবং হৃদ্‌স্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ে।

যেমন— হাঁটা, দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, নাচ করা ইত্যাদি। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম রাখার পরামর্শ দেন, বিশেষজ্ঞরা।

তবে ১৫০ মিনিট সময় অনেক বেশি মনে হতে পারে। তবে পুরো সময় একসঙ্গে ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা গ্রিনসবোরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা-বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অ্যান ব্র্যাডি রিয়েলসিম্পল ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “সপ্তাহজুড়ে নিজের সুবিধামতো সময় ভাগ করে নিলেই তা পূরণ করা সম্ভব।”

মার্কিন চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও লেখক উইলিয়াম লির মতে, “ব্যায়ামের জন্য সবার একই ছক অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। শরীরকে সচল রাখার বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের শরীরচর্চার পরামর্শ প্রযোজ্য। তবে এই বয়সে পেশি শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভারসাম্য বাড়ানোর ব্যায়ামের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলন, পেছনের দিকে হাঁটা কিংবা শরীরের মধ্যবর্তী অংশের পেশি শক্তিশালী করার মতো ব্যায়াম প্রতিদিনের চলাফেরায় স্থিরতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

প্রতিদিন যতক্ষণ ব্যায়াম করা দরকার

সপ্তাহের ১৫০ মিনিটকে চাইলে পাঁচ দিনে প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে ভাগ করা যায়। এটি শরীরচর্চার পরিচিত পদ্ধতিগুলোর একটি।

তবে কোনো সপ্তাহে পাঁচ দিন নিয়ম করে ৩০ মিনিট সময় বের করা সম্ভব না হলে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে বেশি সময় হাঁটা বা শরীরচর্চা করেও মোট সময় পূরণ করা যায়।

প্রতিদিনের ৩০ মিনিটও আবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করা সম্ভব।

অধ্যাপক অ্যান ব্র্যাডি ব্যাখ্যা করেন, “একটানা ৩০ মিনিট ব্যায়াম করার সুযোগ না থাকলেও অল্প সময়ের শারীরিক কর্মকাণ্ড উপকারী হতে পারে। অর্থাৎ সকালে ১০ মিনিট হাঁটা, দুপুরে আরও ১০ মিনিট এবং সন্ধ্যায় ১০ মিনিট হাঁটলে দিনের মোট ৩০ মিনিট পূরণ হয়ে যায়।”

ব্যায়ামের প্রভাব একদিনেই শেষ হয়ে যায় না। নিয়মিত ছোট ছোট সময়ের শরীরচর্চাও ধীরে ধীরে শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই দীর্ঘ সময়ের ব্যায়াম করার সুযোগ না পাওয়াকে শরীরচর্চা না করার কারণ বানানোর প্রয়োজন নেই।

প্রতিদিন একই ব্যায়াম নয়

শরীরচর্চা মানেই প্রতিদিন একই ধরনের অনুশীলন করতে হবে এমন ধারণাও ঠিক নয়। বরং শরীর ও মনের জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড রাখা উপকারী হতে পারে।

একদিন হাঁটা, অন্যদিন সাইকেল চালানো, কখনও সাঁতার, আবার কখনও পেশি শক্তিশালী করার অনুশীলন করা যেতে পারে।

উইলিয়াম লির ব্যাখ্যায়, শরীরচর্চার উপকারের পেছনে শরীরের পেশির কাজ, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি এবং হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট ব্যায়ামকেই উপকারী ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাইরে হাঁটা, সাইকেল চালানো, পাহাড়ি পথে হাঁটা, ঘরে নাচের অনুশীলন কিংবা পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম, সবই শরীরকে সক্রিয় রাখার বিভিন্ন উপায়।

সবার জন্য কি একই পরিমাণ

১৫০ মিনিটকে একটি সাধারণ নির্দেশনা হিসেবে দেখা উচিত, সবার জন্য বাধ্যতামূলক একই মাপ হিসেবে নয়। বয়স বেশি হলে, দীর্ঘমেয়াদি কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে, আঘাত থাকলে বা চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা থাকলে ব্যায়ামের ধরন ও পরিমাণ আলাদা হতে পারে।

নতুন করে ব্যায়াম শুরু করলে শুরুতেই কঠিন শরীরচর্চায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

অ্যান ব্র্যাডির মতে, “কম চাপের ও তুলনামূলক সহজ কর্মকাণ্ড দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরি করা। পরে ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাত্রা ও সময় বাড়ানো সম্ভব।”

শিশু-কিশোরদের প্রয়োজন আরও বেশি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে বেশি মাত্রার বায়বীয় শারীরিক কর্মকাণ্ড করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দৌড়ানো, দড়ি লাফানো বা হাড় ও পেশি শক্তিশালী করার মতো কাজও রাখা যেতে পারে।

১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সিদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, প্রতি সপ্তাহে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরের বড় পেশিগুলো নিয়মিতভাবে কাজ করে এবং হৃদ্‌স্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ে এমন ব্যায়াম অথবা ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট বেশি মাত্রার ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়।

এর সঙ্গে সপ্তাহে অন্তত দুদিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম রাখার কথাও বলা হয়েছে।

৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রেও একই সময়ের নির্দেশনা থাকলেও পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম ও ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

সপ্তাহের অন্তত তিন দিন এমন ব্যায়াম রাখা যেতে পারে, যা শরীরের ভারসাম্য ও চলাফেরার সক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের পরের সময়েও নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ সময় সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরের বড় পেশিগুলো নিয়মিতভাবে কাজ করে এবং হৃদ্‌স্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ে এমন ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়।

তবে ব্যায়ামের ধরন বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি এবং শরীর যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, ধীরে ধীরে সেই মাত্রায় অভ্যস্ত হওয়া উচিত।

দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত শরীরচর্চা উপকারী হতে পারে, তবে তাদের জন্য ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

ব্যায়াম রোগ প্রতিরোধে যেভাবে সাহায্য করে

“নিয়মিত শরীরচর্চা দেহে প্রদাহ কমাতে, রক্ত চলাচল উন্নত করতে, বিপাকক্রিয়া ও ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা উন্নত করতে সাহায্য করে”, বলেন উইলিয়াম লি।

শরীরচর্চা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শরীরের কোষ ও টিস্যুর পুনর্গঠন ও মেরামতের প্রক্রিয়াতেও এর প্রভাব রয়েছে।

নিয়মিত শরীরচর্চা হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিক কর্মকাণ্ডের সময় রক্ত চলাচল বাড়লে হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছানোর সুযোগ বাড়ে।

এর সঙ্গে মেজাজ ভালো থাকা, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির উন্নতি এবং মানসিক চাপ কমার মতো উপকারও যুক্ত হতে পারে।

ব্যায়ামের সময় বের করবেন যেভাবে

ঘরে বসে কাজ করলে সকালে ১০ মিনিট, দুপুরে ১০ মিনিট এবং রাতের খাবারের পর আরও ১০ মিনিট হাঁটতে যাওয়া ভালো।

আবার প্রতি ৯০ থেকে ১২০ মিনিট পরপর উঠে পাঁচ থেকে ১০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করা যেতে পারে।

দিনে কয়েকবার এমন ছোট বিরতি মিলিয়েও যথেষ্ট শারীরিক ব্যায়াম করা সম্ভব।

শুধু হাঁটাই অবশ্য একমাত্র পথ নয়। স্বাভাবিক গতিতে সাইকেল চালানো, অবসরে সাঁতার কাটা, বাগানের কাজ করা বা ঘর পরিষ্কার করার মতো কাজও শরীরকে সচল রাখে।

তুলনামূলক বেশি মাত্রার ব্যায়াম করতে চাইলে দ্রুত সাইকেল চালানো, দৌড়ানো, দড়ি লাফানো কিংবা বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নেওয়া যেতে পারে।

অতিরিক্ত ব্যায়ামও ভালো নয়

শরীরচর্চার নির্দিষ্ট কোনো সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক সীমা নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে, যত বেশি ব্যায়াম করা হবে, ততই ভালো।

শরীরচর্চার পর আগের তুলনায় কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, সবসময় ক্লান্ত লাগা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, বারবার আঘাত পাওয়া, একই ধরনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে আঘাত, ঘন ঘন সর্দি-জ্বর এবং অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে ব্যায়ামের চাপ আবার ভেবে দেখা দরকার।

আরও পড়ুন

হাতের দুর্বলতা দূর করার ৩ ব্যায়াম

ঘুমের ঘাটতিতে দেহের ক্ষতি মেটানোর ব্যায়াম

নাচ হতে পারে মস্তিষ্কের ব্যায়াম