১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ঘুমের ঘাটতিতে দেহের ক্ষতি মেটানোর ব্যায়াম

মেদ বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস ও স্মৃতিভ্রংশের মতো রোগ রুখতে ১০ মিনিটের ‘এইচআইআইটি’ ব্যায়াম দিতে পারে সুফল।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 16 Aug 2026, 06:09 PM

Updated : 16 Sep 2026, 12:57 PM

ব্যস্ত কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা ছুটির দিনগুলোর অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাত্রার কারণে রাতের পর রাত প্রয়োজনীয় ঘুম হাতছাড়া হওয়া সাধারণ একটি নাগরিক সমস্যা।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অল্প অল্প করে জমে থাকা এই চিরস্থায়ী ঘুমের অভাবকে ‘স্লিপ ডেট্’ বা ‘ঘুমের ঋণ’ বলা হয়।

ধারণা রয়েছে যে,  কাজের দিনগুলোতে কম ঘুমালে, সাপ্তাহিক ছুটিতে অতিরিক্ত কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিলেই শরীর ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নিতে পারে।

তবে ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপ্তাহিক ছুটিতে অতিরিক্ত ঘুমালেও শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্ষতিগুলোকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে না।

‘সেলফ ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, যদি জীবনযাত্রার কারণে ঘুমের ঘাটতি এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের একটি বিশেষ উচ্চ-তীব্রতার ব্যায়াম এই শারীরিক ক্ষতি প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করতে পারে।

একে বলা হয় ‘এইচআইআইটি’ বা ‘হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেইনিং’।

কম ঘুমের অভ্যন্তরীণ ক্ষতি ও ‘ইনসুলিন’ সংকট

যুক্তরাষ্ট্রের বোর্ড-প্রত্যয়িত ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যানঞ্জেলা হলিডে-বেল বলেন, “শরীরে ঘুমের ঘাটতি তৈরি হলে, রক্তে ‘কোর্টিসল’ নামক স্ট্রেস বা চাপের হরমোন এবং অভ্যন্তরীণ প্রদাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটি রক্তনালী ও হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।”

মার্কিন নিউরো-ফিজিওলজিস্ট লুইসা নিকোলা ব্যাখ্যা করেন, “মাত্র এক বা দুই রাতের কম ঘুম শরীরের ইনসুলিন হরমোনের সংবেদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে।

বিপজ্জনক বিষয় হল, ইনসুলিনের এই ঘাটতি মস্তিস্কের গ্লুকোজ থেকে শক্তি তৈরি করার ক্ষমতাকে অবশ করে ফেলে, যা বার্ধক্যে ডিমেনশা বা স্মৃতিভ্রংশ এবং আলৎঝেইমার’স রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।”

মেটাবলিজম ও মস্তিস্কের সুরক্ষায় এইচআইআইটি

সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ঘুমের ঘাটতির সময়কালের আগে বা পরে ১০-১৫ মিনিটের দ্রুত ‘এইচআইআইটি’ সেশন করেছেন, তাদের মেটাবলিক বা হজমপ্রক্রিয়ার ওপর কম ঘুমের নেতিবাচক প্রভাব অনেক কম পড়েছে।

শর্করা ও ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণ: ডা. হলিডে-বেল বলেন, “উচ্চ-তীব্রতার এই সংক্ষিপ্ত ব্যায়াম ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে বর্ম হিসেবে কাজ করে রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।”

মস্তিস্কের স্মৃতিশক্তি রক্ষা: লুইসা নিকোলা জানান, এইচআইআইটি ব্যায়ামের ফলে মস্তিস্কের কোষে গ্লুকোজ ও অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। এটি মস্তিস্কে ‘বিডিএনএফ’ নামক এক বিশেষ কেমিক্যাল বা রাসায়নিকের নিঃসরণ বাড়ায়, যা কম ঘুমের কারণে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া এবং আলৎঝেইমার’স রোগের অকাল আক্রমণ থেকে নিউরনগুলোকে রক্ষা করে।

তীব্র ক্লান্তিতে ব্যায়াম করার কড়ার নিয়ম

আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের মুখপাত্র অধ্যাপক জেনিফার মার্টিন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

তিনি বলেন, “শরীর যদি চরম মাত্রায় অনিদ্রা ও ঝিমুনিতে আক্রান্ত থাকে, তবে হঠাৎ করে ভারী ‘এইচআইআইটি’ করতে গেলে পেশি ছিঁড়ে যাওয়া বা গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।”

রুটিন ও মাত্রা: তাই শরীর একদম অসাড় থাকলে জোর করে ব্যায়াম না করে, সামান্য বিশ্রামের পর যখন শরীর একটু সচল মনে হবে, তখন মাত্র ১০ মিনিটের জন্য স্প্রিন্ট, দ্রুত সাইকেল চালানো বা জাম্পিং জ্যাকের মতো তীব্র কসরত করা উপকারী।

এই বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলেন, কোনো ব্যায়ামই দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের বিকল্প হতে পারে না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থতার জন্য প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টার নিয়মিত ও গভীর ঘুম বাধ্যতামূলক।

ছুটির দিনেও প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস বজায় রাখলে শরীরের ‘সারকাডিয়ান রিদম’ বা জৈবিক ঘড়ি সচল থাকে, যা সামগ্রিক দীর্ঘায়ু অর্জনে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন

গভীর ও শান্তিময় ঘুমের জন্য রাতে হালকা ব্যায়াম

সারারাত ঘুমিয়েও সকালে ক্লান্ত বোধের কারণ

যে ধরনের শব্দ শান্তির ঘুম পাড়াতে পারে