১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সারারাত ঘুমিয়েও সকালে ক্লান্ত বোধের কারণ

ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোন দেখা বা খালি পেটে কফি পানে বাড়তে পারে মানসিক চাপের হরমোন।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Aug 2026, 04:38 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

সকালের অ্যালার্ম বাজার পর ঘুম থেকে উঠেই তীব্র ক্লান্তি অনুভব করা, মেজাজ খিটখিটে থাকা কিংবা সারাদিন ধরে এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক চাপ বয়ে বেড়ানো— আজকের আধুনিক নগর জীবনে এক চিরচেনা সংকটে পরিণত হয়েছে।

অনেকেই ভাবেন, রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া বা অতিরিক্ত কাজের চাপই এর একমাত্র কারণ।

তবে হরমোন ও স্নায়ুবিশেষজ্ঞদের মতে, এর আসল খলনায়ক হল শরীরের প্রধান স্ট্রেস বা চাপের হরমোন ‘কোর্টিসল’-এর ভারসাম্যহীনতা।

এই হরমোনের ক্ষতিকর উত্থান-পতন রুখতে এবং শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে সতেজ রাখতে বিশ্বজুড়ে এখন চিকিৎসকেরা জোর দিচ্ছেন ‘কোর্টিসল কনশাসনেস’ বা ‘স্ট্রেস হরমোন সচেতনতা’র ওপর।

কোর্টিসল শরীরের একটি প্রয়োজনীয় হরমোন, যা সকালে ঘুম থেকে জাগাতে এবং যেকোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

তবে ভুল জীবনযাত্রার কারণে এই হরমোনের মাত্রা রক্তে সারাক্ষণ অতিরিক্ত বেড়ে থাকলে, মস্তিস্কের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং পেটের মেদ বা ভিসেরাল ফ্যাট জমার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সকালের ভুল অভ্যাস এবং কোর্টিসল বৃদ্ধি

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডার্মাটোলজি ও এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিকভাবেই মানুষের ঘুম থেকে ওঠার প্রথম ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে শরীরে কোর্টিসল হরমোনের মাত্রা সর্বোচ্চ থাকে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কোর্টিসল অ্যাওয়েকেনিং রেসপন্স’ বলা হয়।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং হরমোন বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখিয়েছেন, এই সংবেদনশীল সময়ে মানুষ যখন চোখ খুলেই বিছানায় শুয়ে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন দেখা শুরু করে, তখন ফেইসবুক, ইমেইল বা খবরের নেতিবাচক তথ্যগুলো মস্তিস্কে এক ধরনের কৃত্রিম ভীতি বা ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ সংকেত পাঠায়।

ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে রক্তে কোর্টিসল হরমোন উপচে পড়ে বা ‘স্পাইক’ করে। একই সঙ্গে খালি পেটে কড়া কফি পান করলে, ক্যাফিন এই হরমোনের মাত্রাকে আরও মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যায়, যা সারাদিনের বিপাক প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজম ও মেজাজকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে তোলে।

কোর্টিসল হরমোন নিয়ন্ত্রণের ৪ নিয়ম

রক্তে স্ট্রেস হরমোনের ক্ষতিকর প্রবাহ থামিয়ে শরীর ও মনকে শান্ত রাখতে, ‘হেল্থ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘কম্পিউটার্স ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার জার্নাল’-এর গবেষক, যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট স্কুল অফ মেডিসিনের ডা. ডেভিড গ্রিনফিল্ড, এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. অ্যান্ড্রু হুবারম্যান, ৪টি সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।

ঘুম থেকে ওঠার প্রথম ঘণ্টায় ‘নো স্ক্রিন টাইম’

সকালে ঘুম থেকে জাগার পর প্রথম ৬০ মিনিট সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস বা যন্ত্র, মোবাইল বা ল্যাপটপের পর্দা থেকে দূরে থাকা উপকারী। এটি মস্তিস্ককে কৃত্রিম উত্তেজনা ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। আর কোর্টিসল হরমোনের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখে।

প্রাকৃতিক আলো ও সকালের রোদ

বিছানা থেকে উঠে ঘরের পর্দা খুলে দেওয়া বা বারান্দায় গিয়ে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট সকালের নরম রোদ গায়ে লাগানো জরুরি। মস্তিস্কের ‘অপটিক’ বা চোখ থেকে মস্তিষ্কে চিত্র বা আলোর বার্তা পাঠানোর স্নায়ু যখন সূর্যের আলো শনাক্ত করে, তখন তা ক্ষতিকর কোর্টিসল উৎপাদন ধীর করার সংকেত পাঠায় এবং শরীরে ‘সেরোটোনিন’ নামক আনন্দের হরমোন বৃদ্ধি করে, যা সকালের অলসতা ও ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।

নাস্তার পরে কফি পানের অভ্যাস

খালি পেটে কফি পানের অভ্যাস পুরোপুরি বর্জন করা উচিত। সকালে ঘুম থেকে ওঠার অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর, যখন শরীরে কোর্টিসলের মাত্রা প্রাকৃতিকভাবেই নামতে শুরু করে, তখন কফি খাওয়া নিরাপদ।

সকালের নাস্তা শেষ করার পর কফি পান করলে, সেটা পাকস্থলীর অ্যাসিড ও হরমোনের ওপর কোনো নেতিবাচক চাপ তৈরি করে না।

শরীরের কোষের আর্দ্রতা নিশ্চিত করা

রাতে দীর্ঘ সময় ঘুমের কারণে শরীর প্রাকৃতিকভাবেই কিছুটা ‘ডিহাইড্রেইটেড’ বা পানিশূন্য অবস্থায় থাকে, যা অবচেতন ভাবে কোর্টিসল বাড়িয়ে দেয়।

তাই সকালে ঘুম থেকে উঠেই সবার আগে অন্তত এক থেকে দুই গ্লাস সাধারণ তাপমাত্রার বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক। এটি শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেনের প্রবাহ সচল করে বিপাকের মাত্রা উন্নত করে।

মনে রাখতে হবে

মানসিক চাপ বা স্ট্রেস মুক্ত জীবন কেবল অবাস্তব কোনো কল্পনা নয়, এটি প্রতিদিনের সকালের রুটিন একটু গুছিয়ে নেওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রতিফলন।

সকালের প্রথম এক ঘণ্টা নিজের শরীর ও মনকে কৃত্রিম কেমিক্যাল ও ডিজিটাল উদ্দীপনা থেকে দূরে রাখাই সারাদিন উদ্যমী ও সুস্থ থাকার উপায় হতে পারে।

আরও পড়ুন

পরচর্চায় যে কারণে এত আনন্দ হয়

ভালো ঘুম আর ওজন কমাতে ম্যাগনেসিয়ামের ভূমিকা

হরমোনের গরমিলে মাথা ঝিমঝিম

রাতের খাবারের পর ৩ অভ্যাসে দূরে থাকবে মানসিক চাপ ও ক্লান্তি