২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাকার আশপাশে যেথায় মিলবে কাশফুলের নরম ছোঁয়া

ইট-কাঠের যান্ত্রিক শহর ছেড়ে এক বিকেলেই ঘুরে আসুন ঢাকার আশপাশের কাশবন থেকে।

ঢাকার আশপাশে যেথায় মিলবে কাশফুলের নরম ছোঁয়া

ঢাকার দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের সারিঘাটের কাশবনে বেড়াতে এসে ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা। ছবি: শামছুল হক রিপন

রিফাত পারভীন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 27 Sep 2026, 06:15 PM

Updated : 27 Sep 2026, 06:14 PM

শরৎ এলেই ঢাকার ব্যস্ত শহরও যেন একটু অন্য রকম হয়ে ওঠে। আকাশে সাদা মেঘ, বাতাসে হালকা শীতের আভাস আর শহরের প্রান্তে মাথা দোলানো কাশফুল মনে করিয়ে দেয়— শরৎ চলছে।

ঢাকার আশপাশে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে বিকেলটা কাশফুলের শুভ্রতার মধ্যে কাটিয়ে আসা যায়।

রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন খোলা মাঠ, নদীর পাড়, চর ও জলাভূমিতে ফুটেছে কাশফুল। দিয়াবাড়ি, আফতাবনগর, পূর্বাচল, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জের সারিঘাটসহ ঢাকার কাছের বেশ কয়েকটি জায়গায় পাওয়া যাবে কাশফুলের ছোঁয়া।

দিয়াবাড়িতে কাশফুলের সঙ্গে লেকের বাতাস

কাশফুল দেখতে ঢাকার ভেতর থেকেই সহজে যেতে চাইলে দিয়াবাড়ি হতে পারে পরিচিত ও সুবিধাজনক গন্তব্য। উত্তরা ১৫ ও ১৬ নম্বর সেক্টরের বিস্তীর্ণ খোলা জায়গায় শরতের এই সময়ে কাশফুল ফুটে ওঠে।

কাশবনের ভেতর দিয়ে হাঁটা, পরিবার নিয়ে সময় কাটানো, আবার ছবি তোলা সবই কাশফুল দর্শন অভিযানের অংশ।

দিয়াবাড়ির বিশেষত্ব শুধু কাশফুল নয়। কাশবনের কাছেই রয়েছে লেক ও নৌভ্রমণের সুযোগ। দিয়াবাড়ি বটতলা থেকে কিছুটা সামনে রয়েছে ৩ নম্বর সেতু। সেতুর দুই পাশে লেকের পাড়ে রয়েছে নৌকায় ঘোরার ব্যবস্থা। কাশফুল দেখার পর চাইলে লেকের পানিতে নৌকায় কিছুটা সময় কাটিয়ে নেওয়া যায়।

তাই বিকেলের ভ্রমণটি শুধু কাশফুল দেখা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে, লেকের ধারে কিছুটা সময় কাটানো যায়। আশপাশে খাবারের দোকানও রয়েছে।

দিয়াবাড়ি যাওয়ার ক্ষেত্রে মেট্রোরেল ব্যবহার করা যায়। উত্তরা কেন্দ্র বা উত্তরা উত্তর এলাকার দিকে গিয়ে সেখান থেকে রিকশা বা অন্য স্থানীয় যানবাহনে কাশবনের এলাকায় পৌঁছানো যায়।

Image

ঢাকার দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের সারিঘাটে কাশফুল দেখতে যাওয়া দর্শনার্থীরা সেখানকার সরু খালে নৌকায় চড়ে বেড়াচ্ছেন। ছবি: শামছুল হক রিপন

আফতাবনগরে শহরের কাছেই শরতের মাঠ

ঢাকার মধ্যেই থেকে কাশফুল দেখতে চাইলে, আফতাবনগরও হতে পারে এক বিকেলের গন্তব্য। রামপুরা সেতুর দিক থেকে আফতাবনগরের ভেতরের দিকে গেলে খোলা জায়গায় কাশফুলের দেখা মিলবে। চলতি সময়ের ভ্রমণতালিকাতে আফতাবনগরকে ঢাকার কাছের কাশবনগুলোর মধ্যে রাখা যায়।

এখানে যাওয়ার সুবিধা হল, খুব বেশি সময় হাতে না থাকলেও ছোট একটি ভ্রমণ করা যায়। বিকেলের দিকে গেলে সূর্যের নরম আলো কাশফুলের ওপর পড়ায় ছবি তোলার জন্যও পরিবেশ সুন্দর হয়।

তবে কাশবনের জায়গাগুলো অনেক সময় খোলা বা অনির্ধারিত জমিতে তৈরি হওয়ায় কোথাও ঢোকার আগে স্থানীয়দের কাছ থেকে পথ ও নিরাপত্তা সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো।

পূর্বাচল ও তিনশ ফিটের খোলা আকাশের নিচে

শহরের কংক্রিটের জঞ্জাল থেকে একটু দূরে যেতে চাইলে পূর্বাচল ও তিনশ ফিটের আশপাশের খোলা জায়গা বেছে নেওয়া যায়।

কুড়িল বিশ্বরোড থেকে তিনশ ফিট সড়ক ধরে এগিয়ে পূর্বাচলের দিকে কাশফুল দেখার সুযোগ রয়েছে।

এই এলাকার কাশফুল দেখার আনন্দ হল, বড় খোলা আকাশ ও তুলনামূলক বিস্তৃত প্রান্তর। ফলে শুধু কাশফুল নয়, শরতের আকাশের সঙ্গে পুরো দৃশ্যটিই উপভোগ করা যায়।

তবে রাস্তার একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার বদলে নিরাপদ জায়গা বেছে নেওয়া জরুরি। যানবাহন চলাচল বেশি, এমন স্থানে রাস্তার ওপর বা খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা ঠিক নয়।

Image

ঢাকার দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের সারিঘাটে বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে ফুটেছে কাশফুল। প্রতি বছর এই সময়ে সেখানে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা।  ছবি: শামছুল হক রিপন

আশুলিয়ায় কাশফুল আর পথের ভ্রমণ

ঢাকার কাছ থেকে একটু দীর্ঘ সময়ের জন্য বের হতে চাইলে, আশুলিয়ার হতে পারে ভালো জায়গা। মিরপুর বেড়িবাঁধ হয়ে আশুলিয়ার পথে কাশবনের অভিযানে নেমে পড়া যায়।

আশুলিয়ার দিকে যাওয়ার মজার দিক হল, এখানে কাশফুল দেখার সঙ্গে সড়কপথের ভ্রমণটিও যুক্ত হয়। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে যত এগোনো যায়, ততই খোলা জায়গা, জলাভূমি ও গ্রামের আবহ চোখে পড়ে।

তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট কাশবনে গিয়ে ফিরে আসার বদলে আশুলিয়ার পথে কয়েকটি জায়গায় থেমে প্রকৃতির মাঝেও সময় কাটানো যায়। 

তবে যেকোনও পথে যাওয়ার আগে সেদিনের সড়ক পরিস্থিতি দেখে নেওয়া ভালো।

Image

 ঢাকার দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের সারিঘাটের কাশবনে বেড়াতে এসে ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা। ছবি: শামছুল হক রিপন

বিরুলিয়ায় কাশফুলের সঙ্গে নৌভ্রমণ

কাশফুল দেখার ভ্রমণে যদি নদীর স্বাদও যোগ করতে চান, তাহলে বিরুলিয়ার দিকে যাওয়া যেতে পারে। বিরুলিয়া যেহেতু তুরাগ নদীর তীরে, তাই নদীতে নৌকা নিয়ে ঘোরার ব্যবস্থা তো রয়েছেই।

যেহেতু এখনও মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হয়, তাই পানি থাকায় নদীর পাড়ের দৃশ্য আলাদা। কোথাও নিচু জমি পানিতে ভরে যায়, কোথাও নদীর ধারে সবুজের মধ্যে কাশফুল মাথা তোলে।

তাই কাশফুল দেখতে গিয়ে নৌকায় কিছুটা সময় কাটানোর পরিকল্পনা করা যেতেই পারে।

মিরপুর, আশুলিয়া বা আমিনবাজারের দিক থেকে বিরুলিয়ায় যাওয়া যায়। সেখান থেকে স্থানীয় রিকশা বা অটোরিকশায় নদীর ঘাটে পৌঁছানো সম্ভব।

কেরানীগঞ্জের সারিঘাটে সাদা কাশের মাঠ

ঢাকার খুব কাছেই তবে শহরের ব্যস্ততার বাইরে অন্য রকম পরিবেশ চাইলে কেরানীগঞ্জের সারিঘাটের কথাও ভাবা যায়।

Image

ঢাকার দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের সারিঘাটে কাশবনে প্রতিদিন বেড়াতে আসছেন আশেপাশের এলাকার মানুষ। ছবি: শামছুল হক রিপন

সারিঘাটের বিশাল কাশফুলের মাঠ দর্শন আলাদা অভিজ্ঞতা হতে পারে। কারণ নদী ও সবুজের সঙ্গে কাশফুল মিলে সেখানে শরতের আলাদা আবহ তৈরি করেছে।

এ ধরনের জায়গায় বিকেল বেছে নেওয়াই ভালো। তখন তীব্র রোদ কিছুটা কমে আসে, বাতাসও আরামদায়ক থাকে। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে গেলে কাশবনের ভেতর না ঢুকে নির্দিষ্ট পথ ধরে হাঁটা এবং ছবি তোলাই ভালো।

বসিলা ও ওয়াশপুরেও মিলছে শরতের সাদা মেঘ

মোহাম্মদপুরের বসিলা সেতুর ওপার, ওয়াশপুর ও ঘাটারচরের দিকেও খোলা জমি ও নদী-তীরবর্তী এলাকায় কাশফুল দেখা যাবে।

বিশেষ করে খুব বেশি দূরে যেতে না চাইলে বসিলা-ওয়াশপুরের দিকটি ছোট বিকেলের ভ্রমণের জন্য বিবেচনায় রাখা যায়।

তবে এসব জায়গার অনেক অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি, নির্মাণাধীন এলাকা বা অনির্ধারিত খোলা জায়গা হতে পারে। তাই স্থানীয় মানুষের অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত জমিতে প্রবেশ না করাই ভালো।

Image

ঢাকার দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের সারিঘাটে কাশবনে প্রতিদিন বেড়াতে আসছেন আশেপাশের এলাকার মানুষ। ছবি: শামছুল হক রিপন

কখন গেলে কাশফুল সবচেয়ে সুন্দর?

কাশফুলের সৌন্দর্য দেখতে শুধু জায়গা নির্বাচন করলেই হবে না, সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের শেষভাগে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কাশফুলের দৃশ্য আলাদা মাত্রা পায়।

তবে ফুলের স্থায়িত্ব জায়গাভেদে ভিন্ন হতে পারে। বৃষ্টি হলে অনেক সময় ফুল নুয়ে যেতে পারে, আবার বাতাস ও সময়ের সঙ্গে ফুলের শুভ্রতাও বদলে যায়।

তাই যাওয়ার দিন সকালে আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতি দেখে বের হওয়া ভালো। বিকেলের শেষভাগ সাধারণত ছবি তোলা ও হাঁটার জন্য আরামদায়ক।

আর কাশফুলের সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে ফুল ছেঁড়া বা গাছ মাড়িয়ে ছবি তোলার ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে। কারণ কাশবন অক্ষত রাখলেই তার সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব।

একদিনে কোথায় যাবেন?

শরৎ খুব দীর্ঘ সময় থাকে না। তাই এই সময়ে আকাশ যখন নীল, মেঘ যখন সাদা আর মাঠের ধারে কাশফুল যখন বাতাসে দুলছে, তখন ঢাকার কাছেই একটি বিকেল প্রকৃতির জন্য রেখে দেওয়া যেতে পারে। শহরে ফিরে আসার পরও সেই সাদা ফুলের দৃশ্য হয়ত অনেকক্ষণ মনে থেকে যাবে।

পুরানো খবর:

ঢাকার কাছাকাছি নদীর পাড়ে একদিন
শ্রীমঙ্গলের ‘নির্জন’ ঠিকানায় সবুজের ভেতর নিরিবিলি ছুটি
সিনেমা দেখে ভ্রমণের নতুন ধারা