১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

মানসিক স্বস্তিতে দেয়ালচিত্র শোভিত পথ

গবেষণায় দেখা গেছে, পথের ধারে যে কোনও ধরনের শিল্পকর্ম পথচারীদের মানসিক চাপ কমায়।

মানসিক স্বস্তিতে দেয়ালচিত্র শোভিত পথ

ঢাকার সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে দেয়ালে আঁকা হয়েছে গুণীদের প্রতিকৃতি। ছবি: শামছুল হক রিপন

রিফাত পারভীন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 11 Oct 2026, 01:06 PM

Updated : 11 Oct 2026, 01:06 PM

শহরের পথে হাঁটতে হাঁটতে যদি চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে শিল্পকর্ম, কোথাও ইতিহাসের গল্প, কোথাও বিখ্যাতজনদের প্রতিকৃতি, আবার কোথাও বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা— তবে সেই চলাচলের পথ শুধু রাস্তাতেই সীমিত না।

কারণ তখন শহরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরির খোলা পরিসর হয়ে ওঠে এই ‘ম্যুরাল ওয়াকওয়ে’ বা দেয়ালচিত্র শোভিত পথ।

পৃথিবীর বিভিন্ন শহরেই এমন পথের উদাহরণ রয়েছে। লন্ডনে ‘দ্য লাইন’ নামের প্রায় চার ঘণ্টার হাঁটার পথটি শহরের জলপথের পাশে শিল্প, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যকে একসঙ্গে দেখার সুযোগ দেয় চলাচলকারীদের।

একই শহরের ‘দ্য টাইড’ নদীর পাশে তৈরি খোলা হাঁটার পথ, যেখানে শিল্পকর্মের পাশাপাশি সবুজের ছোঁয়া, বসা ও কিছুক্ষণ থেমে থাকার জায়গাও পান মানুষজন।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে ‘স্ট্রিট আর্ট ওয়াক’-এ প্রায় তিন কিলোমিটার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেয়ালচিত্র, ভাস্কর্য ও নানান ধরনের পথশিল্প দেখার সুযোগ রয়েছে।

অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে হাঁটার পথকে শিল্প, ইতিহাস ও নাগরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার এই ধারণা নতুন নয়।

Image

ঢাকার সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে দেয়ালে আঁকা গুণীদের প্রতিকৃতি দেখছে শিশুরা। ছবি: শামছুল হক রিপন

আর এরকমই আয়োজন এখন রয়েছে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির বিপরীতের ফুটপাতে, যে দেয়ালচিত্রে শোভা পাচ্ছে বাঙালির শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ১০ বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন শাহ, জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়সহ বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি রয়েছে এখানে।

“সেগুনবাগিচার স্বল্পদৈর্ঘ্যের ‘ম্যুরাল ওয়াকওয়ে’ শুধু সৌন্দর্য বাড়ানোরই কাজ করছে না, এর মাধ্যমে পথচারীর জায়গা পথচারীর কাছেই ফিরেছে বলে মন্তব্য করেন, নিয়মিত এই রাস্তায় চলাচল করা আদিল মোস্তফা।

তিনি বলেন, “শুধু হাঁটা নয়, কিছুক্ষণ থামা ও বসার জায়গাও মিলছে যা ফুটপাত পরিকল্পনারই অংশ হওয়া উচিত। এমন পরিষ্কার, ছবি আঁকা হাঁটার রাস্তা চোখেও স্বস্তি দেয়।”

সন্তানকে নিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে আসা এক অভিভাবক আয়শা আজমেরী বলেন, “পথে থামার সুযোগ এই শহরের খুব কম জায়গাতেই মেলে। সংস্কারের পরে এখানে বসলে মনও কিছুটা শান্ত লাগে।”

Image

ঢাকার সেগুনবাগিচায় ফুটপাত সংলগ্ন দেয়ালে আঁকা বিশ্বকবি ও জাতীয় কবির প্রতিকৃতি দেখছে স্কুল শিক্ষার্থী তামিম ও তার মা। ছবি: শামছুল হক রিপন

এই ধরনের শিল্পকর্ম যেভাবে মনে প্রভাব ফেলে

২০২৪ সালে ‘ওয়েলবিইং, স্পেস অ্যান্ড সোসাইটি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় শহরের রাস্তায় শিল্পকর্মের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষক।

শহরের রাস্তায় শিল্পকর্মের সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততার পর অংশগ্রহণকারীরা উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও নেতিবাচক অনুভূতি কম অনুভব করেছেন বলে, সেই গবেষণার ফলাফলে উল্লেখ করা হয়।

“ঢাকার মতো শব্দ, যানজট, ভিড় ও ব্যস্ততায় ভরা শহরে একটি রঙিন, পরিচ্ছন্ন ও অর্থবহ দেয়ালচিত্রের পথ প্রতিদিনের হাঁটার অভিজ্ঞতাকে কিছুটা বদলে মানসিক আরাম ও স্বস্তি দিতে পারে”, মত দেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মনোবিজ্ঞানী নাদিয়া নাসরিন।

Image

ঢাকার সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে দেয়ালে আঁকা হয়েছে গুণীদের প্রতিকৃতি। ছবি: শামছুল হক রিপন

নারীদের জন্য খোলা ফুটপাত

দখল আর নিরাপত্তার কমতি থাকায় অনেক নারীই ফুটপাত ব্যবহারের অস্বস্তিতে থাকেন। কারণ পর্যাপ্ত আলো, খোলা ও প্রশস্ত পথ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং চারপাশে মানুষের স্বাভাবিক উপস্থিতি সবই নারী বান্ধব ফুটপাতের জন্য জরুরি।

প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহের সময় দোলা খন্দকার নামের এক পথচারী সেখান দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বলেন, “পরিষ্কার, মানুষের ভিড় ছাড়া এমন ফুটপাত নিরাপত্তার ভয় অনেকটাই কমায়। ফুটপাত দখলে থাকায় অনেক স্থানেই মূল রাস্তা দিয়ে চলতে হয়। তবে এখানে এখন আলাদা পরিবেশ।”

Image

ঢাকার সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে দেয়ালে আঁকা হয়েছে লোকজ চিত্রকর্ম। ছবি: শামছুল হক রিপন

এমন উদ্যোগ কি আরও আছে?

ঢাকা শহরে এমন বসার ব্যবস্থাসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ‘ম্যুরাল ওয়াকওয়ে’র আরেকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এই বছরের এপ্রিল মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে।

প্রায় ১ হাজার ৩৫০ ফুট ফুটপাত দখলমুক্ত করে ফুলের টব, গাছ, দেয়ালচিত্র ও বসার বেঞ্চ দিয়ে সাজানো হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পে ৫৫০টি ফুলের টব, ৬৫০টি গাছ এবং ৫০টি বসার বেঞ্চ রাখা হয়েছিল।

পুরানো খবর:

সান্ত্বনা দিতে ‍গিয়ে সঙ্গীর মানসিক চাপ বাড়াচ্ছেন না তো?
মন খারাপ করা ‘কনটেন্ট’ বাড়ায় মানসিক ক্লান্তি
মানসিক চাপ থেকে ব্রণ: রেহাই পাওয়ার রয়েছে উপায়