১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শ্রীমঙ্গলের ‘নির্জন’ ঠিকানায় সবুজের ভেতর নিরিবিলি ছুটি

ঝিরির শব্দ, চা বাগানের টিলা আর বনের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া রেলপথ- সব মিলিয়ে দুদিনের ভ্রমণই যথেষ্ট।

রিফাত পারভীন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Aug 2026, 01:10 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:01 PM

চা-বাগান আর সবুজ প্রকৃতির জন্য পরিচিত শ্রীমঙ্গল। আর সবুজের মধ্যে ছুটি কাটাতে রাধানগরের বিষামনি এলাকায় মিলিবে ‘নির্জন ন্যাচার্স হাইডআউট’।

বিষামনি সরকারি স্কুলের বিপরীতেই অবস্থিত এই রিসোর্ট। চারপাশে গাছ, খোলা জায়গা আর নিরিবিলি পরিবেশ। পেছনের দিকে রয়েছে ছোট একটি ঝিরি।

বড় কোনো ঝরনা ধারে যাওয়ার সুযোগ না হলে রিসোর্টের নির্জন পরিবেশে পানির শব্দ আর সবুজের মধ্যে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি অনন্যই মনে হতে পারে।

শুধুমাত্র রাতে থাকার জন্যই নয়, চাইলে দিনের অনেকটা অংশও রিসোর্টের ভেতরেই কাটানো যায়। মিলবে ব্যক্তিগত পুলসহ ভিলা, কটেজ, লুডু-ক্যারাম খেলার ব্যবস্থা, দেশি খাবার এবং দল নিয়ে গেলে বারবিকিউয়ের আয়োজন।

সময় কাটানোর নানান আয়োজন

শহরের ছুটির সঙ্গে প্রকৃতির ছুটির অনেকটাই পার্থক্য আছে। এখানে এসে সারাক্ষণ কোথাও না কোথাও যাওয়ার তাড়া থাকে না। কটেজের বাইরে বের হলেই গাছপালা, খোলা জায়গা আর সবুজ। ইচ্ছে হলে বসে গল্প করা যায়, হাঁটাহাঁটি করা যায়, আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ ঝিরির পাশেও বসেও থাকা যায়।

আর বাইরে বৃষ্টি থাকলে এই আয়োজন আরও জমতে পারে।

ঝিরির দিকে সকালে বা বিকেলে বসে থাকা, পানির শব্দ শোনা বা সবুজের মধ্যে ছবি তোলা—এসব হতে পারে দিনের আরেকটি আনন্দ। বর্ষার সময় ও পরে এখানে পানির প্রবাহও অনেকটাই বাড়ে, যা যোগ করে বাড়তি সৌন্দর্য। তবে সেখানে নামার আগে পানির গভীরতা ও স্রোত সম্পর্কে জেনে নেওয়াও জরুরি।

দুপুরে দেশি খাবার, সন্ধ্যায় বারবিকিউ

ভ্রমণের সঙ্গে খাবারের সম্পর্কই আলাদা। শ্রীমঙ্গলে গিয়ে চা-বাগান দেখার পাশাপাশি দেশি খাবার খাওয়ার আনন্দও যোগ হয়।

নির্জন ন্যাচার্স হাইডআউটে ভাত, ডাল, ভর্তা, মাছ, মাংস ও সালাদের সমন্বয়ে আছে খাবারের ব্যবস্থা।

দুপুরে দেশি খাবার আর বিকেলে গরম ভাজা খাবার নিয়ে বসা যায় আড্ডায়।

বারবিকিউয়ের সঙ্গে থাকবে পরোটা, সালাদ ও পানি। তবে এ আয়োজনের জন্য কমপক্ষে ছয়জন প্রয়োজন।

ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল, পথও হবে ভ্রমণের অংশ

ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায় বাসে, ট্রেনে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে। যারা কম খরচে যেতে চান, তাদের জন্য ট্রেন ভালো বিকল্প হতে পারে।

আবার পথের দৃশ্য দেখতে দেখতে যেতে চাইলে ব্যক্তিগত গাড়ি বা দল নিয়ে খোলা জিপে ঘোরার পরিকল্পনাও করা যায়।

ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলগামী ট্রেনে আসনের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ভাড়া রয়েছে।

সড়ক পথে নন-এসি বাসে ভাড়া সাধারণত ৫৭০ টাকার আশপাশে হয়। এসি বাসে ভাড়া প্রায় ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। হানিফ, শ্যামলী, এনা, বিলাসসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাসে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়।

শ্রীমঙ্গল বাসস্ট্যান্ড বা রেলস্টেশনে নেমে সেখান থেকে অটোরিকশা নিয়ে রাধানগরের বিষামনি এলাকায় যেতে হবে। স্টেশন থেকে অটোরিকশায় প্রায় ১৫০ টাকার মধ্যে রিসোর্টে পৌঁছানো যায়। তবে সময় ও যানবাহনভেদে ভাড়া কমবেশি হতে পারে।

কাছেই চা-বাগানের সবুজ

রিসোর্টের পাশেই রয়েছে ইস্পাহানি চা-বাগান। যে কারণে আলাদা করে চা-বাগান দেখার আয়োজন না করলেও হয়।

সকালে নাশতা করে চা-বাগানের দিকে সহজেই বেরিয়ে পড়া যেতে পারে। সারি সারি চা-গাছ, টিলার ঢাল আর সবুজ পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখা যায়।

তবে চা-বাগানের সব জায়গায় পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি থাকে না। তাই ভেতরে ঢোকা বা ছবি তোলার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া উচিত।

শুধু চা-বাগান ঘুরে ফিরে আসতেও বেশি সময় লাগে না। ফলে এক রাতের ভ্রমণেও সময় নষ্ট না করে আশপাশের প্রকৃতি দেখা সম্ভব।

খোলা জিপে লাউয়াছড়ার পথে

শ্রীমঙ্গল বেড়াতে গেলে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানকে তালিকায় রাখেন অনেকেই। রিসোর্ট থেকে স্থানীয় গাড়ি নিয়ে লাউয়াছড়ার দিকে যাওয়া সম্ভব। আর কয়েকজন মিলে গেলে খোলা জিপ বা চাঁদের গাড়িতে ঘুরতে বের হলে পথটাও হয়ে উঠতে পারে ভ্রমণের আলাদা অংশ।

ছাদখোলা জিপে বসে শ্রীমঙ্গলের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় দুই পাশে চা-বাগান, রাবার বাগান, টিলা আর গাছপালা দেখা যায়। গাড়ির ভেতরে বসে যাওয়ার চেয়ে খোলা জিপে প্রকৃতিকে বেশি কাছ থেকে অনুভব করা সম্ভব।

স্থানীয় জিপ ভাড়ার তথ্য অনুযায়ী লাউয়াছড়া, চা-বাগান, মাধবপুর লেকসহ কয়েকটি জায়গা মিলিয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টার জন্য নয় আসনের একটি জিপের ভাড়া প্রায় ৪ হাজার টাকা।

ছুটির দিনে সেটা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা হতে পারে। তবে এটি নির্দিষ্ট নয়। গাড়ির ধরন, মৌসুম, সময় ও ঘোরার জায়গা অনুযায়ী ভাড়া কমবেশি হয়।

লাউয়াছড়ার বনের ভেতর হাঁটা

লাউয়াছড়া শুধু সবুজ বন দেখার জায়গা নয়। বনের ভেতর হাঁটারও সুযোগ রয়েছে। ছোট পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে গাছপালা, পাহাড়ি পরিবেশ আর বনের নীরবতা উপভোগ করা যায়।

সময় হাতে থাকলে একটু ধীরে হাঁটাই ভালো। তাড়াহুড়ো করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার চেয়ে বনের শব্দ, পাখির ডাক আর চারপাশের সবুজ উপভোগ করাই এখানে ভ্রমণের আসল আনন্দ।

লাউয়াছড়ার সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি হলো বনের সবুজের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইন। গাছপালার মাঝ দিয়ে রেললাইন চলে যাওয়ার দৃশ্যটি অনেকের কাছেই পরিচিত। আর ছবি তোলার জন্যও জায়গাটি বেশ জনপ্রিয়।

তবে রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সময় অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। ট্রেন চলাচলের পথ হওয়ায় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাও জরুরি।

লাউয়াছড়ায় প্রবেশের জন্য আলাদা টিকিট লাগে। প্রবেশমূল্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে বন বিভাগের বর্তমান নির্ধারিত মূল্য জেনে নেওয়া  

এক দিনের ঘোরাঘুরি যেভাবে সাজানো যায়

এক রাতের ভ্রমণ হলে সব জায়গা একসঙ্গে দেখার চেষ্টা না করাই ভালো। এতে ছুটির আনন্দের বদলে ক্লান্তি বাড়তে পারে। বরং প্রথম দিন রিসোর্টে পৌঁছে বিকেলে ইস্পাহানি চা-বাগানের আশপাশে ঘুরে আসা যায়।

ফিরে এসে পুলে সময় কাটানো, লুডু-ক্যারাম খেলা কিংবা সন্ধ্যার খাবার নিয়ে আড্ডা দেওয়া যায়।

পরদিন সকালে নাশতা করে কক্ষ ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়ে লাউয়াছড়ার দিকে বের হওয়া যেতে পারে। দল বড় হলে খোলা জিপ নেওয়া যায়। পথে চা-বাগান ও সবুজের দৃশ্য দেখতে দেখতে লাউয়াছড়ায় পৌঁছে কয়েক ঘণ্টা বনের ভেতর হাঁটা, রেললাইন দেখা ও প্রকৃতি উপভোগ করা যায়।

আরও সময় থাকলে একই দিনের ভ্রমণে মাধবপুর লেকও যোগ করা যায়। তবে কোথাও তাড়াহুড়ো করে পৌঁছানোর চেয়ে আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়া ভালো, কতগুলো জায়গা দেখবেন এবং প্রতিটি জায়গায় কতটা সময় দেবেন।

দুজনের জন্য এক রকম, চারজনের জন্য আরেক হিসাব

ভ্রমণের মোট খরচ অনেকটাই নির্ভর করবে কয়জন যাচ্ছেন এবং কীভাবে যাচ্ছেন তার ওপর।

দুজন গেলে ৩ হাজার ৮০০ টাকার কটেজে থাকা যায়। ব্যক্তিগত পুল চাইলে ৫ হাজার ৮০০ টাকার কাপল বা দম্পতি পুল ভিলা। চারজন গেলে ৬ হাজার ৮০০ টাকার পারিবারিক পুল ভিলাও নেওয়া যায়।

এর সঙ্গে ঢাকা-শ্রীমঙ্গল যাতায়াত, রিসোর্টে খাবার এবং শ্রীমঙ্গল থেকে ঘোরার গাড়ির খরচ যোগ হবে। দল নিয়ে গেলে জিপের ভাড়া ভাগ হয়ে যাওয়ায় মাথাপিছু খরচ কমে আসে।

আবার বাস বা ট্রেনে যাতায়াত করলে ব্যক্তিগত গাড়ির তুলনায় যাতায়াতের খরচও কম রাখা সম্ভব।

তাই খুব বেশি খরচ না করেও এক রাতের একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যায়। আবার একটু আরাম করে ব্যক্তিগত পুল, ভালো খাবার ও পুরো দিনের গাড়ি নিয়ে ঘুরতে চাইলে বাজেট স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।

থাকার খরচ কত

দুজনের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দম্পতি কটেজের দৈনিক ভাড়া ৩ হাজার ৮০০ টাকা। একটু বেশি ব্যক্তিগত পরিসর চাইলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দম্পতি পুল ভিলা নেওয়া যায়। এর ভাড়া ৫ হাজার ৮০০ টাকা।

পরিবার বা চারজনের বন্ধুর দল নিয়ে গেলে চারজনের থাকার উপযোগী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পারিবারিক পুল ভিলার ভাড়া ৬ হাজার ৮০০ টাকা।

এসব থাকার ব্যবস্থার সঙ্গে সকালের নাশতা দেওয়া হয়।

তবে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার বেশি অতিথি থাকলে অতিরিক্ত জনপ্রতি ৫০০ টাকা দিতে হয়।  

রিসোর্টে প্রবেশের সময় দুপুর ১টা। আর কক্ষ ছাড়তে হয় সকাল ১১টার মধ্যে। ফলে এক রাতের ভ্রমণ হলে সময়টা একটু হিসাব করে নেওয়া ভালো।

সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে দুপুরের পর রিসোর্টে পৌঁছে বিকেলটা সেখানে কাটানো যায়। পরদিন সকালে নাশতা করে কক্ষ ছাড়ার পর আশপাশের দর্শণীয় স্থান ঘুরে তারপর ঢাকার পথে রওনা দেওয়া সম্ভব।

আরও পড়ুন

পদ্মার বুকে ঘুরে আসাই যায় হাউজবোটে চড়ে

শতবর্ষী রকেটে চড়ে ঘুরে আসতে পারেন নদীর বুকে

একদিনেই ফেনী ঘুরে আসা যায় রাজধানী থেকে

ঢাকার কাছাকাছি যেসব রিসোর্টে একদিনে বেড়ানো যায়

দিয়াবাড়ির লেকের বুকে যত আনন্দ

শ্রীমঙ্গলে যে দুটি জায়গায় যাওয়া পণ্ডশ্রম