Published : 09 Nov 2025, 04:45 PM
কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে ভ্রমণ নামক ওষুধের হয়ত কোনও বিকল্প নেই৷
আর রাজধানী থেকে একদিনে ঘুরে আসার জায়গা হতে পারে চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলা।
এরকমই একটি ভ্রমণ দিয়ে এসেছেন ঢাকার ‘ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)’-এর বিবিএ বিভাগের শিক্ষার্থী আবেস ইনতেসার অনিক।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এই প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন ফেনীতে ভ্রমণের নানান জায়গার নাম।
২০২২ সালের অক্টোবর মাসে সিদ্ধান্ত নেই বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করার। আর সেই থেকেই শুরু আমার ভ্রমণ অ্যাডভেঞ্চার। পাশাপাশি ইউটিউব চ্যানেল ‘অনিক-দ্য ভায়েটর’-এ ভ্রমণ ভ্লগ নির্মাণ করছি।
কর্মব্যস্ত ঢাকার কোলাহল থেকে একটু পালিয়ে থাকার জন্য ব্যাগ গুছিয়ে রওনা হই চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলার উদ্দেশ্যে। এই যাত্রার সঙ্গী ছিলেন আমার এক ভাই রায়হান হায়দার, যিনি বর্তমানে একটি আইটি ফার্মের কর্ণধার।
থমে গন্তব্য ছিল ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। সেখান থেকে প্রতিদিন অনেক ট্রেন ফেনীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। তবে ফেনী জেলায় সারাদিনের ভ্রমণের জন্য আমরা বেছে নিয়েছিলাম চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস। ট্রেনটি রাত ১১টা ১৫ মিনিটে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়।
বর্তমানে ট্রেনটির ঢাকা থেকে ফেনী পর্যন্ত শোভন চেয়ারের ভাড়া ৩২০ টাকা।
রাজধানী ঢাকাকে পেছনে ফেলে তূর্ণা এক্সপ্রেস আমাদের নিয়ে ছুটতে থাকে ফেনী জেলার উদ্দেশ্যে। রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে গ্রাম, নদী পেরিয়ে ট্রেনটি ভোর সাড়ে চারটায় আমাদেরকে ফেনী জংশন স্টেশনে নামিয়ে দেয়।
রাতের কালো অন্ধকার তখনও কাটেনি। এই অবস্থায় আমরা স্টেশনের অপেক্ষা করি সকালের আলো ফোটা পর্যন্ত।
ভোরের আলো ফুটে উঠতেই বেরিয়ে পড়ি ফেনী জেলা ভ্রমণে। আমার ৬৩টিতম জেলা ফেনী ভ্রমণ নিয়ে মনের ভিতর এক অন্যরকম রোমাঞ্চ কাজ করছিল। সেই রোমাঞ্চকে সাথে নিয়ে ফেনী জংশন স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়েছিলান ফেনী সরকারি কলেজ যাওয়ার উদ্দেশ্যে৷
গুগল ম্যপের সাহায্য পায়ে হেঁটে পাঁচ মিনিটের ভেতর পৌঁছে যাই সেখানে। এটি একটি ঐতিহাসিক স্থান। কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২২ সালে।
ফেনী অঞ্চলের জনগণের টাকায় ফেনী সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময়ের নির্মিত কলেজের ভবনগুলো আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে। আমরা সকালে সেখানে যাওয়ায় তেমন কোনও মানুষের সমাগম দেখতে পাইনি তবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে এখানে অনেক মানুষের সমাগম ঘটে।
ঐতিহাসিক ফেনী সরকারি কলেজ প্রাঙ্গনে কিছু সময় কাটিয়ে চলে যাই ফেনী জেলার আরও একটি দর্শনীয় স্থান রাজাঝির দিঘি। ফেনী সরকারি কলেজের অপর পাশেই দিঘিটির অবস্থান।
জনশ্রুতি রয়েছে ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশের একজন রাজা তার কন্যার অন্ধত্ব দুর করার মানসে প্রায় কয়েকশত বছর আগে এ দীঘি খনন করেন। স্থানীয় ভাষায় কন্যাকে 'ঝি' নামে ডাকা হয়। সেই অনুসারে এটিকে রাজাঝির দীঘি নামে ডাকা হতো।
এই দীঘিকে কেন্দ্র করে ১৮৭৫ সালে ফেনী মহকুমার দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়। দীঘির পাড়ে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটানোর পর সকালের নাস্তার জন্য চলে যাই সেখানকার অন্যতম জনপ্রিয় খাবার দোকান ‘নবী রেস্টুরেন্ট’-এ৷
৭টার দিকেই পুরো রেস্তোরাঁ লোকে-লোকারণ্য। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমরা বসার জন্য সিট পাই। অর্ডার করি গরুর পায়ের নিহারী ও তন্দুর রুটি। গরম গরম গরুর পায়ের নিহারী দিয়ে তন্দুল রুটি খেতে আমাদের বেশ মজাই লেগেছিল। তারপর ফিরনির স্বাদও নেওয়া হল। বর্তমানে দুইশ টাকার ভেতর দুজনের ভালো মানের নাস্তাই হল।
এবার ১০টাকা ভাড়ায় লোকাল সিএনজিতে করে আমরা চলে যাই মহিপালে৷ সেখান থেকে একটি সিএনজি রিজার্ভ করি আমাদের ফেনী জেলা ভ্রমণের পরবর্তী ভ্রমণ গন্তব্য প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি ও শর্শদি মসজিদ ঘুরে দেখা জন্য।
চাইলে রির্জাভ না নিয়ে লোকালভাবেও এই দুই স্থান ঘুরে দেখা যায়। তবে এতে সময় এবং খরচ দুটোই বেশি লাগবে।
মহিপাল থেকে প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি এবং প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি থেকে শর্শদি মসজিদ সেখান থেকে আবার মহিপাল পর্যন্ত আমাদের রিজার্ভ করা সিএনজিটি ভাড়া পড়েছে ৮শ’ টাকা।
প্রায় ৪৫ মিনিটের একটি সিএনজি যাত্রা শেষে আমরা পৌছাই প্রতাপুর জমিদার বাড়িতে, যেটি প্রতাপপুর রাজবাড়ি নামে পরিচিত।
গিয়ে ব্যথিত হই। কারণ ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়ি একদমই অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
প্রায় ১৭৬০ সালে জমিদার বাড়িটি নির্মিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিন কড়ি সাহার দুই পুত্র রাম সুন্দর সাহা ও রামচন্দ্র সাহা। এই এলাকার আশপাশে যত জমিদার ছিল সবার শীর্ষে ছিলেন তারা।
এই জমিদার বংশধররা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরও ২০০২ সাল পর্যন্ত এই বাড়িটতে ছিলেন। তাদের মধ্যে কিছু এখনও ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কিছু ভারতের কলকাতা ও ত্রিপুরা রাজ্যে আছেন।
১৩ একর জায়গা জুড়ে প্রতাপপুর জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। ১০টি ভবন ও ১৩টি পুকুর রয়েছে। এরমধ্যে ৫টি পুকুর পাকা ঘাট বাঁধানো। দুর্ভাগ্যবশত এইগুলো সবই আজ ধ্বংসের মুখে। কোনও কোনও স্থাপনা তো একদম ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
আমাদের দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ও পর্যটন মন্ত্রণালয়-সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যদি এই প্রতাপপুর জমিদার বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিত তাহলে এটি দর্শনার্থীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি স্থান হতো। বর্তমানে বাড়িটির চারপাশে রয়েছে শুধু জঙ্গল আর আগাছা।
যা হোক এরপর সিএনজিতে করে চলে যাই ফেনী জেলার শর্শদি উপজেলায় অবস্থিত শর্শদি মসজিদে, যেটি মোবারক শাহ্ মসজিদ নামে পরিচিত।
ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা। তার শাসনাঞ্চলের রাজধানী ছিল সোনারগাঁও। কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, ত্রিপুরা ও আরাকান রাজ্য জয়লাভের পর তিনি এসব অঞ্চলের জন্য একটি আলাদা রাজধানী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। আর এই দ্বিতীয় রাজধানী করেন ফেনীর শর্শদী অঞ্চলকে যা বর্তমানে একটি ইউনিয়ন।
তার শাসনকালে তিনি বহু বাঁধ, মসজিদ প্রস্তুত করেন।
বাংলার প্রথম স্বাধীন সালতানতের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে থাকা শর্শদি মসজিদ ঘুরে রওনা দেই মহিপালের উদ্দেশ্যে।
মহিপাল থেকে জনপ্রতি ১০ টাকা দিয়ে লোকাল সিএনজিতে করে রওনা দেই ফেনীর ট্রাঙ্ক রোডের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে একটি লোকাল সিএনজিতে করে চলে যাই ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায়। জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়ায় ৪৫ মিনিটের সিএনজি যাত্রা শেষে পৌঁছে যাই সোনাগাজী স্ট্যান্ডে।
সোনাগাজী স্ট্যান্ডে অবস্থিত ‘শ্রীকৃষ্ণ দধি ভান্ডার’-এ মহিষের দুধের দইয়ের স্বাদ নিয়েছিলাম। মূলত ফেনী, হাতিয়া, সন্দীপ ও ভোলায় মহিষের দুধের দই জনপ্রিয়।
জীবনে প্রথমবারের মত মহিষের দুধের দই খেয়ে সোনাগাজী স্ট্যান্ড থেকে লোকাল অটোতে করে জনপ্রতি ৪০ টাকা ভাড়ায় পৌঁছে যাই মুহুরী ইরিগেশন প্রজেক্ট বা মুহুরী প্রজেক্টে যেটি ফেনী জেলার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান।
মুহুরী নদীর ওপর অবস্থিত মুহুরী প্রজেক্টটি দেখতে প্রতিদিনই অনেক দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। বিশেষ করে শীত মৌসুমে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মুহুরী রেগুলেটরের চারদিকে বাঁধ দিয়ে ঘেরা কৃত্রিম জলরাশি, বনায়ন, মাছের অভয়ারণ্য, পাখির কলকাকলি, বাঁধের দুপাশে নিচে খেকে পাথর দিয়ে বাঁধানো এবং উপরদিকে দুর্বা ঘাসের পরিপাটি বিছানা।
ভালোকিছু সময় কাটিয়ে আবার লোকাল অটোতে করে সোনাগাজী স্ট্যান্ড এবং সেখান থেকে আবারও লোকাল সিএনজিতে করে ফেনী সদরের ট্রাঙ্ক রোডে পৌছাই।
এবার দুপুরের খাবারের পালা। ট্রাঙ্ক রোড থেকে ২০ টাকা রিকশা ভাড়ায় চলে যাই ফেনী সদরের আরও একটি পরিচিত খাবারের দোকান ‘হাজির মিষ্টি মেলা অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’-এ।
মূলত এখানকার বিখ্যাত হাজির মিষ্টিটি খুবই জনপ্রিয়। তবে তিন বেলার খাবারও পাওয়া যায়। সাদা ভাত ও আলু দিয়ে শুটকির তরকারি ছিল আমাদের সেদিনের দুপুরের খাবার। আহার পর্ব সেরেই স্বাদ নেই তাদের বিখ্যাত হাজির মিষ্টির। যেটা ছিল নরম এবং গরম, মাত্রই মিষ্টি তৈরি করে আমাদের সামনে পরিবেশন করা হয়েছিল।
এই মিষ্টিরবর্তমান মূল্য প্রতি পিস ২০টাকা করে।
রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে রিকশাতে ২০টাকা ভাড়ায় পৌঁছে যাই ফেনী জংশন রেলওয়ে স্টেশনে। এরপর বিকাল ৪টা ২২ মিনিটে ফেনী জংশন রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঢাকাগামী মহানগর গোধুলি এক্সপ্রেস ট্রেনে করে আমরা ঢাকায় ফিরি।
ফেনী থেকে ঢাকার পর্যন্ত শোভন চেয়ারের বর্তমান ভাড়া ৩২০ টাকা। সবকিছু ঠিক থাকলে বিকালের ট্রেন আনুমানিক রাত ৯টায় ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছায়।
এভাবেই শেষ হয় আমাদের একদিনে ফেনী জেলা ভ্রমণ। যার মাধ্যমে আমার বাংলাদেশের ৬৩টি জেলা ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয়। আর এভাবে একদিনের সময় করে ঘুরে আসতে পারেন চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনীর জেলা থেকে।
আরও পড়ুন