স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক আট ধরনের খাবার
রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে খাদ্যাভ্যাস।
মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী কোনও রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে বা ফেটে গেলে স্ট্রোক হয়।
বয়স ও পারিবারিক ইতিহাসের মতো কিছু ঝুঁকি পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও, দৈনিক খাদ্যাভ্যাস, ওজন, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজ এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়।
কোনও একটি নির্দিষ্ট খাবার স্ট্রোক প্রতিরোধ করতে পারে না; বরং নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং জীবনযাপনে সামগ্রিক পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া সম্ভব।
সবুজ শাকসবজি
পালংশাক, লালশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, ব্রোকলি ও অন্যান্য সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ বা আঁশ, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফোলেইট থাকে।
কিছু শাকসবজিতে প্রাকৃতিক নাইট্রেট থাকে, যা শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এটি রক্তনালী প্রসারিত করতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি শাকসবজি খাওয়া ব্যক্তিদের স্ট্রোকের ঝুঁকি কম।
বিভিন্ন ধরনের ফল
আম, পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, পেঁপে, জাম, আপেল, নাশপাতিসহ বিভিন্ন ফল খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। ফলে থাকে আঁশ, পটাসিয়াম, ভিটামিন ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
প্রতিদিন অতিরিক্ত ২০০ গ্রাম ফল খাওয়ার সঙ্গেও প্রায় ৩২ শতাংশ কম স্ট্রোকের ঝুঁকির পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে ফলের রস বা জুস পানের চেয়ে গোটা ফল খাওয়া বেশি ভালো। কারণ এতে থাকা আঁশ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ার ঝুঁকি কমায়।
বাদাম
চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম ও আখরোটে রয়েছে স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি বা ‘আনস্যাচুরেইটেড ফ্যাট’, আঁশ, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান। বিশেষ করে আখরোটে উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডস থাকে।
একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশি বাদাম খাওয়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে।
তবে লবণ, চিনি বা অতিরিক্ত মসলা মেশানো বাদামের বদলে লবণহীন বা কম প্রক্রিয়াজাত বাদাম পরিমিত পরিমাণে বেছে নিতে হবে।
গোটা শস্য
ওটস, লাল বা বাদামি চাল, আটার রুটি ও অন্যান্য গোটা শস্যে প্রচুর আঁশ, ‘বি’ ভিটামিন এবং প্রয়োজনীয় খনিজ থাকে।
ওটসে থাকা দ্রবণীয় আঁশ রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। তাই সাদা ভাতের পরিবর্তে লাল চাল এবং সাদা পাউরুটির বদলে আটার রুটি খাওয়া উপকারী।
মাছ
ইলিশ, রুই, কাতলা, বোয়াল, চিতলসহ বিভিন্ন মাছ ভালো মানের প্রোটিনের উৎস। সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত কিছু মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডস পাওয়া যায়।
বেশি মাছ খাওয়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ১৪ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে, বিভিন্ন গবেষণায়।
খাদ্যতালিকায় মাছ রাখলে বেশি সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত প্রাণিজ খাবারের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর প্রোটিন পাওয়া যায়। তবে মাছের এই উপকার পেতে অতিরিক্ত তেলে ভাজা বা অতিরিক্ত লবণ দেওয়া মাছ বর্জন করে ভাপিয়ে, সেদ্ধ বা অল্প তেলে রান্না করে খাওয়া ভালো।
কম চিনিযুক্ত দই ও গাঁজন করা খাবার
দইয়ে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও পটাসিয়াম থাকে। কিছু দইয়ে উপকারী জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া বা প্রোবায়োটিকস থাকে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে।
মিষ্টি বা বেশি চিনি দেওয়া দইয়ের পরিবর্তে টক দই বা কম চিনিযুক্ত দই বেছে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা রয়েছে, তাদের দইয়ে যোগ করা চিনির পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা উচিত।
গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর ভালো স্বাস্থ্যের ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে।
ডাল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিন
মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, বরবটি, রাজমা ও অন্যান্য শিমধর্মী খাবারে প্রচুর আঁশ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন থাকে। নিয়মিত ডাল ও শিমজাতীয় খাবার খেলে প্রাণিজ প্রোটিন, বিশেষ করে চর্বিযুক্ত ‘রেড মিট’ বা লাল মাংসের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
এসব খাবারের আঁশ কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে।
ভাতের সঙ্গে নিয়মিত ডাল, সবজি ও মাছ রাখলে সহজেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাবার তৈরি করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি
সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, বাদাম ও মাছ থেকে স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি পাওয়া যায়। মাখন, ঘি বা অতিরিক্ত প্রাণিজ চর্বির পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে এসব স্বাস্থ্যকর চর্বি ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে সব ধরনের তেল ও চর্বিতেই ক্যালরি বেশি থাকে, তাই স্বাস্থ্যকর তেল হলেও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়।
সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবারের পরিবর্তে, পরিমিত অসম্পৃক্ত চর্বি ব্যবহার করাই দীর্ঘমেয়াদে হৃদযন্ত্রের জন্য নিরাপদ।
শুধু খাবার নয়, পুরো খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণায় বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেলেও শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর করা ঠিক না। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, গোটা ফল, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম ও মাছের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ যেহেতু স্ট্রোকের প্রধান ঝুঁকি তৈরি করে, তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকাও জরুরি।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
