স্ট্রোক প্রতিরোধে প্রয়োজন ৭টি পরিবর্তন
বয়স বা বংশগত কারণেই নয়, জীবনযাপনের নানান অভ্যাসের কারণেও স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রাকৃতিকভাবেই বাড়তে থাকে। একইভাবে পরিবারে বাবা, মা বা কোনও নিকটাত্মীয়ের স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে, এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বয়স বা বংশগত ইতিহাসকে পরিবর্তন করার সাধ্য না থাকলেও, স্ট্রোকের পেছনে থাকা অন্যান্য প্রধান ঝুঁকিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মার্কিন চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, সচেতনতা এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে যেকোনও বয়সেই স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়।
বোস্টনের চিকিৎসাবিদ, অভ্যন্তরীণ মেডিসিন ও শিশু বিশেষজ্ঞ এবং হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিংয়ের সহযোগী সম্পাদক ড. মল্লিকা মার্শাল বলেন, “স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে কোনও জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন নেই; বরং পরিচিত কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখলে এই রোগ থেকে দূরে থাকা সম্ভব।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপকে স্ট্রোকের বড় একক কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ স্ট্রোক সরাসরি উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাই ‘ভাস্কুলার’ বা রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখার প্রধান উপায়।
লক্ষ্য ও অর্জন: সাধারণ মানদণ্ড অনুযায়ী রক্তচাপ ১২০/৮০ মিমি পারদ এর নিচে রাখা আদর্শ। এটি অর্জনের জন্য দৈনিক লবণের পরিমাণ ১৫০০ মিলিগ্রাম বা প্রায় অর্ধেক চা-চামচে নামিয়ে আনতে হবে।
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাময়িকী ‘জ্যামা’-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহ কম সোডিয়ামযুক্ত খাবার খেলে রক্তচাপের সিস্টোলিক রিডিং গড়ে ৬ থেকে ৭ মিমি পর্যন্ত কমে আসে।
এছাড়া প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ কাপ শাকসবজি ও ফলমূল এবং সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনবার মাছ খাওয়া উচিত।
শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানো
স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের কারণে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো জটিলতা তৈরি হয়, যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকদের মতে, শরীরের ওজন মাত্র ১০ পাউন্ড (প্রায় ৪.৫ কেজি) কমাতে পারলে তা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে বিশাল প্রভাব ফেলে।
ওজন কমানোর জন্য দৈনিক ১৫০০ থেকে ২০০০ ক্যালরির মধ্যে খাবার সীমাবদ্ধ রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত ২৫০ মিনিট মাঝারি ধরণের ব্যায়াম করা উচিত।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম
ব্যায়াম কেবল ওজন কমায় না, এটি প্রাকৃতিকভাবেই স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস করে। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন দৈনিক ৩০ মিনিট করে মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম (যেমন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা টেনিস খেলা) করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ব্যায়ামের সময় এমন গতি বজায় রাখা উচিত যাতে হাঁপাতে হলেও অনায়াসে কথা বলা যায়।
অ্যালকোহল পরিহার করা
অ্যালকোহল বা মদ্যপানের অভ্যাস রক্তচাপ দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, যারা নিয়মিত অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ করেন, তাদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের ঝুঁকি তীব্র ও মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। মস্তিস্কের সুরক্ষায় এই ধরনের অভ্যাস থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা জরুরি।
‘অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন’ এর চিকিৎসা
‘অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেইশন’ হল হৃদযন্ত্রের এক ধরনের ছন্দহীনতা বা হৃদস্পন্দনের অনিয়ম, যে কারণে হৃদযন্ত্রের ভেতর রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। এই জমাট বাঁধা রক্ত পরে মস্তিস্কে পৌঁছে স্ট্রোকের জন্ম দেয়।
এই সমস্যা স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় পাঁচ গুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই বুকে ধড়ফড়ানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
রক্তে শর্করার মাত্রা বা ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রক্তনালীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে রক্তনালীর ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত হাঁটাচলা এবং ওষুধের সাহায্যে রক্তের গ্লুকোজ সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করা
রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে ধূমপান। এটি একদিকে রক্তকে অতিরিক্ত ঘন ও আঠালো করে তোলে এবং অন্যদিকে ধমনীর দেওয়ালে চর্বির আস্তরণ জমতে সাহায্য করে।
ধূমপান বা ভ্যাপিং সম্পূর্ণ বন্ধ করা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
স্ট্রোকের লক্ষণ চেনার সূত্র:
আমেরিকার ন্যাশনাল স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশনের গাইডলাইন অনুযায়ী, স্ট্রোকের লক্ষণগুলো অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো জরুরি। লক্ষণগুলো মনে রাখার সহজ উপায় হল, ‘ফাস্ট’ (FAST)।
‘এফ’ (F) ‘ফেইস’ বা মুখের পরিবর্তন: হাসতে গেলে মুখের একপাশ ঝুলে পড়া।
‘এ’ (A) ‘আর্ম’ বা বাহুর দুর্বলতা: দুই হাত ওপরে তুলতে গেলে এক হাত অবশ বা দুর্বল লাগা।
‘এস’ (S) ‘স্পিচ’ বা কথা বলায় সমস্যা: কথা বলতে গেলে জড়িয়ে যাওয়া বা অস্পষ্টতা।
‘টি’ (T) ‘টাইম’ বা সময়: এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
এছাড়াও শরীরের একপাশে হঠাৎ তীব্র অবশ ভাব, প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্যহীনতা স্ট্রোকের প্রধান পূর্বলক্ষণ।
