Published : 25 Sep 2025, 05:17 PM
পূজার সাজসজ্জা মানেই শুধু পোশাক আর গয়না নয়, চুলের সাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের পূজায় ফ্যাশন দুনিয়ায় এক বিশেষ পরিবর্তন চোখে পড়ছে— চুলে লম্বা বেণির চল যেন আবারও ফিরে এসেছে। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেলে বেণির সাজ এখন তরুণীদের কাছে হয়ে উঠছে ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
বেণির ফ্যাশন: পুরানো ধারা নতুন রূপে
বাংলা সংস্কৃতিতে বেণি সবসময়ই ছিল শোভা ও নারীত্বের প্রতীক। একসময় বিয়ের আসর থেকে পূজার মণ্ডপ—সবখানেই মেয়েরা বাঁধতেন বেণি। প্রাচীনকালে লম্বা চুল নারীর সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে ধরা হত।
আগের প্রজন্মের প্রায় সবাই লম্বা বেণি করতেন। সময়ের সঙ্গে ছোট চুল বা খোলা চুলের ফ্যাশন জনপ্রিয় হলেও এবার আবার লম্বা বেণি ফিরে এসেছে ট্রেন্ডের তালিকায়।
“তরুণ প্রজন্মের কাছেও বেণি কেবল একটি চুলের সাজ নয়, বরং এটি একধরনের সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে উৎসবের দিনগুলোতে বেণি সাজের মধ্য দিয়ে অনেকেই নিজের ভেতরের বাঙালিয়ানা প্রকাশ করেন”- মন্তব্য করেন জারা’স বিউটি লাউঞ্জ অ্যান্ড ফিটনেস সেন্টারের প্রধান ও রূপ বিশেষজ্ঞ ফারহানা রুমি।
ফুলে ভরপুর বেণি: ফুল বেণির সঙ্গে যেন এক অঙ্গীভূত সম্পর্ক। গাঁদা, জুঁই, গোলাপ কিংবা রজনীগন্ধা— যে কোনো ফুল দিয়ে সাজানো বেণি পূজার আবহে এনে দেয় এক অনন্য মাত্রা।
ছোট ছোট ফুল বেণির গাঁথুনিতে সাজালে তৈরি হয় এক নান্দনিকতা, যা দেবী দর্শনে পরিপূর্ণতা এনে দেয়।
পূজার সাজে বিশেষভাবে ফুলের জুড়ি বানিয়ে বেণিতে ব্যবহার করা যায়। এতে বেণি শুধু সুন্দর হয় না, ছবিতেও লাগে দারুণ। ফুলের ঘ্রাণ সারাদিন মনকেও রাখে প্রফুল্ল।
ট্যাসেল ও কাটা: নতুন সংযোজন: শুধু ফুল নয়, এখন বেণির সাজে জায়গা করে নিচ্ছে ট্যাসেল ও কাটা। উজ্জ্বল রংয়ের ট্যাসেল ঝুলিয়ে দেওয়া বেণি তরুণীদের সাজে যোগ করছে প্রাণবন্ততা।
আবার কাটা বা কৃত্রিম হেয়ার অ্যাকসেসরিজ ব্যবহার করলে বেণি হয়ে ওঠে ঘন ও আকর্ষণীয়।
মুক্তা, পুঁতি, সিকুইন, মেটাল বা ঝকমকে স্টোন ট্যাসেল বেণির নিচে অনেকেই ব্যবহার করেন।
রিবন ও ঝলমলে সাজ: রঙিন রিবন জড়িয়ে তৈরি করা বেণি একদিকে যেমন দেয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া, অন্যদিকে আধুনিক ফ্যাশনের আভাও বয়ে আনে। বিশেষ করে সিল্ক বা সাটিন রিবন ব্যবহার করলে বেণির সৌন্দর্য বেড়ে যায় দ্বিগুণ।
অনেকেই বেণিতে মেটালিক অনুষঙ্গ বা ছোট ঝলমলে পিন ব্যবহার করছেন, যা পূজার রাতে আলোর ঝলকানিতে করে তোলে আরও নজরকাড়া।
ফারহানা রুমি বলেন, “গ্রামবাংলায় পূজার সময় মেয়েরা সাধারণত লাল, সাদা বা সবুজ রংয়ের ফিতা ব্যবহার করতেন। এখনকার মেয়েরা সেই একই ধারা আধুনিকভাবে ফিরিয়ে এনেছেন।”
এখন বেণিতে ঝলমলে মোটা ও চিকন দুই ধরনেরই রিবন ব্যবহারের ট্রেন্ড চলছে। বিশেষ করে চিকন সোনালি ও রূপালি করে চকচকে রিবন উৎসবের আবহ তৈরি করে। যা পুরো বেণিতে পেঁচিয়ে পরা হয়।
গাজরার আবেদন: দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এখন পূজার সাজে গাজরার ব্যবহার বেড়েছে। সাদা জুঁই ফুলের গাজরা বেণির চারপাশে জড়িয়ে দিলে চুলের সাজ হয়ে ওঠে রাজকীয়।
বিশেষ করে রাতের পূজায় গাজরার বেণি আলোর ঝলকানিতে অন্য রকম সৌন্দর্য এনে দেয়।
মুক্তা ও পুঁতির ঝলক: বেণিতে মুক্তা বা পুঁতির মালা জড়ানোও এখন দারুণ জনপ্রিয়। ছোট ছোট মুক্তার মালা বা রঙিন পুঁতি দিয়ে তৈরি চেইন বেণির সঙ্গে মেলালে সাজে আভিজাত্য আসে।
পূজার বিশেষ দিনে শাড়ির সঙ্গে মানানসই মুক্তা-সাজানো বেণি হয়ে ওঠে নজরকাড়া। আনারকলি, লেহেঙ্গা, কামিজের সাথেও এমন চুলের সাজ বিশেষ করবে পূজা উদযাপন।
ঝালর ও চেইন: বেণির গাঁথুনিতে সোনালি বা রুপালি ঝালর জুড়ে দেওয়া যায়। অনেকেই চেইন-এ্যাকসেসরিজ ব্যবহার করেন, যা হালকা দুলতে থাকে এবং উৎসবের সাজে ভিন্নরকম আবেদন আনে।
পূজার সন্ধ্যায় বা আনন্দযাত্রায় এই ঝালরের ঝিকিমিকি একেবারে মানানসই। শুধু শাড়ি নয় পশ্চিমা পোশাকের সাথেও ঝালর ও চেইন এ্যাকসেসরিজ মানিয়ে যাবে।
কৃত্রিম ফুল ও স্টোন-পিন: সব সময় আসল ফুল পাওয়া যায় না, আবার টিকেও না বেশি সময়। তাই অনেকেই এখন কৃত্রিম ফুল ব্যবহার করছেন। এগুলো রঙিন, নান্দনিক এবং দীর্ঘ সময় টিকে থাকে। পাশাপাশি ঝলমলে স্টোন-পিন বেণির বিভিন্ন জায়গায় লাগিয়ে দিলে তৈরি হয় ঝকঝকে সাজ।
রঙিন দড়ির গাঁথুনি: পাশ্চাত্যের ফ্যাশন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এখন বেণিতে রঙিন দড়ি বা থ্রেড গেঁথে সাজানোর চল এসেছে- জানান ফারহানা রুমি।
লাল, নীল, সোনালি কিংবা সবুজ দড়ি দিয়ে বেণি সাজালে তা হয় ‘বোহেমিয়ান’ স্টাইলের মতো। আবার পূজার শাড়ির কিংবা আধুনিক পোশাকের সঙ্গে মেলালে তৈরি হয় ‘ফিউশন লুক’।
ফেদার বা পালকের স্পর্শ: যারা একটু ভিন্নধর্মী সাজ চান, তাদের জন্য পালক বা ফেদার স্টাইল দারুণ মানানসই। বেণির নিচে রঙিন পালক ঝুলিয়ে দিলে তা হয়ে ওঠে একেবারে আলাদা ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
পূজার কোলাহলে এই সাজ তরুণীদের আলাদা করে নজর কাড়তে সাহায্য করে। যারা খুব লম্বা বেণি পড়তে চান না নিজের প্রাকৃতিক চুলের হেয়ার স্টাইল করতে মাঝারি আকারে বেণিতে ফেদার বা পালক ঝুলিয়ে ফিউশন লুক আনা যায়।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
ফারহানা রুমি বলেন, "পূজার সাজে বেণি সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক স্টাইল। এতে চুল গুছিয়ে থাকে, আবার শাড়ির, আনারকলি, লেহেঙ্গা, কামিজ, বড় ঘেরের স্কার্টের সঙ্গে পুরো সাজে সমন্বয়ও আসে।"
তার মতে, "ফুল বা গাজরা ব্যবহার করলে তাজা ফুলই ভালো, তবে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার জন্য কৃত্রিম ফুলও ব্যবহার করা যেতে পারে। আর ট্যাসেল, মুক্তা বা ঝালর— এসব অ্যাকসেসরিজ অবশ্যই হালকা ও মানসম্মত হওয়া জরুরি, যাতে চুলে চাপ না পড়ে।"
বেণি ও আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড
শুধু বাঙালিদের মাঝেই নয় বাংলাদেশ বিশ্ব ফ্যাশন দুনিয়াতেও বেণির জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছে।
নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইকে বিভিন্ন ধরনের ব্রেইড বা বেণি করা হেয়ারস্টাইল দেখা গেছে। লন্ডন ও প্যারিস ফ্যাশন শোতেও ডিজাইনাররা চুলের বেণিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।

পূজায় চুলের যত্ন
বেণি সুন্দরভাবে করতে হলে চুলের যত্নও জরুরি।
ফারহানা রুমি পরামর্শ দেন, "পূজার আগে চুলে নিয়মিত তেল মালিশ করা উচিত। নারিকেল তেল বা ‘আমন্ড অয়েল’ ব্যবহার করলে চুল হয় মসৃণ ও সহজে বাঁধা যায়। শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার করলে চুল জট ছাড়ানো সহজ হয়, ফলে বেণি বাঁধতে সুবিধা হয়।"
চুলের সৌন্দর্যের জন্য শুধু বাহ্যিক যত্ন নয়, সুষম খাদ্যও জরুরি। পর্যাপ্ত ভিটামিন, লৌহ ও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেলে চুল হয় মজবুত ও ঘন।
আরও পড়ুন