০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

পূজায় শাড়ি পরাতে দেশীয় ও আধুনিক স্টাইল

এক প্যাচের শাড়ির পরার ধরন যেমন রয়েছে তেমনি আছে বেল্ট ব্যবহারের চল।

পূজায় শাড়ি পরাতে দেশীয় ও আধুনিক স্টাইল
ছবি: সৌজন্যে: লা রিভ।

রিফাত পারভীন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 18 Sep 2025, 05:52 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:19 PM

পূজার মণ্ডপের আলো, ঢাকের বাজনা আর ভক্তির স্রোতের পাশাপাশি বাঙালি নারীর সাজও হয়ে ওঠে উৎসবের এক অপরিহার্য অংশ। আর সেই সাজের কেন্দ্রে থাকে শাড়ি।

দেশিয় ফ্যাশনহাউজ বিবিয়ানার প্রধান লিপি খন্দকার বলেন, “শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পূজার সময় দেশীয় শাড়ি পরার রীতি চলে আসছে। তাঁত, জামদানি, বালুচরী, মসলিন কিংবা বেনারসি কাতান— প্রতিটি শাড়িই কেবল পোশাক নয়, ইতিহাস আর শেকড়ের সঙ্গে জড়িত এক প্রতীক।"

একইসঙ্গে আধুনিক শাড়ি ও নতুন স্টাইল এখন পূজার সাজে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই মেলবন্ধনই শারদীয় সাজকে করে তোলে সমসাময়িক।

দেশীয় শাড়িতে পূজা দর্শন

তাঁত শাড়ি তার সূক্ষ্ম তাঁতের কাজের জন্য খ্যাত। সাধারণত লাল, কমলা বা হলুদ রংয়ের এই শাড়ির পেছনের অংশে জটিল ফুল ও জ্যামিতিক মোটিফ থাকে। এটি পূজার দিনের সঙ্গে মিলেমিশে যায় একেবারেই।

লিপি খন্দকার বলেন, “জামদানি শাড়ি বাংলাদেশের এক অনন্য ধারা, যা মূলত ঢাকা অঞ্চলে বোনা হয়। এটি হালকা ও এর মধ্যে দিয়ে বাতাস চলাচল করায় আরামদায়কও হয়, যা পূজার দুপুরে পরার জন্য আদর্শ।”

এর নকশায় সাধারণত ফুল, পাতা বা পাখির মোটিফ থাকে। পূজার বিশেষ উৎসবে বাঙালি নারী বহুযুগ থেকে এই শাড়িকেই বেছে নেন।

গরদ শাড়ি সোনালি বা রূপালি শেইডে তৈরি হয় এবং এর পাড়ে থাকে সূক্ষ্ম কারুকাজ। পূজার সময় এই শাড়ি বিশেষভাবে পছন্দের।

কাতান শাড়ি হালকা ও নরম সিল্কের কাপড়ের শাড়ি।

পূজার জন্য সাধারণত সাদা বা অফ-হোয়াইট রংকে বেছে নেন নারীরা। মসলিন শাড়ি হালকা ও নরম, সাধারণত সাদা বা ক্রিম শেইডের শাড়িতে মণ্ডপে মণ্ডপে উদযাপন করেন পূজা। এটি গরম দিনে পূজার জন্য আদর্শ।

বালুচরী শাড়ি স্থানীয় তাঁতের কারুকাজ এবং নকশার জন্য বিখ্যাত। পৌরাণিক নকশার সাথে ফুল এবং পাতা মোটিফ এই শাড়ির নকশার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেশীয় ও ঐতিহ্যবাহী শাড়ির পছন্দে বালুচরী শাড়ি অদ্বিতীয়।

আধুনিক শাড়ি: পূজার নতুন ট্রেন্ড

যেখানে দেশীয় শাড়ি ঐতিহ্যকে ধরে রাখে, আধুনিক শাড়ি পূজার সময় নতুন ফ্যাশনের দিক নির্দেশ করে। আজকাল জর্জেট, ক্রেপ, ওরগানজা, পলিয়েস্টার শাড়ি বেশি জনপ্রিয়। কারণ এগুলো হালকা, ফ্লোয়িং এবং সহজেই সামলানো যায়।

ব্লক প্রিন্টেড শাড়ি, সিকুইন ও বিডেড শাড়ি, লেহেঙ্গা-স্টাইল শাড়ি এবং প্যান্ট স্টাইল শাড়িও বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

কিছু শাড়িতে ধাতব শেইড, ফ্লোরাল প্রিন্ট বা জ্যামিতিক মোটিফ ব্যবহার হয়, যা পুরানো ঐতিহ্যের সঙ্গে এক নতুন ফিউশন তৈরি করে।

শাড়ি পরার দেশি স্টাইল

শাড়ি পরার ধরন অঞ্চলভেদে ভিন্ন। পূজার সময়ে নারীরা এসব ভিন্ন ধারা দিয়ে সাজে বৈচিত্র্য আনেন।

আটপৌরে স্টাইল বাংলার ঐতিহ্যবাহী এক ধরন, যাকে একপ্যাচ শাড়িও বলা হয়। যেখানে আঁচল বুকের ওপর দিয়ে কাঁধে ফেলা হয়। সিঁদুর খেলার সময় এই স্টাইল বেশ জনপ্রিয়।

নবাবী ঢঙ মূলত মুর্শিদাবাদ বা নদীয়ার অভিজাত বাড়ির নারীদের শাড়ি পরার ধরন, যেখানে আঁচল কপালে টেনে আনা হতো। এটি এখন বিশেষ আড্ডা বা ফটোশুটে ব্যবহৃত হয়।

‘জারা’স বিউটি লাউঞ্জ অ্যান্ড ফিটনেস সেন্টার’য়ের প্রধান ও রূপবিশেষজ্ঞ ফারহানা রুমি বলেন,  “আরেকটি স্টাইল হল বাঙালি ঘরোয়া স্টাইল, যা দৈনন্দিন জীবনে প্রচলিত। যেখানে পিনবিহীন সহজভাবে শাড়ি জড়িয়ে নেওয়া হয়; শাড়ির আঁচল মাথার ওপর দিয়ে নামানো হয়। আবার আঁচল কিছুটা এলোমেলো ভাবেও দেওয়া হয়। এতে খুব ‘ক্যাজুয়াল লুক’ আসে আবার দেশীয়ভাবও থাকে। পূজার সকালের সাজে মানানসই।"

শাড়ি পরিধানের আধুনিক স্টাইল

আধুনিক ফ্যাশনে শাড়ি পরার ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক ধারা বেড়েছে। তরুণীরা শাড়িকে নিজেদের মতো করে রূপ দিচ্ছেন।

বেল্টেড শাড়ি কোমরে বেল্ট ব্যবহার করে শাড়ি আরও স্টাইলিশ করে তোলে এবং সামলানো সহজ হয়।

লিপি খন্দকার বলেন, “প্যান্ট স্টাইল শাড়ি পেটিকোটের বদলে পালাজো বা প্যান্ট ব্যবহার করে পরা হয়, যা চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্য দেয়। কেপ বা জ্যাকেট ব্লাউজ সাধারণ ব্লাউজের বদলে লং জ্যাকেট, কেপ বা শ্রাগ ব্যবহার করে শাড়িকে সমসাময়িক লুক দেওয়া যায়।"

এছাড়া প্রি-স্টিচড শাড়ি বাজারে পাওয়া যায় রেডি-টু-ওয়্যার ফর্মে, যা ব্যস্ত তরুণীদের জন্য খুবই সুবিধাজনক।

পূজার দশ দিন: ট্র্যাডিশনাল শাড়িতে সাজ

ষষ্ঠী পূজা: পূজার শুরুতেই শারদীয় সকালে বাঙালি নারীরা হালকা রংয়ের শাড়ি; যেমন- ধুপিয়ান বা মসলিন শাড়ি পরতে পারেন। সাদা বা ক্রিম শেইডের এই শাড়ির আঁচলে লাল বা কমলার সীমিত মোটিফ থাকলে পূজার আবহ ফুটে ওঠে।

সপ্তমী পূজা: দেবীর মূল আগমন ও আরাধনার দিন। এই দিনে রঙিন শাড়ি, যেমন- জামদানি শাড়ি বেশ মানায়। এর সূক্ষ্ম তাঁতের কাজ এবং ফুল-পাতা বা পাখির মোটিফ পূজার আবহের জন্য যথাযথ।

অষ্টমী পূজা: অষ্টমীতে দেবীর পূর্ণ আরাধনা হয়। এই দিনে বিশেষ মর্যাদার জন্য তাঁত শাড়ি পরলে ফুটে উঠবে পূজার সৌন্দর্য। লাল, হলুদ বা কমলা রংয়ের শাড়ি পূজার মঞ্চ ও প্রদীপের আলো দুটোকেই আরও উজ্জ্বল করে। তাঁত শাড়িতে জটিল ফুল ও জ্যামিতিক মোটিফ পূজার ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে।

নবমী পূজা: নবমী হল পূজার প্রধান দিনগুলোর মধ্যে একটি। সোনালি বা রূপালি বুননের কারণে বেনারসি কাতান শাড়ি এই দিনে বিশেষভাবে মানায়। দেবীর আরাধনা ও পূজার সাজের মর্যাদা বজায় রাখতে এই শাড়ি বাঙালি নারীদের প্রিয়।

দশমী তথা বিসর্জন/বিজয়া দশমী: বিসর্জনের দিনে ধাতব বা উজ্জ্বল মোটিফযুক্ত শাড়ি, যেমন- সিল্ক শাড়ি পরা মানায়। লাল, গেরুয়া বা কমলার শেইড বিসর্জনের অনুভূতি এবং প্রদীপের আলোকে পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলে। শাড়ির ধাতব বা উজ্জ্বল বুনন এই উৎসবের আনন্দকে আরও বেড়ে দেয়।

এছাড়া মটকা বা বালুচরি শাড়ি হালকা এবং আরামদায়ক। এই শাড়িগুলো দীর্ঘ সময় পরে থাকার জন্য ভালো।

আর শান্তি ও সৌন্দর্যের ছোঁয়া রাখতে চাইলে ধুপিয়ান শাড়ি পরা যায়। সাদা বা ক্রিম শেইডের শাড়ি আরামদায়ক এবং সৌন্দর্যও বজায় রাখে।

আরও পড়ুন

এই শরতে পূজাতে নতুন ট্রেন্ড

দেবীর রূপে শারদীয় সাজ