১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

হাড়ের যত্ন শুরু হোক চল্লিশের আগেই

বয়স বাড়ার অপেক্ষা না করে আগে থেকেই হাড়ের যত্ন নেওয়া জরুরি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 11 Oct 2026, 05:19 PM

Updated : 11 Oct 2026, 05:19 PM

বয়স বাড়লে হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই হাড়ের যত্নের কথা উঠলেই ভাবনা আসে, বয়স্ক হওয়ার পরেই কেবল এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে চল্লিশ বা পঞ্চাশের আগে হাড়ের ঘনত্ব নিয়ে খুব একটা ভাবেন না অনেকেই।

অথচ শৈশব, কৈশোর ও বিশের কোঠায় হাড়ের শক্তি গড়ে ওঠে। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমতে পারে।

তাই ত্রিশ ও চল্লিশের কোঠায় জীবনযাপনের অভ্যাস, ভবিষ্যতে হাড় মজবুত থাকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া-চিকিৎসক রিউবেন চেন রিয়েলসিম্পল-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “হাড়ের শক্তি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ সময়টি ধারণার চেয়ে ছোট।”

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “শৈশব, কৈশোর ও বিশের কোঠায় হাড়ের অধিকাংশ শক্তি ও ঘনত্ব তৈরি হয়। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে। তাই বয়স বাড়ার অপেক্ষা না করে আগে থেকেই হাড়ের যত্ন নেওয়া জরুরি।”

হাড়ের ঘনত্ব বলতে যা বোঝায়

হাড়ের ঘনত্ব বলতে বোঝায়, হাড়ের মধ্যে থাকা খনিজ পদার্থের পরিমাণকে। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মতো খনিজ উপাদান হাড় শক্ত ও মজবুত রাখতে সাহায্য করে।

সাধারণত হাড়ের ঘনত্ব বেশি হলে, ভাঙার ঝুঁকি কম থাকে।

অন্যদিকে, ঘনত্ব কমে গেলে পড়ে যাওয়া বা কাজের সময় সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

হাড় শুধু শরীরের কাঠামো ধরে রাখে না, শরীরকে নড়াচড়া করতেও সাহায্য করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড় দুর্বল হয়ে পড়লে হাঁটাচলা, সিঁড়ি ভাঙা বা কাজ করা কঠিন হতে পারে।

“তবে হাড়ের ঘনত্ব কমা মানেই যে সবাই একই সমস্যা অনুভব করবে, তা নয়। বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, হরমোনের পরিবর্তন এবং কিছু ওষুধের ব্যবহার হাড়ের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে”, বলেন রিউবেন চেন।

হাড় দুর্বল হলেও সব সময় বোঝা যায় না

হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে আসল ঝুঁকি হল, শুরুতে সাধারণত কোনও স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। শরীরের অন্য অনেক সমস্যার মতো হাড় দুর্বল হলেও, সব সময় ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হয় না।

এক্ষেত্রে পড়ে গিয়ে বা সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়ার পর, বোঝা যায় হাড়ের ঘনত্ব কমে গেছে।

ডা. চেন বলেন, “এ কারণেই হাড় ক্ষয়জনিত রোগকে নীরব রোগও বলা হয়। কারণ হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকলেও বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। তাই প্রয়োজন পরীক্ষা করা।”

তবে সবার একই বয়সে পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হয় না। বয়স, মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার সময়, আগের হাড় ভাঙার ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

হাড়ের ঘনত্ব নির্ণয়ের জন্য করা পরীক্ষায় হাড়ে খনিজ পদার্থের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কার পরীক্ষা প্রয়োজন, কখন প্রয়োজন এবং কত দিন পর আবার পরীক্ষা করতে হবে, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করতে হয়।

চল্লিশের পর হাড়ের যত্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ

চল্লিশের কোঠায় নারী ও পুরুষ, দুয়ের ক্ষেত্রেই হাড়ের ঘনত্ব কিছুটা কমতে পারে। তবে নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের সময় এই পরিবর্তন সাধারণত দ্রুত হয়। এ সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যায়।

ডা. চেন ব্যাখ্যা করেন, “এই হরমোন হাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য ধরে রাখতে দরকার হয়। ফলে মেনোপজের আশপাশের সময়ে অনেক নারীর হাড়ের ক্ষয় দ্রুত বাড়তে পারে।”

তবে হাড়ের যত্ন নেওয়ার জন্য চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করা ঠিক নয়। কম বয়স থেকেই নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়া দরকার।

হাঁটা ও শরীরচর্চায় হাড় সক্রিয়

হাড় ভালো রাখতে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের গুরুত্ব অনেক। হাঁটা, দৌড়ানো, নাচ এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শরীরের ভার বহন করতে হয়- এমন ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্যে সহায়ক হতে পারে।

শরীর যখন নড়াচড়া করে এবং পেশি হাড়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন হাড়ের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া উদ্দীপিত হয়। ফলে হাড়ের ঘনত্ব ধরে রাখতে বা কিছু ক্ষেত্রে উন্নত করতেও সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

রিউবেন চেনের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চার লক্ষ্য রাখা যেতে পারে।

পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত তিনদিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করা উপকারী। নিতম্ব ও মেরুদণ্ডের হাড়কে শক্তিশালী রাখতে সহায়ক ব্যায়ামও পরিকল্পনায় রাখা যেতে পারে।

তবে আগে থেকেই হাড়ের ঘনত্ব কম, হাড় ভাঙার ইতিহাস রয়েছে বা অন্য শারীরিক সমস্যা থাকলে, চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ব্যায়ামের ধরন ঠিক করা উচিত।

আর শরীরচর্চা শুরু করতে জটিল কোনও ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। নিয়মিত হাঁটা দিয়ে শুরু করা যায়। পরে সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যায়ামের সময় ও ধরন বাড়ানো যেতে পারে।

এছাড়া দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে, ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করাই ভালো।

ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলনও জরুরি

হাড় মজবুত রাখার পাশাপাশি পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এক পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, ধীরে ধীরে গোড়ালি থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত সরল রেখায় হাঁটা বা এক পাশ থেকে অন্য পাশে নিয়ন্ত্রিতভাবে পা সরানোর মতো সহজ অনুশীলন করা যায়।

তবে ভারসাম্যের সমস্যা থাকলে দেয়াল বা মজবুত কোনও অবলম্বনের পাশে থেকে অনুশীলন করা উচিত। প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত ব্যক্তির সহায়তাও নিতে হবে।

পাশাপাশি ঘরের মেঝেতে পিচ্ছিল কিছু পড়ে থাকলে তা সরিয়ে রাখা, সিঁড়িতে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা এবং চলাচলের পথে বাধা না রাখাও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে।

খাবারে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোটিন

ক্যালসিয়াম হাড়ের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। দুধ, দই, কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন ছোট মাছ, কিছু শাকসবজি এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার থেকে এটি পাওয়া যায়।

প্রতিদিনের খাবারে বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালসিয়ামের উৎস রাখা ভালো।

ভিটামিন ডি শরীরকে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। সূর্যের আলো শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে সহায়ক।

“তবে দিনের কোন সময়ে কতক্ষণ রোদে থাকা উপযুক্ত সেটা ত্বকের ধরন, আবহাওয়া ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করে”, বলেন ডা. চ্যান।

কিছু খাবার থেকেও ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে পরামর্শ দিতে পারেন।

প্রোটিনও দরকার হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যের জন্য। তাই মাছ, ডিম, দুধ, ডাল, বাদাম ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সুষম খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

আবার খাবার থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া যাচ্ছে কি-না, সেটা নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো। নিজের ইচ্ছায় বেশি মাত্রায় ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডির বড়ি খাওয়া উচিত নয়।

ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়ানো

ধূমপান হাড়ের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। অতিরিক্ত মদ্যপানও হাড় দুর্বল হওয়া এবং পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

শরীরের ওজন স্বাস্থ্যকর সীমায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। খুব কম ওজন এবং অপুষ্টি হাড়ের দুর্বলতার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজনের কারণে শরীরের নড়াচড়া সীমিত হয়ে গেলে, শারীরিক সক্রিয়তাও কমে যেতে পারে।

পুরানো খবর:

হাড় ক্ষয় রোধে আলুবোখারা
হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য যে শাক উপকারী
হাড়ের জন্য উপকারী খাবার
পায়ের পাতায় শক্তি বাড়াতে প্রতিদিনের সহজ রুটিন