পহেলা বৈশাখে রাজধানী কেন্দ্রিক বাংলা খাবারের আয়োজনে পান্তাভাত খাওয়ার প্রচলন শুরু নব্বই সালের দিকে। যদিও সমালোচনা থেকে পার পায়নি খাবারটি। তবে এর পুষ্টিগুণের কথাও অস্বীকার করা যাবে না।
পান্তাভাত- সাধারণ ভাতের চেয়ে স্বাস্থ্যকর বলে মনে করা হয়। কারণ এটি গাজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় আর নিদিষ্ট কিছু পুষ্টিগুণ বাড়িয়ে তোলে।
গবেষণায় দেখা গেছে গাজন প্রক্রিয়ার পর ভাতে বি ভিটামিন কমপ্লেক্স, ভিটামিন কে, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রন (লৌহ), ম্যাগনেসিয়াম, সেলেনিয়াম, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২ পুষ্টি বৃদ্ধি পায়।
বাসিভাত পানিতে সারারাত (৮ থেকে ১২ ঘন্ট) রেখে গাজানোর মাধ্যমে তৈরি করা হয়। এখানে পানির নিচে ভাত ঠাণ্ডা থাকে। অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে না। ফলে ব্যাক্টেরিয়া ভাতকে পঁচিয়ে ফেলতে পারে না।
ভাতে পানি থাকায় ভাতের ফার্মেন্টেইশন দ্রুত হয়। ফলে ভাতের মধ্যে থাকা কার্বোহাইড্রেইট ভেঙে যায়। এভাবে ভাত পানির সংযোগ হওয়ায় ভাত ভালো থাকে।
মাস্টারসেফ নারী কিশোয়ার চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ার প্রতিযোগীতায় পান্তাভাত তৈরি করে অবাক করে দিয়েছিলেন। তখন বিষয়টি অনেকের কাছে আলোচনায় চলে আসে।
পুষ্টিগুণ
- পান্তাভাত একটি প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এটি আইবিএস, সিলিয়াক ডিজিজ এবং গ্যস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা নিরাময়ে প্রতিরোধ করতে পারে। এছাড়া এটি সহজপাচ্য খাবার যা দুর্বল হজমশক্তি ব্যক্তিদের জন্য উপকারী।
- নিয়মিত সেবনে পেট ফাঁপা কমে, মলত্যাগ উন্নত হয় কোষ্ঠকাঠিন্য ও বদহজমের সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
- পান্তাভাত প্রোবায়োটিক হওয়ায় শ্বেত রক্তকণিকার সংশ্লেষণ উন্নত করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে উন্নত করে।
- পান্তাভাত তাৎক্ষনিক শক্তি দেয় এবং শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখে পানিশূন্যতা দূর করে। শরীর ঠাণ্ডা রাখতে পারে।
- গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত পান্তাভাত খেলে ক্লান্তি ও দুর্বলতা কমে। কারন এতে ভিটামিন বি১২ এর পরিমাণ বেশি থাকে।
- পান্তাভাতে প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সেলেনিয়াম থাকে যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। একইভাবে ম্যাগনেসিয়াম, সেলেনিয়াম এর মাত্রা বেশি থাকে যা হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
- পান্তাভাত প্রতিরোধী স্টার্চ প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া বৃদ্ধির পাশাপাশি ত্বক ও চুলকে মসৃণ ও উজ্জ্বল করার জন্য শক্তিশালী ভুমিকা রাখে।
- পান্তাভাত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উপাদান বাড়াতে পারে। এতে থাকা ফেনোলিক যৌগ এবং ফ্লাভানয়েডস’য়ের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষকে জারন চাপ থেকে রক্ষা করতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
- পান্তাভাত থেকে পাওয়া ‘ভিটামিন কে’ একটি চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন যা রক্ত জমাট বাঁধা ও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ভিটামিন কে ক্যালসিয়াম নিয়ন্ত্রণে ও হৃদযন্ত্রের সাস্থ্য বজায় রাখতে ভুমিকা রাখে।
- পান্তাভাত ফাইটিক অ্যাসিডের মতো পুষ্টি বিরোধী উপাদান হ্রাস করার মাধ্যমে খনিজ পদার্থের শোষণ উন্নত করে।
- পান্তাভাতে আছে বিটা সিটোস্টেরল এবং কেম্পেস্টেরল যা কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
পান্তাভাত তৈরি করার সঠিক নিয়ম
- পান্তাভাত করার সময় অ্যালুমিনিয়াম বা প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করা যাবে না। মাটির বাসন বা পাত্র ব্যবহার করতে হবে।
- পান্তাভাত করতে সদ্য রান্না করা ভাত ব্যবহার করবেন। ফ্রিজে রাখা রান্না করা ভাত এই কাজে ব্যবহার করবেন না।
- পান্তাভাত করার সময় ভাত বেশি নরম করে রান্না করা যাবে না এবং রান্না পর ঠাণ্ডা হতে দুই ঘণ্টা সময় দিতে হবে।
- দেশীয় জাতের চাল ব্যবহার করতে হবে। সাদা চালের পরিবর্তে বাদামি বা লাল চাল ব্যবহার করতে পারেন। এতে বিভিন্ন পুষ্টিগুণ পাবেন। চালের প্রকারভেদের ওপর পুষ্টিগুণ নির্ভর করবে। ৮ থেকে ১২ ঘন্টা সময় ধরে ঠাণ্ডা জায়গায় রাখতে হবে।
- ভাত অবশ্যই ধীর আঁচে রান্না করতে হবে। কারণ এতে পুষ্টিগুণ সর্বাধিক থাকবে। ভালো ফারমেন্টইশনের জন্য পাত্রের কোণায় বা ওপারে বুদবুদ ওঠা লক্ষণীয় যা সাধারণত সারারাত ফারমেন্টেইশনের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
- পান্তাভাত পুনরায় গরম করবেন না। কারণ এতে থাকা উপকারী ব্যাক্টেরিয়া মরে যায়।
- পান্তার সাথে লেবুর রস খেতে পারেন। এতে রুচি বাড়াতে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে।
সতর্কতা
- যাদের জ্বর, সর্দি আছে তারা পান্তাভাত খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- যাদের ওজন বেশি তাদের পান্তাভাত না খাওয়াই ভালো।
- পান্তাভাত খেলে ঘুম ঘুমভাব আসে। এটি মূলত অ্যালকোহলিক কম্পাউন্ডের জন্য। তাই অতিরিক্ত পরিমাণে খাবেন না।
- পান্তাভাতের সাথে অনেকেই শুকনো মরিচ খান। এর পরিবর্তে কাঁচা মরিচ দিয়ে খান।
- অনেকেই পান্তাভাতের সাথে শুধু আলুভর্তা খান, যা স্বাস্থ্যকর নয়। শুধু আলুভর্তা না খেয়ে শুটকি, ডাল কিংবা বেগুন ভর্তা দিয়ে খেতে পারেন।
- পান্তা তৈরি করতে পরিষ্কার পাত্র ও পরিষ্কার পানি ব্যবহার করুন। না করলে ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া তৈরি হতে পারে।
 |
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেল্থ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর। |
আরও পড়ুন
দেশি খাবারের মুখরোচক রেসিপি