প্রদাহরোধী খাবার কমাতে পারে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি
দিনের পর দিন কী ধরনের খাবার বেশি খাওয়া হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে স্মৃতি একটু ধীর হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা অনেকের জীবনেই ঘটে।
নাম মনে করতে সময় লাগা, পরিচিত কোনও শব্দ হঠাৎ মনে না পাড়া বা কয়েক মিনিট আগের কথাই ভুলে যাওয়া— এ ধরনের ছোটখাটো পরিবর্তন অনেক সময় স্বাভাবিক বয়সজনিত ব্যাপার বলেই মনে করা হয়।
তবে মস্তিষ্কের সুস্থতা শুধু বয়সের ওপর নির্ভর করে না। প্রতিদিনের খাবার, শরীরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, রক্তনালির স্বাস্থ্য, ঘুম ও শারীরিক সক্রিয়তার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় খাবারের ধরন ও স্মৃতি শক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে যোগসূত্রের ধারণা পাওয়া গেছে।
শরীরে প্রদাহ কমাতে পারে এমন খাবার বেশি খেলে আলঝেইমার’স রোগের ঝুঁকি বেশি থাকা মানুষের মধ্যেও স্মৃতি শক্তি কমার ঝুঁকি ধীর হতে পারে।
গবেষণায় যা দেখা গেছে
সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থিত, ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এইজিং রিসার্চ সেন্টার’-এর করা গবেষণাটি প্রকাশিত হয় চিকিৎসা-বিষয়ক সাময়িকী ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’-এ। এতে সুইডেনের ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি এক হাজার ৮শ’ জনের বেশি মানুষকে নিয়ে গবেষণা করা হয়।
সিএনএন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই বিষয়ে জানানো হয় যে, গবেষণা শুরুর সময় অংশগ্রহণকারীদের কারও স্মৃতি কমে যাওয়ায় লক্ষণ ছিল না। ছয় বছর ধরে তাদের খাবারের ধরন সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হয়। পাশাপাশি আলঝেইমার’স রোগ এবং মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি রক্তচিহ্নও পরিমাপ করা হয়।
এরপর অংশগ্রহণকারীদের সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই সময়ের মধ্যে ২৪০ জনের স্মৃতি কমে যাওয়া সনাক্ত হয়।
গবেষকেরা দেখতে পান, যাদের খাবারে প্রদাহ তৈরির প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল, তাদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে স্মৃতি কমে যাওয়ার ঝুঁকিও কম ছিল।
বিশেষভাবে আলঝেইমার’স রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘পি-টাউ ২১৭’ নামের রক্তের একটি উপাদান যাদের বেশি ছিল, তাদের মধ্যে প্রদাহ কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত খাবার বেশি খাওয়ার সঙ্গে স্মৃতি কমার ঝুঁকি ২৯ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া যায়।
স্নায়ুকোষের ক্ষতি ও প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও দুটি রক্ত উপাদানের ক্ষেত্রেও এমনটাই দেখা গেছে।
প্রদাহ কমানোর খাবার বলতে যা বোঝায়
‘প্রদাহ কমানোর খাদ্য’ নির্দিষ্ট কোনো একটি খাদ্যতালিকা নয়। বরং এমন একটি সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসকে বোঝানো হয়, যা শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের মাত্রা কম থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ শুধু একটি বিশেষ খাবার খেলেই এর সুফল পাওয়া যাবে—বিষয়টি এমন নয়। বরং দিনের পর দিন কী ধরনের খাবার বেশি খাওয়া হচ্ছে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় যাদের খাবারে প্রদাহ তৈরির প্রবণতা কম ছিল, তারা তুলনামূলক বেশি শাকসবজি, ফল, বাদাম, ডালজাতীয় খাবার এবং সম্পূর্ণ শস্য খেতেন।
অন্যদিকে মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং লাল মাংসের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক কম।
অর্থাৎ খাবারের তালিকায় একেবারে নতুন কোনও উপাদান যোগ করার চেয়ে প্রতিদিনের খাবারে পরিবর্তন আনাটাই এখানে মূল বিষয়।
ফলের বদলে অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার না খাওয়া, নাস্তায় অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে বাদাম বা ফল বেছে নেওয়া বা মিষ্টি পানীয়ের বদলে পানি পান করা, এই ধরনের ছোট ছোট পরিবর্তন দীর্ঘ সময়ে পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
শরীরের প্রদাহ মস্তিষ্কে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে
প্রদাহ শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অংশ। সংক্রমণ বা আঘাতের সময় শরীরকে সুস্থ করে তুলতে প্রদাহ প্রয়োজন হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে অল্প মাত্রার প্রদাহ চলতে থাকলে, বিভিন্ন বয়সজনিত রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
সিএনএন–এর সুস্থতা-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. লিয়ানা ওয়েন প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন, “দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে, স্নায়ুকোষে আঘাত করতে পারে এবং মস্তিষ্কের ভেতরের প্রতিরোধী কোষগুলোকে সক্রিয় করতে পারে। এসব পরিবর্তন মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।”
তবে স্মৃতি কমে যাওয়ায় পেছনে শুধু প্রদাহই দায়ী নয়। বংশগত বৈশিষ্ট্য, রক্তনালির বিভিন্ন রোগ, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ পানের মতো আরও অনেক বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে।
ঝুঁকি থাকলেও খাবারে পরিবর্তন আনা যায়
পরিবারে আলঝেইমার’স রোগের ইতিহাস থাকলে অনেকেই ধরে নেন যে ভবিষ্যতে তাদেরও একই সমস্যা হবে।
তবে ডা. লিয়ানা, গবেষণার ফলাফলকে অতিরিক্তভাবে ব্যাখ্যা না করার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ এটি ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা।
গবেষকেরা মানুষ কী খাচ্ছেন এবং পরবর্তী সময়ে তাদের কী হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করেছেন; কাউকে নির্দিষ্ট খাবার খেতে বাধ্য করে অন্য দলের সঙ্গে তুলনা করেননি।
তাই এই গবেষণা সরাসরি প্রমাণ করতে পারে না যে, প্রদাহ কমানোর খাদ্যাভ্যাসই স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া প্রতিরোধ করেছে।
এছাড়া অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের খাবারের তথ্য সব সময় ঠিকভাবে মনে রাখতে নাও পারেন এবং গবেষণাটি সুইডেনের বয়স্ক মানুষের ওপর করা হয়েছে।
তাই অন্য দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও বংশগত বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়ায় একই ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে কি-না, তাও নিশ্চিত নয়।
খাবারের বাইরেও আছে কিছু জরুরি অভ্যাস
মস্তিষ্ক ভালো রাখতে শুধু খাবারের দিকে তাকালেই হবে না। নিয়মিত শরীরচর্চা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রক্তচাপ, রক্তে চর্বি ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি, কারণ সুস্থ রক্তনালি মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ধূমপান এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত মদ পান না করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাসও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
শুধু শারীরিক যত্ন নয়, সামাজিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, সামাজিক কাজে অংশ নেওয়া, কাজ করা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকা, নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া বা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার মাধ্যমেও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা যায়।
