Published : 20 May 2026, 04:52 PM
বর্তমান সময়ে একসঙ্গে অনেক কাজ করতে পারাকে দক্ষতার পরিচয় বলে মনে করা হয়।
হাঁটতে হাঁটতে বার্তার উত্তর দেওয়া, কাজের ফাঁকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখা, টেলিভিশন দেখতে দেখতে ই–মেইল পাঠানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় পরের দিনের পরিকল্পনা করা— এসব যেন স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
অর্থাৎ একসঙ্গে অনেক কিছু সামলাতে পারলেই তিনি সফল ও উৎপাদনশীল ধরে নেওয়া হয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য- বাস্তবে এই অভ্যাস মনোযোগ, মানসিক শান্তি ও কর্মক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মানুষের মস্তিষ্ক আসলে একসঙ্গে অনেক কাজ করার জন্য তৈরি নয়।
ব্যস্ততা সবসময় উৎপাদনশীলতা নয়
অনেক সময় মনে হয় একই সময়ে অনেক কাজ করা মানে সময় বাঁচানো। তবে এর ফলে কাজের মান কমে যায় এবং মানসিক ক্লান্তিও বাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থেরাপিস্ট’ ‘পাশ কো.’র প্রতিষ্ঠাতা এরিন পাশ রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “যখন এক কাজ থেকে আরেক কাজে দ্রুত যাওয়া হয়, তখন মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে এক ধরনের উদ্দীপনা অনুভব করে। এতে মনে হয় যেন অনেক কাজ হচ্ছে। তবে দিনের শেষে দেখা যায়, অনেক কিছু শুরু হলেও খুব কম কাজই সম্পূর্ণ হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “মস্তিষ্ক আসলে একই সময়ে দুটি কাজ পুরো মনোযোগ দিয়ে করতে পারে না। বরং খুব দ্রুত এক কাজ থেকে আরেক কাজে সরে যায়। আর প্রতিবার মনোযোগ বদলানোর সময় মস্তিষ্ককে নতুন করে মনোযোগ তৈরি করতে হয়।”
মনোযোগ বদলানোর অদৃশ্য ক্লান্তি
সুখ ও অভ্যাস নিয়ে কাজ করা মার্কিন লেখক গ্রেচেন রুবিন এই প্রক্রিয়াকে ‘সুইচিং কস্ট’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
তার মতে, “প্রতিবার মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর সময় মস্তিষ্ককে নতুনভাবে পরিস্থিতি বুঝতে হয়। এতে অতিরিক্ত মানসিক শক্তি ব্যয় হয়।”
একসময় ক্লান্ত, বিরক্ত ও অমনোযোগী হয়ে পড়া স্বাভাবিক। আর সেটা বোঝা যায় না যে, এর পেছনে ছোট ছোট অসংখ্য মনোযোগ পরিবর্তনই দায়ী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অভ্যাস চলতে থাকলে মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যায়। এমনকি অবসর বা বিশ্রামের সময়ও মস্তিষ্ক পুরোপুরি শান্তও হতে পারে না।
সবসময় ব্যস্ত থাকার সংস্কৃতি
এই বিশেষজ্ঞদের মতে, সবসময় ব্যস্ত থাকাকে অনেক সময় সফলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
এরিন পাশ মন্তব্য কনে, “ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় ব্যস্ত থাকা মানেই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া। ফলে অনেকেই ধীরে চলা বা বিরতি নেওয়াকে অলসতা মনে করেন।”
তবে অতিরিক্ত ব্যস্ততা অনেক সময় নিজের জীবন থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কাজের তালিকা পূরণ করতে গিয়ে মুহূর্ত উপভোগ করার ক্ষমতা হারিয়ে যায়।
একসঙ্গে অনেক কাজ বন্ধ করার অভিজ্ঞতা
এক সপ্তাহের জন্য একসঙ্গে অনেক কাজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে প্রথমে অস্বস্তি অনুভব হতেও পারে।
মোবাইল ফোন না দেখে শুধু একটি কাজ করা বা টেলিভিশন দেখতে দেখতে অন্য কিছু না করা অস্বাভাবিক মনে হয়। এমনকি প্রথম দিকে ধীরগতির জীবন উদ্বিগ্নও করে তুলতে পারে।
তবে এই অনুভূতি স্বাভাবিক। কারণ দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্ককে দ্রুত উদ্দীপনা ও ব্যস্ততার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ছোট ছোট পরিবর্তন বড় প্রভাব ফেলে
প্রথমে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি কাজেই মনোযোগ দিতে হবে। সেই সময়ে ফোন দূরে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ট্যাব বন্ধ করা এবং অন্য কোনো কাজ না করার চেষ্টা করা জরুরি।
ধীরে ধীরে মনোযোগ ধরে রাখা আগের তুলনায় সহজ হবে।
এছাড়া কাজের বৈঠকের সময়ও শুধু বৈঠকেই মনোযোগ দিতে শুরু করতে হবে। আগে যেখানে একই সঙ্গে বার্তা দেখা বা অন্য কাজ করার অভ্যাস ছিল, এখন সেটি বন্ধ করা সহায়ক হবে।
সকালের বিশৃঙ্খলা কমানোর গুরুত্ব
দিনের শুরুতেই অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ মানুষের মানসিক ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়।
তাই এই বিশেষজ্ঞরা, সকালের প্রস্তুতি আগের রাতে গুছিয়ে রাখার পরামর্শ দেন। যেমন- পোশাক প্রস্তুত রাখা, ব্যাগ গুছিয়ে রাখা বা দুপুরের খাবারের পরিকল্পনা আগে করে রাখা।
এতে দিনের শুরুতে মানসিক চাপ কমে এবং মস্তিষ্কও তুলনামূলক শান্ত থাকে।
মনোযোগ ফিরলে জীবনের আনন্দও বাড়ে
একসঙ্গে অনেক কাজ না করলে শুধু উৎপাদনশীলতাই বাড়ে না, মানসিক শান্তিও ফিরে আসে।
বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় আগের তুলনায় বেশি উপস্থিত থাকা, টেলিভিশন দেখা, রান্না করা কিংবা হাঁটার মতো সাধারণ কাজও বেশি উপভোগ্য লাগা শুরু হয়।
এরিন পাশা’র মতে, “মনোযোগ যখন সবসময় বিভক্ত থাকে, তখন বাস্তব মুহূর্তের সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত থাকা যায় না।”
ফাঁকা সময়ও প্রয়োজন
এরিন পাশ মনে করেন, জীবনে কিছু ফাঁকা সময় থাকা জরুরি। কারণ পুরো সময়সূচি ভরে ফেললে মানসিক চাপ আরও বাড়ে।
তিনি বলেন, “মস্তিষ্কেরও বিশ্রাম প্রয়োজন। প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করলে সেই সুযোগ আর থাকে না।”
আরও পড়ুন
নির্দিষ্ট সময়সীমার কাছাকাছি আসলেই কেন বাড়ে কাজের গতি?