Published : 10 May 2026, 07:42 PM
মা দিবসে গুলশানে ব্র্যাক ব্যাংক ‘তারা’ ও ‘ক্রাউন প্লাজা’র যৌথ আয়োজনে দিনভর চলল উদ্যোক্তা মায়েদের উদযাপন, আলোচনা আর সম্মাননার উৎসব।
মা দিবস এলেই চেনা দৃশ্য— ফুলের তোড়া, কেকের বাক্স, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মায়ের ছবি দিয়ে আবেগী ক্যাপশন।
তবে এবার ১০ মে রাজধানীর গুলশানে একটু অন্যরকম সকাল হল। ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানের ২৫ তলার বলরুমে তখন লোকে লোকারণ্য। সারি সারি স্টলে সাজানো হাতে বোনা কাপড়, বুটিক পোশাক, ঘরে বানানো আচার, স্বাস্থ্যসচেতনতার নানান পণ্য।
আর সেসব স্টলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন মায়েরা— উদ্যোক্তা হিসেবে, নেতা হিসেবে, নিজের পরিচয়ে। এটাই ছিল 'দ্য মাদারহুড মুভমেন্ট'-এর চেহারা।

শুধু ফুল নয়, এবার স্বীকৃতি
বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষ্যে এই আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল 'হোয়্যার মাদার্স বিকাম আইকনস।
প্রচলিত মা দিবসের চেনা ছকের বাইরে গিয়ে এই আয়োজন মাকে শুধু ভালোবাসা জানায়নি। তার নেতৃত্বকে, উদ্যমকে, প্রতিদিনের অদৃশ্য লড়াইকে সামনে এনেছে।
সর্বসাধারণের জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত এই অনুষ্ঠান চলেবে আজ রাত পর্যন্ত।
ব্র্যাক ব্যাংকের ‘উইমেন ব্যাংকিং’ বিভাগের প্রধান মেহরুবা রেজা বললেন, “মা সারা বছর কষ্ট করেন, কিন্তু সেই কষ্টের স্বীকৃতি মেলে না। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা মায়েদের সেই স্বীকৃতি দিতে চাই।”
বলরুমে জমে উঠল মায়েদের বাজার
সকাল ১০টায় শুরু হয় 'মাদার্স মার্কেট'। প্রায় ৩০ জন নারী উদ্যোক্তার স্টল। প্রতিটি স্টলের পেছনে একটাই পরিচয়— এই মায়েরা নিজেরাই উদ্যোক্তা, নিজেরাই স্বপ্নের কারিগর।
মেলায় অংশ নেওয়া 'গেট সেট ট্রেন্ড'-এর প্রতিষ্ঠাতা বিভা জারিদ বদরু বললেন, “এ ধরনের একটি আয়োজনে অংশ নিতে পেরে তিনি সত্যিই আনন্দিত। সংসার সামলে ব্যবসা গড়া এই মায়েরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে একটি স্বপ্ন বুনছেন।”

বিভা জারিদ বদরু আরও বললেন ‘‘ব্র্যাক ব্যাংক এই মায়েদের জন্য একটা পুরো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিচ্ছে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ কোর্স করার সুযোগ পাচ্ছেন এই মায়েরা, যার বাজারমূল্য একচল্লিশ হাজার টাকা। বাকি ছত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে দিচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক নিজেই। শুধু তাই নয়, কোর্স শেষ হলে বছরের বিভিন্ন সময়ে মেলায় পণ্য প্রদর্শনের সুযোগও করে দেওয়া হয়।”
দর্শনার্থীরা দিনভর কেনাকাটার ফাঁকে এসব উদ্যোক্তা মায়েদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাদের গল্প শুনছেন। বলরুমের সেই পরিবেশটা শুধু কেনাবেচার ছিল না— সেটা ছিল একটা অনুপ্রেরণার উঠান। তবে এখানে শুধু পণ্য বিক্রির গল্প নেই।
মঞ্চে উঠল সেই কঠিন প্রশ্নগুলো
বিকেল সাড়ে তিনটায় ২৬ তলার 'দ্য বিস্ট' হলে শুরু হল দিনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত পর্ব— 'প্যাশন, পাওয়ার অ্যান্ড পসিবিলিটি' শীর্ষক লিডারশিপ সেশন।
এক ঘণ্টার এই প্যানেল আলোচনায় একসঙ্গে বসলেন সফল পেশাজীবী আর অনুপ্রেরণাদায়ী মায়েরা। কথা হল ব্যবসা আর মাতৃত্বের ভারসাম্য নিয়ে, নেতৃত্ব আর নিজের পরিচয় ধরে রাখা নিয়ে, আধুনিক মা হওয়ার কাঠামোগত ও মানসিক চাপ নিয়ে।
আলোচনাটা একেবারে খোলামেলা ছিল। কেউ লুকিয়ে রাখেননি যে মা হওয়ার পর ক্যারিয়ার সামলানো কতটা কঠিন। কেউ বললেন কীভাবে সংসারের মাঝেও নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। শ্রোতারা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। অনেকের চোখ ছলছল করল।
কারণ এই কথাগুলো তাঁদের নিজেদেরও কথা।
সেশন শেষে 'তারা' কার্ডহোল্ডাররা হাই-টির বিশেষ আয়োজনে অংশ নিলেন।

পুরস্কার হাতে নিয়ে কেঁদে ফেললেন কেউ কেউ
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় 'দ্য বিস্ট' হলে শুরু হয় দিনের সবচেয়ে আবেগঘন পর্ব — 'ইন্সপায়ারিং মাদার্স অ্যাওয়ার্ডস'।
'মম্-প্রেনর', 'মোস্ট ক্রিয়েটিভ মাদার' এবং 'ইনস্পায়ারিং মাদার'সহ একাধিক বিভাগে সম্মাননা পেলেন সেইসব মায়েরা, যারা অধ্যবসায়, সৃজনশীলতা আর নেতৃত্বে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন। পুরস্কার হাতে নেওয়ার সময় কেউ কেউ কাঁদলেন।
হয়তো এই স্বীকৃতির জন্য তারা অনেক দিন ধরেই অপেক্ষা করছিলেন। হয়তো এই প্রথম কেউ সরাসরি বলল — ‘তুমি যা করছ, সেটা দেখা যাচ্ছে।’
পুরস্কার প্রদান শেষে আধা ঘণ্টার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, তারপর নৈশভোজ। দিনটা শেষ হল উৎসবের আলোয়।

'তারা' যে পথে হাঁটছে
ব্র্যাক ব্যাংকের 'তারা' উদ্যোগটি মূলত নারীদের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল।
মেহরুবা রেজা বলেন, “তারা’ এখন আর শুধু আর্থিক সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নারীদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই এখন তাদের বড় লক্ষ্য।
'দ্য মাদারহুড মুভমেন্ট' সেই লক্ষ্যেরই একটি বাস্তব প্রতিফলন। এই আয়োজনকে তারা দেখছে একটি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা হিসেবে — যেখানে মায়েদের নেতৃত্ব আর উদ্যম স্বীকৃতি পাবে শুধু মা দিবসে নয়, সারা বছর জুড়ে।