Published : 10 May 2026, 06:03 PM
ফ্যাশন এখন আর শুধু পোশাকের নকশা, রং কিংবা ট্রেন্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বজুড়েই গুরুত্ব পাচ্ছে ‘স্লো ফ্যাশন’, সচেতন ভোগ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রা।
দেশীয় ফ্যাশন দুনিয়াতেও এই আলোচনাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে ফ্যাশন ব্র্যান্ড আড়ং।
যার অংশ হিসেবে আড়ংয়ের ‘ব্রিং ইয়োর ওউন ব্যাগ (বিওয়াইওবি)’ ক্যাম্পেইনের প্রভাব, পরিবেশগত অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে ১০ মে ঢাকার ব্র্যাক সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি।
পেপার ব্যাগ থেকে শুরু, লক্ষ্য আরও বড়
পৃথিবীর বহু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মতোই আড়ংও অপ্রয়োজনীয় শপিং ব্যাগ ব্যবহার কমাতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ‘পেপার’ বা কাগজের ব্যাগের জন্য নিদিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করে। অর্থাৎ ক্রেতারা আগে কেনাকাটায় যে ব্য্যাগ বিনামূল্যে পেত সেটা নির্দিষ্ট টাকায় কিনতে হবে।
তবে শুধু ব্যাগের দাম নেওয়াই ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান উদ্দেশ্য নয় বরং যারা নিজেদের ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, তাদের দেওয়া হয়েছে ১৫ টাকা ক্যাশব্যাক।
এই উদ্যোগের উদ্দেশ্যই ছিল একটি নতুন অভ্যাস তৈরি করা, যেখানে ক্রেতাদের সচেতনভাবে পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হবে।
সংবাদ সম্মলনে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেস’য়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা হাসান আবেদ বলেন, “এই উদ্যোগ কেবল পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপেই আটকে নেই, বরং প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে টেকসই জীবনযাত্রাকে জনপ্রিয় করার প্রচেষ্টা।”
সাত মাসে বদলে যাওয়া চিত্র
সংবাদ সম্মেলনে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সাত মাসে ক্যাম্পেইনটির প্রভাব তুলে ধরা হয়।
যেখানে দেখানো হয়েছে আগের বছর একই সময়ে যেখানে বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছিল প্রায় ৬৯ লাখ ৯২ হাজারের বেশি কাগজের ব্যাগ, সেখানে ব্যাগের মূল্য নির্ধারণের পর ক্রেতারা কিনেছেন প্রায় ২৩ লাখ ১২ হাজার ব্যাগ।
অর্থাৎ সাত মাসে প্রায় ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার পেপার ব্যাগের ব্যবহার কমেছে।
আড়ংয়ের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ পেপার ব্যাগ সাশ্রয় প্রায় ৬ হাজার গাছ রক্ষার সমতুল্য। একই সময়ে কাগজের ব্যাগ বিক্রি থেকে সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ টাকার বেশি।
প্রতিষ্ঠানটির তরফ থেকে জানানো হয়, এই অর্থের শতভাগই পরিবেশ ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমেই ব্যয় করা হবে।
স্লো ফ্যাশনের দর্শন
আড়ংয়ের এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘স্লো ফ্যাশন’ ধারণা। দ্রুত বদলে যাওয়া ‘ফাস্ট ফ্যাশন’য়ের বিপরীতে ‘স্লো ফ্যাশন’ মানেই দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার, সচেতন কেনাকাটা, অপচয় কমানো এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে অনেক আগে থেকে টেকসই উপকরণ, দায়িত্বশীল উৎপাদন ও সচেতন জীবনযাত্রার চর্চাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
অর্থাৎ একটি ব্যাগের ব্যবহার কমানো এখানে প্রতীকী; মূল বার্তাই হল ‘যতটা প্রয়োজন, ততটাই ব্যবহার।’
তিনটি বড় পরিবেশ উদ্যোগ
সংবাদ সম্মেলনে আড়ং ভবিষ্যতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত উদ্যোগের কথাও ঘোষণা করে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ব্র্যাকের-এর ‘আলট্রা পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামে’র ৪০ হাজার অংশগ্রহণকারীর মধ্যে আড়ং বিতরণ করবে ৮০ হাজার গাছের চারা। এর মধ্যে থাকবে ফলজ ও কাঠগাছ।
নারী ও প্রতিবন্ধী অংশগ্রহণকারীদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে সংবাদ সম্মলনে জানানো হয়।
দ্বিতীয় উদ্যোগে থাকবে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে। দীর্ঘদিন ধরে খরা, কমে যাওয়া মাটির উর্বরতা ও পানিসংকটে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠা এই অঞ্চলে ‘হ্যাবিট্যাট কো-ক্রিয়েশন’ প্রকল্পের আওতায় ৫০ হাজার গাছ রোপণ এবং পানি সংরক্ষণ সহায়ক কার্যক্রমও চলবে।
খাদ্য বন বা ‘ফুড ফরেস্ট’ গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য।
তৃতীয় উদ্যোগ হিসেবে বলা হয়েছে ‘মিয়াওয়াকি’ বনের কথা। ‘মিশন গ্রিন বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে যৌথভাবে ঢাকা বিভাগের ডেমরা ও রূপগঞ্জে গড়ে তোলা হবে দুটি ‘মিয়াওয়াকি’ বন। প্রতিটি বনে থাকবে ১০ হাজার করে মোট ২০ হাজার গাছ।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
আড়ংয়ের এই উদ্যোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনাও হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অনেক গ্রাহক সচেতন ভোগ ও অপচয় কমানোর এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন।
তবে সমালোচনা ও বিতর্কের কথা তুলে ধরেও আড়ং সংবাদ সম্মেলনে জানায়, কিছু ক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মীদের হয়রানি, হুমকি দেওয়া এবং অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারনের ঘটনাও ঘটেছে।
আড়ংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “অধিকাংশ গ্রাহক টেকসই জীবনযাত্রা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের সঙ্গে একমত হয়েছেন এবং পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।”
এছাড়া অগ্রহণযোগ্য ঘটনার জন্য ভবিষ্যতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেন তিনি।