Published : 18 Jun 2026, 07:33 PM
ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় চারপাশের চিত্র। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, রাস্তার মোড়, দোকানের সামনে কিংবা গলির মাথায় উড়তে দেখা যায় প্রিয় দলের পতাকা।
আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা অন্য দলের সমর্থকেরা আবেগ প্রকাশ করেন নানান আকারের পতাকায়।
তবে পতাকার উচ্ছ্বাসের আড়ালে জরুরি কিছু নিরাপত্তার বিষয়ে বেখায়াল হওয়া যাবে না। কারণ প্রতি বিশ্বকাপ মৌসুমেই পতাকা টাঙাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির খবর সামনে আসে।
বিদ্যুতের তারের কাছে ওঠা, উঁচু ভবনের কিনারায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে দাঁড়ানো কিংবা চলন্ত যানবাহনের ওপর পতাকা লাগানোকে ভক্তের ভালোবাসা বলা হলেও— এতে ঘটতে পারে বড় বিপদ।
তাই বিশ্বকাপের আনন্দ উপভোগ ও উন্মাদনার আগে প্রাধান্য দিতে হবে নিরাপত্তাকে।
পতাকা টাঙানোর আগে জায়গা নির্বাচন জরুরি
অনেকেই এমন জায়গায় পতাকা লাগান, যা দূর থেকে সহজে দেখা যায়। তবে শুধু দৃশ্যমানতা নয়, সব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যুতের খুঁটি, বৈদ্যুতিক তার বা ট্রান্সফরমারের আশপাশে পতাকা টাঙানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বাতাসে পতাকা উড়ে গিয়ে তারের সঙ্গে জড়িয়ে গেলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফায়ার প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন-এর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইনের অন্তত ১০ ফুটের মধ্যে কোনো ধাতব দণ্ড বা ভেজা বাঁশ নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ, বিদ্যুৎবাহী তার সরাসরি স্পর্শ না করলেও বাতাসে আয়নিত হয়ে ‘আর্ক ফ্ল্যাশ’-এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ দূর থেকেই মানুষকে টেনে নিতে পারে।
বিশেষ করে বৃষ্টি বা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ভেজা বাঁশ বা ভেজা পতাকা বিদ্যুত পরিবাহী হয়ে দাঁড়ায়, যা তাৎক্ষণিক হার্ট অ্যাটাক বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

ছাদে উঠলে বাড়তি সতর্কতা ও ‘টানেল ভিশন’
বড় পতাকা টাঙানোর জন্য অনেকেই ভবনের ছাদে ওঠেন। তবে ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে কাজ করা বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে বৃষ্টির পরে বা ভেজা অবস্থায় ছাদ পিচ্ছিল থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
পতাকা লাগানোর সময় একা না থেকে সঙ্গে কাউকে রাখা ভালো।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপদ কর্মপরিবেশ সংস্থা ‘ওশা’-এর একটি মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন গভীর আবেগ বা চরম উত্তেজনায় কোনো কাজ করে, তখন তার মস্তিষ্কে ‘টানেল ভিশন’ তৈরি হয়। এর ফলে ব্যক্তির সমস্ত মনোযোগ কেবল পতাকার দিকেই থাকে এবং সে অবচেতনভাবেই ছাদের বিপজ্জনক কিনারার কথা ভুলে যায়।
এই বিপদ এড়াতে যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অব অ্যাক্সিডেন্টস’ একটি আন্তর্জাতিক নিয়ম বা ‘বাডি সিস্টেম’ অনুসরণের পরামর্শ দেয়; যার অর্থ উচ্চতায় কাজ করার সময় সবসময় অন্তত একজন সহযোগী সঙ্গে রাখা জরুরি, যেন যেকোনো ভারসাম্যহীনতায় তাৎক্ষণিক সাহায্য পাওয়া যায়।

বড় পতাকা বা জার্সি মানেই ভালো নয়
অনেক সমর্থক অন্যদের চেয়ে বড় পতাকা টাঙিয়ে নিজেদের উচ্ছ্বাস দেখাতে চান। তবে অতিরিক্ত বড় পতাকা বাতাসে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
দুর্বল বাঁশ, খুঁটি বা কাঠামোর সঙ্গে বড় পতাকা লাগানো হলে সেটি ভেঙে পড়ে যেতে পারে। এতে নিচে থাকা মানুষ, যানবাহন কিংবা আশপাশের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
“পতাকার আকারের সঙ্গে কাঠামোর শক্তি ও স্থায়িত্বের বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি”, বলেন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসমিয়া জান্নাত।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ-এর পুরকৌশল বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসের গতিবেগ যখন সামান্য বাড়ে, তখন কাপড়ের পতাকার ওপর ‘উইন্ড লোড’ বা বাতাসের ধাক্কা দেওয়ার ক্ষমতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়।
একটি দুর্বল বা কাঁচা বাঁশ এই তীব্র টান সহ্য করতে পারে না। ফলে এটি ভেঙে নিচে থাকা পথচারী বা যানবাহনের ওপর পড়লে মারাত্মক জখম, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে।
তাই বড় পতাকার ক্ষেত্রে জিআই পাইপ বা মজবুত কাঠামো ব্যবহার করা উচিত।

রাস্তায় চলাচলে বাধা সৃষ্টি না করা
কখনও কখনও রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে বিশাল পতাকা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এতে উৎসবের আমেজ তৈরি হলেও পথচারী ও যানবাহনের জন্য সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। নিচু করে ঝোলানো পতাকা মোটরসাইকেল, রিকশা কিংবা বড় যানবাহনের চলাচলে বাধা দিতে পারে।
বাতাসে পতাকা ছিঁড়ে গিয়ে সড়কে পড়ে দুর্ঘটনার কারণও হতে পারে।
তাই উচ্ছ্বাস প্রকাশের সময় জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার কথাও মনে করিয়ে দেন রাইড শেয়ারিং অ্যাপের চালকেরা।
বৈশ্বিক রোড সেফটি প্রটোকল অনুযায়ী, সড়কের ওপর যেকোনো ঝুলন্ত বস্তু চালকদের ‘ভিজ্যুয়াল ডিসট্র্যাকশন’ বা দৃষ্টি বিভ্রান্তি তৈরি করে, যা হুট করে ব্রেক চাপার কারণে বড় ধরণের ‘চেইন-অ্যাকসিডেন্ট’ ঘটাতে পারে।

শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়ানো যাবে না
অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা দলবেঁধে পতাকা টাঙানোর কাজে অংশ নেয়। তবে উঁচু খুঁটি, গাছ বা ভবনে ওঠার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তাদের দিয়ে করানো উচিত নয়।
“অভিভাবকদের তত্ত্বাবধান ছাড়া এ ধরনের কাজে অংশ নিলে, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ে”, বলেন তাসমিয়া জান্নাত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর ‘চাইল্ড ইনজুরি প্রিভেনশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, শিশুদের মস্তিস্কে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ বা বিপদের গভীরতা পরিমাপ করার ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। ফলে তারা উচ্চতা বা বিদ্যুতের তারকে রোমাঞ্চকর মনে করে অবলীলায় ঝুঁকি নিয়ে ফেলে।
তাই অভিভাবকদের কড়া নজরদারি ছাড়া, শিশুদের কোনোভাবেই পতাকা ওড়ানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশ নিতে দেওয়া যাবে না।
আবহাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ও বজ্রপাতের ঝুঁকি
বর্ষাকালে ঝড়ো হাওয়া বা বৃষ্টির মধ্যে পতাকা লাগানো নিরাপদ নয়। প্রবল বাতাসে ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকি থাকে। এছাড়া বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় বা উঁচু স্থানে অবস্থান করাও বিপজ্জনক।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে, তবেই পতাকা টাঙানোর কাজ করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস-এর বজ্রপাত বিষয়ক নিরাপত্তা গবেষণায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘ঝড়-বৃষ্টির সময় ধাতব রড, জিআই পাইপ কিংবা ভেজা বাঁশ নিয়ে ভবনের ছাদে বা উঁচু জায়গায় অবস্থান করা এক ধরনের ‘বজ্রপাতকে আমন্ত্রণ জানানো’। কারণ, এই উঁচু ধাতব বা ভেজা বস্তুগুলো বজ্রপাতের বিদ্যুৎ মাটিতে যাওয়ার জন্য ‘শর্টেস্ট পাথ’ বা সবচেয়ে সহজ পথ হিসেবে কাজ করে।’
তাই ঝড়ো আবহাওয়ায় সব ধরনের উন্মাদনা বন্ধ রেখে, ঘরের ভেতর থাকাই একমাত্র নিরাপদ উপায়।

সমর্থন হোক সৌহার্দ্যের, সংঘাতের নয়
বিশ্বকাপে থাকা উচিত বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। পতাকা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে তর্ক বা বিরোধ খেলার অংশ নয়।
রাজধানীর ধানমন্ডি নিবাসী আর্জেন্টিনা ভক্ত সাবের আদনান ও ব্রাজিল ভক্ত ফাহিম মাহমুদ দুইজনই মন্তব্য করেন, নিজের দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে অন্যের অনুভূতিকে আঘাত না করাই ভালো। পতাকা ছেঁড়া, নামিয়ে ফেলা বা অপমান করার মতো আচরণ উৎসবের আনন্দ নষ্ট করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মারে স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী ডা. ড্যানিয়েল ওয়ান ‘আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’-এর এক সাময়িকীতে উল্লেখ করেছেন, “তীব্র দলীয় উন্মাদনা অনেক সময় মানুষের মনের ‘আউট-গ্রুপ হস্টিলিটি’ বা বিপক্ষ দলের প্রতি ঘৃণা জাগিয়ে তোলে।”
তার মতে, “স্পোর্টস ফ্যান’ হওয়া মানে সামাজিকভাবে আনন্দ উদযাপন করা, কোনো যুদ্ধ নয়। ‘সুস্থ ভক্ত সংস্কৃতি’ বজায় রাখতে হলে, নিজের দলের ওপরে যেমন সম্মান রাখতে হবে, ঠিক তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অনুভূতির প্রতিও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা জরুরি।”
বিশ্বকাপের আনন্দকে নিরাপদ রাখতে, ব্যক্তিগত সতর্কতাই বড় রক্ষাকবচ। নিজের আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে নিজের বা অন্য কোনো মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে না ফেলাই হোক এবারের বিশ্বকাপের মূল স্লোগান।
আরও পড়ুন