Published : 26 Jun 2026, 11:23 PM
ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি যে সংখ্যক শিশুদের হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছিল, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে তার চেয়ে বেশি লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
দুই কর্মসূচিত একই বয়সি শিশুর ব্যবধান প্রায় ৫৫ লাখ। কেন এত ব্যবধান?
এই ব্যবধান দেখে হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইনের ‘কাভারেজ’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
তারা বলছেন, এবার হামের টিকাদানের আগে তৃণমূল থেকে তথ্য সংগ্রহে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি, যে কারণে মাঠ পর্যায়ের পরিকল্পনা বা ‘মাইক্রোপ্ল্যান’ ঠিক হয়নি বলছেন তারা। এ ঘাটতির কারণে হামের টিকাদান কর্মসূচিতে ‘টার্গেট’ শিশু সংখ্যা কম এসেছে।
হামের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় সমালোচনার মধ্যে সরকার জরুরি ভিত্তিতে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বা পাঁচ বছর বয়সি টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর ১২ এপ্রিল শুরু হয় চার সিটি করপোরেশন এলাকায়।
২০ এপ্রিল সারা দেশে একই বয়সি শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার, যা শেষ হয় ২০ মে।
সর্বশেষ ২৬ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে দেখা যায় টিকার কাভারেজ হয়েছে ১০৩ শতাংশ। টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৬ হাজার ৩২৪ জন শিশু।
রোববার থেকে সারাদেশে শুরু হচ্ছে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচি। এই কর্মসূচিতেও ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বয়সি শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, আর ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে এই ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেছেন, সে দিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ‘টার্গেট’ সব শিশুকে একটি করে ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। ছয় থেকে ১১ মাস বয়সি শিশুদের নীল রঙের ক্যাপসুল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের লাল রঙের ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।
এত ব্যবধান যে কারণে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশে একই ধরনের ক্যাম্পেইনে শিশুদের সংখ্যা সমান হওয়ার কথা ছিল। সেখানে ৫৫ লাখের ব্যবধান দেখা দিয়েছে সরকারি হিসাবেই।
তাই বলা যায়, হামের টিকা ক্যাম্পেইনের টার্গেট সঠিক ছিল না, যে কারণে হামের সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বলছেন ওই বিশেষজ্ঞরা।
হাম ও ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে এই রোগের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে গেছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “টিকাদানের ক্ষেত্রে গ্যাভি মূলত পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুসরণ করে। আর সর্বশেষ পরিসংখ্যানে আমাদের শিশুদের সংখ্যা কিছুটা কম দেখানো হয়েছে। এই একটি কারণে টিকাদান এবং ক্যাপসুল খাওয়ানোর টার্গেট শিশু সংখ্যার বড় ব্যবধান দেখা দিতে পারে।”
দ্বিতীয়ত, ইপিআইয়ের টিকাদানের ক্ষেত্রে এবার খুব ভালোভাবে ‘মাইক্রোপ্ল্যান’ হয়নি সেটি আরেকটি কারণ হতে পারে, বলেন ড. মাহমুদুর রহমান।
তার মতে, সব শিশুকে হামের টিকা দিতে হবে। এটি ছাড়া হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

ভিটামিন ক্যাপসুল খাওয়ানোর বিষয়ে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনূস আলী বলেন, “আমরা দেশের সব সিভিল সার্জনের কাছে শিশুদের তথ্য চেয়েছিলাম, তাদের থেকে পাওয়া তথ্য একসঙ্গে করে আমরা ক্যাপসুল খাওয়ানোর শিশুদের সংখ্যা নির্ধারণ করেছি।”
টিকাদানের চেয়ে ক্যাপসুল খাওয়ানোতে শিশুদের সংখ্যার তারতম্য নিয়ে তিনি বলেন, “সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কেন্দ্র কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছে জানা নাই। আমরা আমাদের পদ্ধতিতে শিশুদের তালিকা করেছি।”
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, “আসলে এবার টার্গেট শিশু কম হয়েছে। তাই টিকার কাভারেজ সরকারিভাবে যা দেখানো হচ্ছে সেটি ঠিক নয়। ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর সংখ্যাই সঠিক।”
এ হিসাবে করলে টিকার কাভারেজ মাত্র ৭৬ দশমিক ৬৬ হয়েছে দাবি করেন ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, “‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনের ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ টিকার কাভারেজ প্রয়োজন, তা থেকে আমরা প্রায় ১৮ শতাংশ দূরে আছি। এ জন্য হামের সংক্রমণ কমছে না। দ্রুত শিশুদের টিকা দিতে হবে।”
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “এত বড় সংখ্যা ব্যবধানের একটি বিষয় হতে পারে যে আমাদের দেশের কিছু জায়গায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আওতায় আগেই হামের টিকা দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “টিকা কাভারেজে সংখ্যার ভুল হওয়ার কথা নয়। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা আমাদের টার্গেট শিশু সংখ্যা নির্ধারণে সাহায্য করে। তবে বিষয়টা নিয়ে আমরা আরেক বার মিলিয়ে দেখবো।”
টিকার কাভারেজ নিয়ে প্রশ্ন
সরকারি হিসাবে একশ’ শতাংশের বেশি হামের টিকার ‘কাভারেজের’ কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসেরও দাবি, টিকার ‘কাভারেজ’ খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
“যার ফলে বর্তমানে হামের সংক্রমণ, নিশ্চিত হাম রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। আর হাম একবারে কমে যাবে না। ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আশা করি, জুন মাসের শেষে একেবারে কমে যাবে।”

কিন্তু হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু থামছে না। বিশেষজ্ঞরা এসব মৃত্যুকেও হামে মৃত্যু হিসেবে দেখেছেন।
তাই ‘কাভারেজ’ সঠিক বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, টিকা পাওয়ার উপযুক্ত সব শিশু ‘টার্গেটের’ আওতায় নাও আসতে পারে। কারণ কোনো এলাকায় ৯৫ শতাংশ টিকা ‘কাভারেজ’ হলে সেখানে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারি যে টার্গেট শিশু তারা ‘কাভারেজের’ অংশ হয়েছে। সেখানে দেশের সব শিশু অন্তর্ভুক্ত নাও থাকতে পারে।
“সর্বশেষ ক্যাম্পেইনের আগে পর্যাপ্ত সময় পায়নি, তাই হয়তো ‘মাইক্রোপ্ল্যানে’ অনেক শিশু বাদ পড়েছে। কিন্তু মহামারী মোকাবিলায় সবাইকে টিকা দেওয়া জরুরি।”
সরকারি টিকার ‘কাভারেজে’ সমস্যা আছে বলছেন আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একটি এলাকায় টিকার কাভারেজ যদি ৯৫ শতাংশের বেশি হয়, তাহলে সেই এলাকায় হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”
সরকারের ১০০ শতাংশের বেশি ‘কাভারেজের’ দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, “টিকার কাভারেজ সরকার যা বলছে তা হয়তো সঠিক নয়। কারণ শতভাগ টিকা কাভারেজ হলে এত সময় পর অবশ্যই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসতো, যেটি হয়নি। এটি থেকে বোঝা যায়, টিকার ‘কাভারেজে’ সমস্যা আছে।”