Published : 26 Jul 2025, 03:59 PM
শিশু সারাদিন স্কুলে কী করলো, কার সঙ্গে খেললো, মনটা কেমন আছে, এইসব জানতে চাননি এমন বাবা-মা বা অভিভাবক খুব কমই আছেন।
তবে অনেক সময়ই শিশুদের মুখে শোনা যায় পরিচিত উত্তর- ভালো, মনে নেই, জানি না।
এরকম ভাসা ভাসা উত্তর শুনে হয়ক বিরক্ত বা হতাশ হয়ে ভাবেন আমি কি ভুল করছি?
শিশুরা অনেক সময় ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করতে চায় ঠিকই। তবে সেটি কীভাবে করতে হয়, সেটা জানে না বা প্রস্তুত থাকে না।
ঠিক তখনই দরকার পড়ে কিছু সহানুভূতিশীল, ধৈর্যশীল ও বিশ্বাস-নির্ভর উপায়ের, যাতে শিশু নিজের আবেগ ভাগ করে নিতে স্বচ্ছন্দবোধ করে।
‘কামডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন কিছু কৌশল সম্পর্কে বলেছেন মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ডা. ক্রিস মওসুনিক, যা অভিভাবক ও শিশুর মধ্যে আবেগগত নিরাপত্তা তৈরি করতে সহায়তা করবে।
এই উপায়গুলো অনুসরণ করলে ধীরে ধীরে সন্তান নিজের অনুভূতির কথা খোলামেলা বলতেও শিখবে।
কেন শিশু আবেগ প্রকাশে সংকোচ করে?
অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই নিজেদের আবেগ ঠিকঠাক প্রকাশ করতে পারেন না। সেখানে শিশুদের পক্ষে তো এটা আরও কঠিন।
বয়স, মানসিকতা, আগের কোনো অভিজ্ঞতা সব কিছুর ওপর নির্ভর করে তারা কতটা খোলামেলা হবে।
অনেক সময় তারা নিজেরাই বোঝে না কী অনুভব করছে। আবার কখনও ভাষার অভাবে আবেগের ব্যাখ্যা দিতে পারে না।
তাদের না বলার পেছনে আরও কিছু কারণ হতে পারে।
প্রতিক্রিয়ার ভয়: শিশুরা খুবই সংবেদনশীল। তারা বুঝে ফেলে আপনি রেগে যাচ্ছেন কি-না, বা আপনি দুঃখ পেয়ে যাচ্ছেন কি-না।
পূর্বের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা: কেঁদো না, তেমন কিছু হয়নি- এই কথাগুলো শিশুকে শেখায় তাদের অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ নয়।
নিজেকে বা আপনাকে রক্ষা করতে চায়: অনেকে কষ্টের কথা মনে করতে চায় না। কেউ আবার ভাবে আপনি কষ্ট পাবেন বলে কিছু বলেন না।
আবেগ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কথা বলতেও চায় না: শিশু প্রথমে শান্ত হতে চায়, তারপর কথা বলার চেষ্টা করে।
যা বলা উচিত নয়
শিশুর আবেগ বোঝা কঠিন হলেও কিছু কাজ বা কথা একেবারেই না করাই ভালো। কিছু আচরণগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।
চাপ সৃষ্টি করা: তুমি বলছো না কেন?, তোমার কী হয়েছে? এই প্রশ্নগুলো চাপ হিসেবে অনুভব করে তারা।
আবেগ ছোট করে দেখা: তেমন কিছু না, তুমি ঠিক আছো- এগুলো শিশুকে বোঝায়, তার অনুভূতি অপ্রয়োজনীয়।
সমাধান দিয়ে কথা শুরু করা: এটা করলেই ঠিক হয়ে যাবে— শিশুরা তখন অনুভব করে, আপনার শুধু সমাধান চাই, কথা নয়।
অভিযোগমূলক প্রশ্ন: তুমি আবার নাটক করছিলে?, তুমি কিছু ভুল করেছো?- এগুলো শিশুদের লজ্জা দেয়।
বাড়াবাড়ি প্রতিক্রিয়া দেখানো: শিশুরা যদি দেখে আবেগে আপনি ভেঙে পড়ছেন, তাহলে তারা ভবিষ্যতে কিছু বলবে না।
যেভাবে শিশুকে আবেগ প্রকাশে উৎসাহিত করবেন
সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানো
শিশু তখনই মনের কথা বলবে, যখন সে আপনাকে মানসিকভাবে কাছে পাবে। প্রতিদিন কিছু সময় শিশুর সঙ্গে খেলুন, গল্প করুন বা শুধু পাশে বসে থাকুন।
খোলা প্রশ্ন করা
স্কুল কেমন ছিল? এমন প্রশ্নের জায়গায় বলুন, আজকের সবচেয়ে মজার জায়গাটা কী ছিল? এককথায় উত্তর হয় এমন প্রশ্ন নয়, বরং চিন্তা-জাগানিয়া প্রশ্ন করতে হবে।
আবেগকে স্বীকৃতি দেওয়া
শিশু যা অনুভব করছে, তা বুঝুন বা না-ই বুঝুন, বলতে হবে- আমি দেখছি এটা তোমার খারাপ লেগেছে। আরও বলতে চাও? এতে সে নিরাপদ বোধ করবে।
ভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর নরম রাখা
যদি রুক্ষ হন বা বিরক্ত দেখান, শিশুরা চুপ করে যাবে। চোখে চোখ রেখে, নরম গলায় কথা বলতে হবে।
উপদেশ নয়, মনোযোগ দিন
শিশু কথা বলা শুরু করলেই উপদেশ দেওয়া যাবে না। বরং বলতে হবে- তুমি কি চাও আমি কিছু বলি, না শুধু শুনি?
পাশাপাশি থাকা মুহূর্ত তৈরি
অনেক শিশু চোখে চোখ রেখে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করে। হাঁটার সময়, গাড়িতে, পাজল খেলতে খেলতে কথোপকথনের চেষ্টা করতে হবে।
নিজের আবেগ ভাগ করা
যদি বলেন, আজ অফিসে একটা কাজ নিয়ে একটু ভয় লাগছিল। তবে শিশু শিখবে, আবেগ নিয়ে খোলামেলা কথা বলা যায়।
গল্প বা কার্টুনকে কাজে লাগান
গল্পে বা কার্টুনে কোনো চরিত্র কষ্ট পেলে বলুন- এই জায়গাটা দেখে মনে হল ওর খারাপ লাগছে। তুমিও কি কখনও এমন কিছু অনুভব করেছো?
সময় দিন
শিশু যদি বলে, আমি এখন বলতে চাই না তবে সেটা মেনে নিন। বলুন- ঠিক আছে। তুমি চাইলে আমি এখানে আছি।
সাহসের প্রশংসা
শিশু যখন কোনো কিছু প্রকাশ করবে তখন বলতে হবে- তুমি যে বিষয়টা আমাকে বলেছো, এটা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার। ধন্যবাদ। এতে ভবিষ্যতে বলতে উৎসাহ পাবে।
আচরণের আড়ালে লুকানো আবেগ খোঁজা
শিশু চুপচাপ, বিরক্ত বা বেশি জড়িয়ে থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারেন- তোমার মন খারাপ মনে হচ্ছে, কিছু হয়েছে? উত্তর না দিলেও সমস্যা নেই। কারণ আপনার মনোযোগটাই গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
অতিরিক্ত ‘স্ক্রিন টাইম’- হতে পারে শিশুদের খারাপ আচরণের কারণ