Published : 30 Jun 2025, 05:51 PM
আজকাল অনেক বাবা-মা অভিযোগ করেন, তাদের সন্তান কথা শোনে না, সামান্য কিছুতে রেগে গিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করে, বা একা একা বসে থাকে।
এমন সমস্যার পেছনে একটি নীরব কারণ হতে পারে শিশুদের অতিরিক্ত ‘স্ক্রিনটাইম’ বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা।
সম্প্রতি ‘আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’য়ের গবেষণা সাময়িকী ‘সাইকোলজিক্যাল বুলেটিন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে এসেছে। সিএনএন ডটকম-এ গবেষণাটি তুলে ধরা হয়।
এই গবেষণায় ১০ বছরের কম বয়সি শিশুদের ওপর পরিচালিত ১১৭টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, শিশুরা যত বেশি সময় পর্দার সামনে কাটায়, তাদের আচরণ এবং মানসিক অবস্থার মধ্যে বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিকতার ঘাটতি দেখা যায়।
বিশেষ করে মেয়েশিশুদের মধ্যে এই সমস্যা কিছুটা বেশি।
স্ক্রিনের দিকে তাকানো বাড়াচ্ছে উদ্বেগ ও আগ্রাসী আচরণ
অতিরিক্ত ‘স্ক্রিন টাইম’য়ের কারণে শিশুদের মধ্যে যেসব সমস্যা তৈরি করছে তার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অতিচঞ্চলতা, আক্রমণাত্মক ব্যবহার।
এসব আচরণ তাদের স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায়। শিশুদের বয়স অনুযায়ী দৈনিক ‘স্ক্রিন’ দেখার নির্দিষ্ট সীমা আছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দুই বছরের কম বয়সিদের জন্য ভিডিও কল ছাড়া অন্য কোনো ‘যান্ত্রিক পর্দা’ দেখা উচিত নয়। এছাড়া দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা।
আর এর বেশি বয়সি শিশুদের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা যথেষ্ট।
গবেষণায় দেখা গেছে- বিশেষ করে যারা বেশি ভিডিও গেইম খেলে, তাদের মধ্যে এই সমস্যাগুলো বেশি দেখা যায়।
ছয় থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে এসব মানসিক সমস্যা পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের তুলনায় বেশি দেখা যায়।
স্ক্রিনটাইম: সমস্যা না উপসর্গ?
ইমেইল বার্তায় গবেষণার প্রধান রোবের্তা পিরেস ভাসকনসেলোস- সিএনএন ডটকম’য়ের প্রতিবেদনে জানান, শুধু স্ক্রিনটাইম সমস্যা তৈরি করে না, বরং এটি অনেক সময় একটি উপসর্গও হতে পারে।
তার ভাষায়, “অনেক সময় শিশুরা যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে বা দুঃখবোধে ভোগে, তখন তারা ভিডিও গেইমস বা স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যেন সেখান থেকে একটু স্বস্তি পায়।”
তবে এই স্বস্তি সাময়িক। কারণ দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি চক্র তৈরি করে, যেখানে তারা আরও বেশি মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে।
কী করবেন বাবা-মা?
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, শিশুরা যখন বেশি স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন শুধুমাত্র ‘স্ক্রিন’কে দোষ না দিয়ে, তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে।
ভাসকনসেলোস বলছেন, “যদি দেখেন সন্তান রেগে গেলে বা মন খারাপ হলে স্ক্রিনে মনোযোগ দিচ্ছে, তাহলে বোঝার চেষ্টা করুন- তার কি মানসিক সংযোগের ঘাটতি হচ্ছে কি-না। সেটা হতে পারে— পরিবার, স্কুল বা বন্ধুদের মধ্যে?”
এই অবস্থায় বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের সঙ্গে কথা বলা; তাকে বোঝানো যে তারা কথা শোনা হচ্ছে, বোঝা হচ্ছে এবং সে নিরাপদ— অনলাইনে যেমন তেমনি অফলাইনে।
ভিডিও গেইমসের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি
গবেষণায় বলা হয়েছে, অনলাইন ভিডিও গেইমস আরও ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমে পরিণত হয়, যেখানে খেলোয়াড় অনুপস্থিত থাকলেও গেম চলতে থাকে।
ফলে শিশুরা মনে করে, তাদের সবসময় যুক্ত থাকতে হবে। যে কারণে ঘুম, পড়াশোনা, বাস্তব জীবনের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক— সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এই কারণে ভিডিও গেইমস নিয়ে বিশেষ সতর্কতা ও সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষ করে বড় শিশুরা যেহেতু স্বাধীনভাবে সময় ব্যবস্থাপনা করে, তাদের সঙ্গে আগে থেকেই ‘নিয়ম’ স্পষ্ট করে দিতে হবে।
নিয়ম থাকুক, কড়াকড়িও দরকার
ভাসকনসেলোস বলেন, “শিশুরা কখন কী পরিমাণ ‘স্ক্রিন’ ব্যবহার করতে পারবে সেটা আগে থেকেই জানানো উচিত। এতে তাদের জন্য সীমা মানা সহজ হয়।”
মোবাইল ও বিভিন্ন ডিভাইস বা যন্ত্রে থাকা ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ ব্যবস্থাগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। যাতে নির্দিষ্ট সময়সীমা, বয়স উপযোগী কনটেন্ট নির্ধারণ এবং প্রয়োজন হলে ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ অপসারণ করা যায়।
এছাড়া শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং শিক্ষামূলক ও গঠনমূলক কনটেন্ট বেছে নিতে হবে।
‘না’ বলা শিখতে হবে
অনেক বাবা-মা মনে করেন, বড় ছেলেমেয়েরা যে বয়সে ফোন পেয়েছে, ছোটদেরও একই বয়সে ফোন দিতে হবে— এটা ভুল ধারণা।
ভাসকনসেলোস বলেন, “আমি যখন নিজের সন্তানদের ‘না’ বলি তখন সব আচরণ শুভ হয় না। তবে তাদের অভিভাবক হিসেবে আমি জানি, কোনটা তাদের জন্য ভালো। তাছাড়া এই গবেষণাও আমাকে অবাক করেনি।”
গবেষণায় উঠে এসেছে- অভিভাবকরা প্রায়ই অভিযোগ করছেন যে, তারা সন্তানদের এই ‘স্ক্রিন’ দেখার বিষয়ে ‘না’ করতে পারেন না।
“তবে এখন আমরা ভালো করেই জানি কীভাবে স্ক্রিনের প্রভাব শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে পড়ে।”
“মনে রাখতে হবে, বাবা-মা হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থতা নিশ্চিত করা আপনারই দায়িত্ব। যদিও তা তাৎক্ষণিকভাবে কষ্টসাধ্য হতে পারে”- বলেন এই গবেষক।
আরও পড়ুন
মনোযোগ হারানোর কারণ কি ফোন! না কি আপনি নিজেই?
সন্তানের ফোনের ব্যবহার কমাবেন যেভাবে
সারাদিন স্ক্রিনে চোখ? ‘টেক নেক’ থেকে মুক্তির উপায়
অতিরিক্ত ‘স্ক্রিনিং টাইম’ থেকে ত্বকের ক্ষতি পুনরুদ্ধারের পন্থা