২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

ফোনে বেশি সময় কাটানোর প্রভাবে অভিভাবক-শিশুর সম্পর্কের ক্ষতি

শিশুর সঙ্গে সময় কাটানোর সময় হাতে ফোন না থাকলেও বাজে প্রভাব পড়তে পারে।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Jul 2025, 03:14 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:23 PM

শিশুর সঙ্গে সময় কাটানো মানেই শুধু পাশে বসে থাকা নয়। চোখ, মন ও মনোযোগও থাকতে হয় সেখানে।

অনেক বাবা-মা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে করতে সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো যথেষ্ট।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ফোন দেখা নয় বরং অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার অভ্যাস থাকলেও শিশুর সঙ্গে যোগাযোগে বিরূপ প্রভাব পড়ে।

গবেষণা বলছে ফোন হাতে না থাকলেও, এর প্রভাব পড়ে শিশুর ওপর।

ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ‘ডিজিটাল মিডিয়া অ্যান্ড ডেভেলপিং মাইন্ডস ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্টিফিক কংগ্রেস’-এ এমনই একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা, টাসকালুসা’র ডক্টরাল শিক্ষার্থী ও গবেষক লিজ রবিনসন।

সিএনএন ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষণাটির নানান তথ্য তুলে ধরা হয়।

সেখানে জানানো হয়েছে, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সি ৬৫ জন শিশুর সঙ্গে তাদের মায়েদের পারস্পরিক আচরণ বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা পরিচালিত হয়।

গবেষণার মূল তথ্য

লিজ রবিনসন জানান, যেসব মা দৈনিক গড়ে প্রায় ১৬৯ মিনিট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন, তারা খেলাধুলার সময় সন্তানদের সঙ্গে ২৯ শতাংশ কম কথা বলেন।

যখন তাদের হাতে কোনো ফোন ছিল না তখনই এই চিত্র দেখা গেছে। অন্যদিকে, যারা দিনে গড়ে মাত্র ২১ মিনিট সামাজিক মাধ্যমে থাকেন, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়ভাবে সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

শুধু ফোন দেখাই নয়, প্রভাব পড়ে অভ্যাসেও

এই গবেষণায় অন্য ‘স্ক্রিন’ ব্যবহারের (যেমন- আবহাওয়া দেখা, ইমেইল চেক করা ইত্যাদি) সঙ্গে কম কথা বলার কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বরং প্রধান সমস্যা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যম থেকে তৈরি হওয়া এক ধরনের মানসিক বিচ্ছিন্নতা।

লিজ রবিনসন বলেন, “মায়েরা যখন শারীরিকভাবে সন্তানদের পাশে থাকেন, তখনও দেখা যায় তাদের মনটা অন্যখানে। অতীতের কোনো পোস্ট, রিল বা তথ্য তাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।”

এই ব্যাখ্যার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেন ক্রিস পেরি। যিনি ‘চিলড্রেন অ্যান্ড স্ক্রিনস: ইন্সটিটিউট অব ডিজিটাল মিডিয়া অ্যান্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক।

সিএনএন ডটকম-কে তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্ট এমনভাবে তৈরি হয় যে তা ব্যবহারকারীর আগ্রহমাফিক সাজানো থাকে। এতে সেই অভিজ্ঞতা আনন্দদায়ক হয় এবং বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। ফলে তার প্রভাব লম্বা সময় ধরে মনের ওপর থেকে যায়।”

কেন এই মনোযোগের ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ?

পেরি বলেন, “ভাষা শিক্ষা শিশুদের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জন্ম থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুদের ভাষা গ্রহণ ও ব্যবহার করার অভ্যাস তৈরি হয় মূলত অভিভাবকদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমেই।”

ফলে শিশুর সঙ্গে কম কথা বললে তার মস্তিষ্কের বিকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ও সামাজিক দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রবিনসন যোগ করেন, “শিশুরা খুব সচেতনভাবে খেয়াল রাখে তাদের বাবা-মা কোথায় তাকাচ্ছেন। যদি বারবার ফোন বা অন্য কোনো ডিভাইসের দিকে তাকান, তাহলে শিশুর কাছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তার মানসিক গঠন সেই অনুযায়ী গড়ে ওঠে।”

করণীয় কী?

সন্তানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কথা বলা

শিশুর বয়স যতই হোক না কেন, তার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা অত্যন্ত জরুরি। গল্প, খেলা, প্রশ্নোত্তর সবকিছুতেই শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন।

শুধু তার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা

লিজ রবিনসন পরামর্শ দেন, “প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট সময় রাখুন যখন কেবল সন্তানের সঙ্গে থাকবেন। মোবাইল বা অন্য কোনো মনোযোগ বিভ্রান্তকারী কিছু থাকবে না। এই সামান্য সময়ও শিশুর কাছে অনেক বড় মানসিক প্রশান্তির কারণ হয়।”

নিজের মনোযোগ মূল্যায়ন করা

ক্রিস পেরি বলেন, “নিজের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের প্রভাব নিজের ওপর কেমন পড়ছে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আর সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় সেটি কতটা নিজেকে ব্যস্ত করে রাখছে, সেটা খেয়াল করা দরকার।”

সামাজিক মাধ্যমে সময় কমান

“যত কম সামাজিক মাধ্যমে থাকবেন, ততই সম্ভাবনা কমবে যে সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় আপনার মনোযোগ বিঘ্নিত হবে”- বলেন পেরি।

তাই সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কতবার ও কতক্ষণ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করবেন সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে। এটি নিজের ও সন্তানের জন্যই উপকারী।

পুরো পরিবারে সচেতনতা গড়ে তোলা

গবেষণায় মায়েদের নিয়েই কথা বলা হয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাবাদের ক্ষেত্রেও এটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে যেন সবাই শিশুদের সঙ্গে মানসিকভাবে উপস্থিত থাকেন, সেটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা

রবিনসন স্বীকার করেছেন, এই গবেষণা পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি, তাই এটি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণেই বাবা-মা কম কথা বলেন, না-কি কম সক্রিয় অভিভাবকরাই বেশি সামাজিক মাধ্যমে জড়িয়ে পড়েন।

এছাড়া অভিভাবকের মানসিক স্বাস্থ্য, আয় বা শিক্ষাগত যোগ্যতার মতো বিষয়গুলোও এতে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন

সন্তানের ফোনের ব্যবহার কমাবেন যেভাবে

সন্তানকে শেখাতে হবে ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার

যে কারণে সন্তানকেসরিবলা উচিত

সন্তান কি স্কুলে খারাপ সময় কাটাচ্ছে?