Published : 17 Jun 2026, 10:30 AM
দীর্ঘদিনের অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিতে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার প্রাণরেখা হিসেবে পরিচিত মেঘনা-ধনাগোদা বেড়িবাঁধ জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় শতাধিক গর্ত।
এতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্পের ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ এখন ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে।
সম্প্রতি ষাটনল থেকে আমিরাবাদ পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির পানির চাপে বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ১০ থেকে ১২টি স্থানে বড় ধরনের ছিদ্র এবং ৪০ থেকে ৫০টি স্থানে ছোট ছোট গর্তের অস্তিত্ব মিলেছে।
কোথাও মাটি ধসে সড়কের নিচে ফাঁপা অংশ তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও সড়কের একাংশ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে প্রতিদিন মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন লাখো মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বৃষ্টির পর নতুন করে গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে এবং পুরোনোগুলো আরও বড় আকার ধারণ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শামসুজ্জামান বলেন, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে আমিরাবাদ, মোহনপুর, ষাটনল, শিকিরচর, এখলাসপুর, জহিরাবাদ ও জনতাবাজার সংলগ্ন এলাকা। এসব স্থানে যে কোনো সময় বড় ধরনের ধস বা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

আমিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. কামরুজ্জামান ও মো. কামাল হোসেন বলেন, নির্মাণের পর বিভিন্ন সময়ে অন্তত দুবার এই বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। কয়েকশ কোটি টাকার ফসল, বসতভিটা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেনি এলাকাবাসী। বর্তমানে আবারও একই ধরনের বিপর্যয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে নির্মিত হয় ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মানুষ এবং ৩২ হাজার ১১০ একর কৃষিজমি নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পেয়ে আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে বাঁধটির স্থায়ী সংস্কার হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো বারবার কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়রা নিজেরাই বালুর বস্তা, মাটি ও ইট ফেলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ রক্ষার চেষ্টা করছেন।
বাঁধের ওপর দিয়ে চলাচল করা ট্রাকচালক মো. সোহেল মিয়া বলেন, “প্রতিদিন মালবাহী গাড়ি নিয়ে এই সড়কে চলাচল করি। অনেক জায়গায় এত বড় গর্ত হয়েছে যে সামান্য ভুল হলেই গাড়ি উল্টে যেতে পারে। বিশেষ করে রাতের বেলায় চরম আতঙ্ক নিয়ে চলতে হয়।”

সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. আল-আমিন বলেন, “গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা আতঙ্কে থাকি। বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।”
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চাঁদপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা বলেন, “শুধু সড়ক নয়, পুরো বেড়িবাঁধই এখন ঝুঁকির মুখে। দ্রুত কার্যকর সংস্কার না হলে বর্ষার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় ধরনের ধস বা বাঁধ ভাঙনের ঘটনা ঘটতে পারে। এতে লাখো মানুষ পানিবন্দি হওয়ার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।”
বিষয়টি নিয়ে চাঁদপুর মেঘনা- ধনাগোদা পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সেলিম শাহেদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।