Published : 19 Jul 2026, 06:10 PM
পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের অবস্থান জানাতে হলে আগে ফোন করতে, বার্তা পাঠাতে কিংবা আগে থেকেই কোথায় যাওয়া হবে তা জানিয়ে রাখতে হত।
তবে এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে নিজের অবস্থান অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়।
প্রথমদিকে এই সুবিধা নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হলেও ধীরে ধীরে এটি কারও কারও কাছে সামাজিক প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছে।
এমন কি পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সঙ্গীর সঙ্গে সব সময় অবস্থান ভাগ করে রাখাই স্বাভাবিক বিষয় মনে করা হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অভ্যাসের যেমন সুবিধা আছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বাধীনতার ওপরেও প্রভাব পড়তে পারে।
কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারে যোগাযোগের ধরন বদলে গেছে। শুধু কথা বলা নয় বরং কোথায় আছে, কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে আছে, এসব তথ্যও সহজেই জানা সম্ভব।
নিরাপত্তার জন্য শুরু হলেও ব্যবহার বদলেছে
অবস্থান ভাগাভাগির প্রযুক্তি, প্রথমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই গ্রহণ করা হয়েছিল। বিশেষ করে একা ভ্রমণ, নতুন কারও সঙ্গে প্রথমবার দেখা করা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের দ্রুত অবস্থান জানাতে এই প্রযুক্তি বেশ কার্যকর।
যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিপণন বিশেষজ্ঞ ব্রিটানি গার্সিয়া রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই বিষয়ে বলেন, “সচেতনভাবে অবস্থান ভাগ করে নেওয়া নিরাপত্তার জন্য কার্যকর হতে পারে। তবে এটি কখনই সবার জন্য সব সময় চালু থাকা উচিত না।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে না বুঝেই নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করলে সেই তথ্য ব্যবহার করে নানান অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
কখন অবস্থান ভাগ করে নেওয়া উপকারী
গার্সিয়া বলেন, “সব পরিস্থিতিতে অবস্থান ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে।”
প্রথমবার কোনো অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে গেলে বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে অবস্থান ভাগ করে রাখা নিরাপদ হতে পারে।
একইভাবে দূরপাল্লার ভ্রমণ, রাতের যাত্রা অথবা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে, এই সুবিধায় দ্রুত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
‘সবসময় অন’ রাখার মানসিক চাপ
সমস্যাটি শুরু হয় যখন পরিবার, বন্ধু বা সঙ্গী আশা করেন যে, লোকেশন ট্র্যাকারটি সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টাই চালু থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘লোমাস হসপিটালিটি’-র মহা ব্যবস্থাপক অস্কার মেলেন্দেজ একই প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন, "বর্তমানে লোকেশন শেয়ারিং-কে একটি চয়েস বা পছন্দের চেয়েও বেশি অবলিগেশন বা সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।"
ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ যখন বাইরে বা ছুটিতে ঘুরতে যায়, তখনই কেবল তারা লোকেশন বন্ধ রাখার এক ধরনের মানসিক স্বাধীনতা পায়।
ভ্রমণ বা ছুটি কাটানোই এখন মানুষের ডিজিটাল বাউন্ডারি বা সীমানা ঠিক করার একমাত্র উপায় হয়ে উঠছে।
নতুন প্রজন্মের ওপর সাংস্কৃতিক প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের বড় উদ্বেগের জায়গা হলো জেন-জি এবং কিশোর-কিশোরীদের মনস্তত্ত্ব।
স্ন্যাপচ্যাটের ‘স্ন্যাপ ম্যাপ’ আসার পর থেকে তরুণদের মাঝে সারাক্ষণ কে কোথায় আছে তা দেখানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
ব্রিটানি গার্সিয়া সতর্ক করে বলেন, “আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা হয়ত বুঝতেই পারছে না যে, প্রতিদিনের প্রতি মুহূর্তের অবস্থান ইন্টারনেটে প্রকাশ করা, দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তিগত তথ্য বিষয়ক ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ।"
বর্তমানের সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের যুগে এই অভ্যাস, তরুণদের আরও বেশি অরক্ষিত করে তুলছে।
কোথায় টানবেন সীমারেখা?
প্রযুক্তি নিজে খারাপ নয়, তবে এটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা নির্ধারণ করা জরুরি।
এই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণের জন্য সারাক্ষণ নিজের লোকেশন অন রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তির জন্য মাঝে মাঝে এই ট্র্যাকারগুলো বন্ধ রাখা এবং একটি স্বাস্থ্যকর ‘ডিজিটাল বাউন্ডারি’ তৈরি করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
মোবাইল ব্যবহার না ছেড়েও জীবনে পরিবর্তন সম্ভব
অল্প বয়সিদের হাতে স্মার্টফোন দেওয়াতে ক্ষতি
রাতে ফোন চার্জে দিয়ে ঘুমাচ্ছেন? এজন্য হয়ত কমছে ব্যাটারির আয়ু