Published : 16 Sep 2025, 07:00 PM
এক সময় টয়লেটে বসে বড় কাজ করার সময় বই বা পত্রিকা পড়ার চল ছিল। সময়ের তালে সেই অভ্যাস গিয়ে ঠেকেছে মোবাইল ফোন ব্যবহারে।
অনেকেই কমোডে বসে আসল কাজ সারার পরও ফোন ব্যবহারের কারণে দেরি করেন। আর এখানেই ঘটে বিপত্তি।
‘পিএলওএস ওয়ান’ সাময়িকীতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় জানানো হয়- এর ফলে ‘হেমোরয়েডস’ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যেটা অর্শরোগ বা পাইলস হিসেবে পরিচিত।
এই রোগ হওয়ার কারণ হল- অতিরিক্ত চাপের কারণে মলনালী ও মলদ্বারের গুচ্ছখানেক রক্তনালী বা শিরা ফুলে প্রসারিত হয়ে যায়। ফলে হয় চুলকানি, অস্বস্তি, ব্যথা ও রক্তপাত।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ গবেষক গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট এবং বস্টনের ‘গাট-ব্রেইন রিসার্চ ইন্সটিটিউট’য়ের পরিচালক ডা. ট্রিশা প্যাসরিচা মন্তব্য করেন, “গবেষণাটি অনেকদিনের সন্দেহের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রদান করে যে- মানুষ যখন ফোন নিয়ে বাথরুমে যায় তখন সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলে।”
‘স্ক্রল’ করার অভ্যাসটাই স্বাস্থ্যের বারোটা বাজাচ্ছে
সিএনএন ডটকম’য়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ডা. প্যাসরিচা আরও বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাপগুলো আমাদের মনোযোগ সরিয়ে রাখে, আর সময়ের হিসাব রাখতে আমরা ভুলে যাই- অ্যালগারিদমগুলো সেভাবেই তৈরি করা। আর এখন বুঝতে পারছি স্মার্ট ফোন আমাদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে।”
টয়লেটে ফোন ব্যবহারের সাথে অর্শরোগ হওয়ার সম্পর্ক
বাথরুমের অভ্যাস আর টয়লেটে ফোন ব্যবহার নিয়ে জরিপ চালানোর জন্য ১২৫ জন প্রাপ্তবয়স্ককে ‘স্ক্রিনিং কোলোস্কপি’ করতে নিমন্ত্রণ জানানো হয়। এছাড়া ‘পাইলস’ বা অর্শরোগে ঝুঁকি বুঝতে তাদের আঁশ গ্রহণের পরিমাণ ও ব্যায়ামের রুটিন সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করা হয়।
আর পাইলস সনাক্তে ব্যবহার করা হয় এন্ডোস্কোপি।
জরিপে ৬৬ শতাংশের উত্তর ছিল- তারা নিয়মিত টয়লেটে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন। আর যারা ফোন নিয়ে বাথরুমে যান না তাদের তুলনায় ফোন ব্যবহারকারীরা মলত্যাগের পরও অতিরিক্ত সময় টয়লেটে বসে থাকেন।
প্রায় ৫৪ শতাংশ জানান- তারা ফোন ব্যবহার করে টয়লেটে বসে খবর পড়েন। অন্যদিকে ৪৪ শতাংশ জানান, তারা ব্যবহার করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
গবেষকরা দেখতে পান- টয়লেটে নিয়মিত স্মার্টফোন ব্যবহারের সাথে পাইলস হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় ৪৬ শতাংশ। আর প্রায় ৩৭ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী টয়লেটে অতিরিক্ত পাঁচ মিনিট সময় কাটান। সেই তুলনায়, সাধারণ ফোন ব্যবহারকারীর পরিমাণ সাত শতাংশ।
বাথরুমে ফোন ব্যবহারে যেভাবে পাইলস হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে
পাইলস বা অর্শরোগ হওয়ার সাথে বেশিক্ষণ বসে থাকার সম্পর্ক রয়েছ। আর এই ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় টয়লেটে বেশিক্ষণ বসে থাকলে।
কমোডের খোলা সিট, মলাশয়ের জায়গায় চাপ তৈরি করে। সময়ের সাথে সাথে এই চাপ বাড়তে থাকলে মলাশয়ে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে।
প্যাসরিচা বলেন, “যখন কমোডের খোলা সিটে বসে থাকা হয় তখন শ্রোণীদেশের কোনো ‘সাপোর্ট’ থাকে না।”
এই বাজে ভঙ্গীর কারণেই ফোন ব্যবহার করার ফলে বেশি সময় বসে থাকতে থাকতে পাইলস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
নিউ জার্সি’তে অবস্থিত ‘হলি নেইম মেডিকেল সেন্টার’য়ের কোলোরেক্টাল সার্জন ডা. হালিমা ঘান্টা এই গবেষণার সাথে যুক্ত না থেকেও বলেন, “মানুষ ফোন ব্যবহার করার সময় সাধারণত কুঁজো হয়ে যায়, যা মলমূত্র ত্যাগের ক্ষেত্রে সঠিক ভঙ্গিমা নয়।”
মলাশয় থেকে বাঁকা অবস্থায় সংযোগ রয়েছে পায়ুপথ ও মলদ্বারের। যে কারণে হাঁটু ভেঙে বসাই হল মলত্যাগের ক্ষেত্রে আদর্শ ভঙ্গি।
তিনি আরও বলেন, “এক সময় মানুষ এভাবেই কাজ সারতো। তখন আর এই ধরনের সমস্যা দেখা দিত না। তবে আধুনিক সময়ে আমরাই এই ভঙ্গির পরিবর্তন এনেছি। ফলে পাইলসের সমস্যাও বেশি দেখা যাচ্ছে।”
তবে এই রোগে কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রভাব কম।
প্যাসরিচা বলেন, “গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ চাপ দেওয়ার চাইতে টয়লেটে বেশিক্ষণ বসে থাকে।”
ঝুঁকি কমানোর উপায়
সাধারণ পদ্ধতি হল, টয়লেটে ফোন নিয়ে না যাওয়া। আর যেতেই যদি হয়, তবে কমোডের সিটে বসে থাকার সময় কমাতে হবে।
গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টরা ১০ মিনিটের বেশি টয়লেটে বসে থাকতে মানা করেন। আদর্শ সময় হল তিন থেকে পাঁচ মিনিট।
তবে নিউ জার্সি’র ‘আটলান্টিক কোস্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েটস’য়ের ডা. সন্ধ্যা শুকলা বলেন, “বিশেষজ্ঞরা আদর্শ সময় হিসেবে তিন মিনিট বলেন। তবে সবাই তো এক নয়।”
প্যাসরিচা এক্ষেত্রে সময় নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেন।
তার কথায়, “দুইটা টিকটিক ভিডিও পুরো দেখার পর খেয়াল করুন মলত্যাগ পুরোপুরি শেষ হয়েছে কি-না। যদি না হয়, তবে উঠে পড়ুন। আর পরে আবার চেষ্টা করুন। এটা কমোডে বসে থাকার চাইতে স্বাস্থ্যকর।”
ডা. ঘান্টা এই বিষয়ে সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা দেন।
তার কথায়, “জীবনে এমন অনেক কিছু আছে যা পাওয়ার জন্য আমরা তাড়াহুড়ো করি। এক্ষেত্রে বলা হয়- ধীর হও আর গোলাপের গন্ধ নিতে একটু সময় নাও। তবে আর যাই হোক সেটা টয়লেটে নয়।”
আরও পড়ুন
মলের ধরন পরিবর্তনে জরুরি অবস্থা বোঝার উপায়
মলত্যাগের রুটিন বজায় রাখার উপায়