সময়সূচি জানা থাকলে আম কিনে ঠকতে হবে না
আম কিনতে বাজারে যাওয়ার আগে জেনে নিন কোন জেলায় কবে পাড়া হচ্ছে কোন জাত।
রঙিন, সুগন্ধি আম দেখে হাত বাড়াতে ইচ্ছে করে যে কারও। তবে বাজার থেকে কিনে বাড়ি এনে কেটে দেখা গেল- ভেতরে সাদা, কষকষে, স্বাদ একেবারেই নেই। অনেকের এই অভিজ্ঞতা আছে। কারণ একটাই, অপরিপক্ব আম।
বাংলাদেশে আম পাকে জাত এবং জেলাভেদে আলাদা আলাদা সময়ে। তবে বাজারে লাভের লোভে অনেক সময় অপরিপক্ব আম চলে আসে আগেভাগেই।
এই সমস্যা রোধ করতে এবং রপ্তানির মান ঠিক রাখতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তৈরি করেছে 'ম্যাংগো ক্যালেন্ডার'; জেলাওয়ারি, জাতভিত্তিক আম সংগ্রহের সরকারি সময়সূচি।
ঢাকার বাদামতলীর পাইকারি আড়তদার আব্দুল কাদের জিলানি বলেন, “পাকা আম পরিপূর্ণ পুষ্টতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত গাছ থেকে পাড়া উচিত নয়। অপুষ্ট আম ঠিকমতো পাকে না, স্বাদে টক বা কম মিষ্টি হয়। মানসম্মত আম রপ্তানি এবং বাজার ব্যবস্থায় স্থায়িত্ব ধরে রাখতে জেলাওয়ারি জাতভিত্তিক সময় নির্ধারণ জরুরি।”
তাই সঠিক সময়ে সঠিক আম পাড়াটা এখন জাতীয় গুরুত্বের বিষয়।
সবার আগে আসে সাতক্ষীরার আম
দেশে সবার আগে আম পাড়া শুরু হয় সাতক্ষীরায়। ৫ মে থেকেই সেখানে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, বৈশাখী ও বোম্বাই জাতের আম সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
রপ্তানিযোগ্য গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ পাড়া শুরু হবে ১২ মে থেকে। হিমসাগর ও খিরসাপাত ২২ মে। ল্যাংড়া ১০ জুন এবং আম্রপালি ১৫ জুন থেকে।
সাতক্ষীরার আম আগে পাকার কারণ হল- জেলাটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু। উপকূলীয় এলাকা হওয়াতে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার একটি বিশেষ সমন্বয় থাকে, যা আমকে আগেভাগেই পরিপক্ব করে তোলে।
যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর— মে মাসেই শুরু
সাতক্ষীরার পরপরই আসে দক্ষিণ-পশ্চিমের অন্য জেলাগুলো। চুয়াডাঙ্গা ও যশোরে রপ্তানিযোগ্য আম পাড়া শুরু হবে ১৫ মে থেকে। দুই জেলায়ই গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ ১৫ মে। হিমসাগর ও খিরসাপাত ২৭ থেকে ২৮ মে। ল্যাংড়া ১০ জুন এবং আম্রপালি ২০ থেকে ২১ জুনের মধ্যে সংগ্রহ শুরু হবে।
মেহেরপুরে শুরু একদিন পরে— ১৬ মে থেকে। তবে এই জেলায় ফজলির মতো বিশেষ জাতও পাওয়া যাবে, যা সংগ্রহ শুরু হবে ২৩ জুন থেকে।
কুষ্টিয়া জেলায় আম পাড়া শুরু হবে ২০ মে থেকে। গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ সেদিন থেকেই। হিমসাগর ২৯ মে, ল্যাংড়া ১১ জুন এবং ফজলি আসবে ২৪ জুনে।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ— আমের রাজধানীতে দেরিতে তবে সেরা
আমের জন্য বিখ্যাত রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম পাড়া শুরু হয় একটু দেরিতে। তবে এই দুই জেলার আমের স্বাদ ও মানের কারণেই বাংলাদেশ আম রপ্তানিতে সুনাম অর্জন করেছে।
রাজশাহীতে রপ্তানিযোগ্য আম পাড়া শুরু হবে ২৫ মে থেকে। গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ ২৫ মে, হিমসাগর ৩০ মে, ল্যাংড়া ১২ জুন, লক্ষণভোগ ১৬ জুন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১৮ জুন, আম্রপালি ২৫ জুন, ফজলি ২৬ জুন এবং সবার শেষে গৌরমতি আসবে ৩১ জুলাই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু ২৬ মে থেকে। এখানে সবচেয়ে বেশি জাতের আম পাওয়া যায়। গোপালভোগ ২৬ মে থেকে শুরু হয়ে হাড়িভাঙা আসবে ২০ জুন, ফজলি ৩০ জুন এবং গৌরমতি পাড়া শুরু হবে ৪ আগস্ট থেকে।
নাটোরেও একই সময়সূচি— ২৫ মে থেকে শুরু, গৌরমতি আসবে ৫ জুলাই।
উত্তরের জেলাগুলোয় আম পাকে সবার শেষে
নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও— উত্তরের এই জেলাগুলোতে আম পাকে সবচেয়ে দেরিতে। তবে এখানকার আম, বিশেষ করে হাড়িভাঙা জাতটি, দেশজুড়ে সুখ্যাত।
নওগাঁয় আম পাড়া শুরু হবে ১ জুন থেকে, রংপুরে ৩০ মে, দিনাজপুরে ২ জুন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ জুন থেকে।
এই জেলাগুলোতে গৌরমতি পাড়া হবে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত—দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে যথাক্রমে ১২ ও ১৪ অগাস্ট।
অর্থাৎ মে থেকে শুরু হয়ে আম পাওয়া যাবে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। শুধু জানতে হবে কোন জেলায় কোন জাত কখন পাকে।
সময়ের আগে আম কিনলে যে ক্ষতি
সরকারি ক্যালেন্ডার তৈরির পেছনে একটি বড় কারণ আছে। অপরিপক্ব অবস্থায় পাড়া আম স্বাদে হয় টক বা কম মিষ্টি, ঠিকমতো পাকেও না। অনেক সময় রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
সাতক্ষীরায় ইতিমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে— নির্ধারিত সময়ের আগে কোনো জাতের আম পাড়া বা বিক্রি করা যাবে না। অন্য জেলাতেও একই নিয়ম কার্যকর হচ্ছে।
তাই বাজারে গিয়ে আম কেনার আগে একটু মিলিয়ে নিন— যে জেলার আম কিনছেন, সেই জেলায় সেই জাতের আম পাড়ার সময় এসেছে কি-না।
এই একটু সচেতনতাই রক্ষা করবে ঠকে যাওয়া থেকে। আর পরিবারকে দিতে পারবেন আসল মিষ্টি, সুগন্ধি, পরিপক্ব আমের স্বাদ।
আরও পড়ুন
