০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

‘সিজনাল ফাটিগ’ শরীরে অদৃশ্য যুদ্ধ

ঋতু পরিবর্তনের সময় দেহে যে অবসাদ দেখা দেয় তাকেই বলা হয় ‘সিজনাল ফাটিগ’।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Mar 2026, 05:27 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:08 PM

শীতকাল শেষ, কোনো কারণ ছাড়াই শরীর ভারী লাগে, চোখ জুড়ে আসে, কাজে মন বসে না, অতিরিক্ত ঘুম পায়। সকালে বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করে না, দিনভর অলসতা ঘিরে থাকে- এই অবস্থাকে বলা হয় ‘সিজনাল ফাটিগ’ বা ঋতু পরিবর্তনের ক্লান্তি।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিকত চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “শীতের শেষে শরীরকে নতুন ঋতুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পোহাতে হয়। কারণ, শীতকালে দিন ছোট, আলো ও তাপমাত্রা কম— এসব মিলে শরীরের জৈবিক ছন্দ বদলে যায়। বসন্তের দিকে আলো বাড়লে শরীর আবার সমন্বয় করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।”

ঘুমের ছন্দ ভেঙে যাওয়া: অতিরিক্ত ঘুমের ফাঁদ

শীতে গড়ে অন্য ঋতুর চেয়ে বেশি ঘুমানো হয়। দিন ছোট হওয়াতে শরীর বিশ্রামের সংকেত বেশি পাঠায়।

বসন্তে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময় বদলে গেলে ঘুমের চক্র আবার ‘রিসেট’ হতে সময় নেয়।

ফলে রাতে ঘুম ভালো হলেও দিনে ঝিমুনি আসে, অতিরিক্ত ঘুম পায়। এই অসমতুল্যতাই ক্লান্তির মূল কারণ।

সার্কাডিয়ান রিদমের বিশৃঙ্খলা: শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি হারিয়ে যায়

শরীরের ভেতরে একটা জৈবিক ঘড়ি আছে— সার্কাডিয়ান রিদম। এটা ঘুম-জাগরণ, হরমোন নিঃসরণ, শক্তির মাত্রা-সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।

শীতে দিনের আলো কম থাকায় এই ঘড়ি ধীর হয়ে যায়। মেলাটোনিন হরমোন (যা ঘুম আনে) বেশি উৎপন্ন হয়।

সেরোটোনিন (যা মেজাজ ভালো রাখে) কমে যায়।

বসন্তে হঠাৎ দিন লম্বা হয়ে গেলে শরীর মনে করে, ‘এখন তো ঘুমানোর সময় নয়!’ তবে অভ্যাস বদলাতে সময় লাগে।

ফলে মনোযোগ ছড়িয়ে যায়, কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়, সারাদিন ক্লান্তি ঘিরে থাকে।

এই অবস্থা অনেকটা ‘জেট ল্যাগ’-এর মতো, শুধু বিমানে না উড়েও!

কম শারীরিক সক্রিয়তা ও খাদ্যাভ্যাস: শরীরের মেটাবলিজম ধীর

শীতে বাইরে কম যাওয়া, কম ব্যায়াম— এসব মিলে বিপাক পদ্ধতি ধীর হয়ে যায়। ভারী কার্বোহাইড্রেইট যুক্ত খাবার (পিঠা-পুলি, গরম খিচুড়ি) বেশি খাওয়া হয়, যা শরীরকে আরও অলস করে।

বসন্তে হঠাৎ সক্রিয় হতে গেলে, শরীর অতিরিক্ত শক্তি খরচ করে, ফলে প্রথম দিকে ক্লান্ত লাগে।

ভিটামিন ডি’র ঘাটতি

শীতকালে সূর্যের আলো কম পাওয়াতে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি কম হয়। এই ভিটামিন শুধু হাড়ের জন্য নয়- দেহের ও পেশির শক্তি, মেজাজ সবকিছুর সঙ্গে জড়িত।

ঘাটতি হলে পেশি দুর্বল লাগে, ক্লান্তি বাড়ে, মেজাজ খিটখিটে হয়।

বাংলাদেশে অনেকেই শীতে ঘরে বেশি থাকেন, বাইরে কম যান— ফলে এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। বসন্তে আলো বাড়লেও শরীরের ‘স্টক’ পূরণ হতে সময় লাগে, তাই ক্লান্তি থেকে যায়।

অবসাদ কাটানোর সহজ টিপস: প্রকৃতির সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে নেওয়া

সকালের রোদ: ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে দিতে হবে। ২০ থেকে ৩০ মিনিট সকালের রোদে হাঁটা উপকারী। এতে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ ছন্দে ফেরে।

নিয়মিত রুটিন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠার অভ্যাস করতে হবে। এমনকি ছুটির দিনেও।

হালকা ব্যায়াম: সকালে ৩০ মিনিট হাঁটা বা যোগাব্যায়াম— রক্ত সঞ্চালন বাড়বে, শক্তি ফিরবে।

খাবারে সচেতনতা: ওটস, ডিম, ডাল, শাকসবজি, ফল (কমলালেবু, পালং শাক) বাদাম খেতে হবে। ভারী তেল-চর্বি কমানো উপকারী। পর্যাপ্ত পানি পান জরুরি।

ক্যাফিন নিয়ন্ত্রণ: বিকেলের পর চা-কফি কম পান উপকারী। না হলে ঘুমের ব্যাঘাত হয়।

পরীক্ষা করান: ক্লান্তি দীর্ঘদিন থাকলে ভিটামিন ডি, থাইরয়েড বা ‘অ্যানিমিয়া’ পরীক্ষা করাতে হবে। অনেক সময় এগুলো অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে কাজ করে।

ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়ে শরীরকে নতুন ঋতুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

আরও পড়ুন

ক্লান্তি দূরে রাখার চার কৌশল

যেভাবে বুঝবেন মানসিক অবসাদে ভোগার চিকিৎসা ঠিক মতো হচ্ছে

খাবার যখন অবসাদের কারণ

ভ্রমণে দ্রুত জেট ল্যাগ কাটানোর উপায়