Published : 22 Feb 2026, 03:37 PM
মানবদেহে সোডিয়াম একটি অত্যাবশ্যক ইলেকট্রোলাইট, যা রক্তের তরল ভারসাম্য রক্ষা, স্নায়ু সংকেত পরিবহন এবং পেশির স্বাভাবিক সংকোচন-স্ফীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রক্তে সোডিয়ামের স্বাভাবিক মাত্রা ১৩৫ থেকে ১৪৫ মিলিমোল প্রতি লিটার। এই মাত্রা ১৩৫-এর নিচে নেমে গেলে তাকে ‘হাইপোন্যাট্রিমিয়া’ বলা হয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়নের মতে- এই অবস্থা হালকা থেকে গুরুতর পর্যন্ত হতে পারে এবং সময়মতো চিকিৎসা না নিলে জীবনঝুঁকি তৈরি হয়।
হাইপোন্যাট্রিমিয়া’র প্রধান কারণসমূহ
রক্তে সোডিয়াম কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন শারীরিক ও রোগজনিত কারণ কাজ করে।
প্রথমত- শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম হারানো। ডায়রিয়া, বারবার বমি, অতিরিক্ত ঘাম, উচ্চ জ্বর বা দীর্ঘস্থায়ী অতিরিক্ত প্রস্রাবের সমস্যার কারণে সোডিয়াম বেরিয়ে যেতে পারে।
এই ক্ষেত্রে শরীর পানি হারালেও সোডিয়ামের ক্ষয় বেশি হয়, ফলে রক্তে তার ঘনত্ব কমে।
দ্বিতীয়ত- শরীরে অতিরিক্ত পানি জমা হওয়া। অল্প সময়ে অত্যধিক পানি পান করলে (বিশেষ করে ম্যারাথন দৌড়ানোর সময় বা মানসিক রোগে), রক্ত পাতলা হয়ে সোডিয়ামের ঘনত্ব কমে যায়।
কিডনি বা বৃক্কের কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীর অতিরিক্ত পানি ধরে রাখে, যা হাইপোন্যাট্রিমিয়া’র ঝুঁকি বাড়ায়।
তৃতীয়ত- বিভিন্ন ওষুধের প্রভাব। ডিউরেটিক (প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ), কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, ব্যথানাশক ও মানসিক রোগের ওষুধ সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট করে।
এছাড়া থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির অপ্রতুলতা (অ্যাডিসন রোগ) এবং ‘সিনড্রোম অব ইনঅ্যাপ্রোপ্রিয়েট এডিএইচ’ এই সমস্যার জন্য দায়ী। এর ফলে মস্তিষ্ক থেকে অতিরিক্ত এডিএইচ (অ্যান্টিডিউরেটিক হরমোন) নিঃসরণ হয়, যা কিডনিকে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে বাধ্য করে।
অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে- হৃদরোগ, লিভারের সিরোসিস, ফুসফুসের ক্যান্সার বা সংক্রমণ, মস্তিষ্কে আঘাত, স্ট্রোক, অপারেশন-পরবর্তী অবস্থা এবং কিছু ক্ষেত্রে মদ্যপানের অভ্যাস।
লক্ষণসমূহ: কখন সতর্ক হবেন
হালকা হাইপোন্যাট্রিমিয়া’র ক্ষেত্রে প্রায়শই কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তবে মাত্রা আরও কমে গেলে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, মনোযোগের অভাব, বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা দেখা দেয়।
গুরুতর অবস্থায় খিঁচুনি, অচেতনতা, কোমা এবং এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। মস্তিষ্কের কোষে অতিরিক্ত পানি প্রবেশ করে ফুলে যাওয়ায় (সেরিব্রাল এডিমা) এই জটিলতা দেখা যায়।
চিকিৎসা ও করণীয়: যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন
চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে কারণ ও তীব্রতার ওপর। হালকা ক্ষেত্রে পানি গ্রহণ সীমিত করা, লবণযুক্ত খাবার বাড়ানো এবং মূল কারণ চিহ্নিত করে চিকিৎসা করলেই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে।
গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করে শিরাপথে স্যালাইন (সোডিয়াম ক্লোরাইড) দেওয়া হয়। তবে এটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। খুব দ্রুত সোডিয়াম বাড়ালে মস্তিষ্কে অস্থায়ী বা স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে (অসমোটিক ডিমাইলিনেশন সিনড্রোম)।
যদি কোনো ওষুধের কারণে এই অবস্থা হয়, তাহলে ওষুধ পরিবর্তন বা বন্ধ করা হয়। হরমোনজনিত সমস্যায় উপযুক্ত হরমোন থেরাপি দেওয়া হয়। পানি গ্রহণ কঠোরভাবে সীমিত করা এবং কখনও কখনও ‘ভাসোপ্রেসিন রিসেপ্টর অ্যান্টাগোনিস্ট’ ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
করণীয় হিসেবে অভিভাবক ও রোগীদের সচেতনতা জরুরি। অতিরিক্ত পানি পান এড়ানো, ডায়রিয়া-বমিতে ‘ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস)’ সঠিকভাবে গ্রহণ করা, নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো এবং কোনো ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
সতর্কতাই প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি
হাইপোন্যাটিমিয়া একটি গুরুতর অবস্থা, যা সাধারণ লক্ষণ থেকে শুরু করে জীবনঝুঁকি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।
ডা. আফসানা হক নয়নের পরামর্শ অনুসারে, “কারণ চিহ্নিত করে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করলে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য।”
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব।
আরও পড়ুন
সকালের দুর্বলতা কাটানোর ঘরোয়া উপায়