Published : 21 Jun 2025, 05:16 PM
দিন শেষে শান্তিময় ঘুম শরীর ও মনের পূর্ণ বিশ্রাম নিশ্চিত করে। তবে অনেকেই বিছানায় শুয়ে পড়ার পরও ঘুমাতে পারেন না।
মাথায় চিন্তার ঘূর্ণি, পেশিতে টান কিংবা মেজাজের অস্থিরতা ঘুমের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ সমস্যার সহজ ও প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে কিছু ‘স্ট্রেচিং’ বা হালকা ব্যায়াম।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে বিছানাতেই এই স্ট্রেচগুলো করলে শরীরের পেশি আরাম পায়, স্নায়ু শান্ত হয়, আর ঘুম সহজ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘কমপ্লিট স্লিপ’-এর মেডিকেল পরিচালক ডা. ডেভিড রোজেন এবং আয়ারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান ‘নিউরিটাস’-এর প্রধান মেডিকেল অফিসার ডা. অ্যান্ডি ফ্র্যাঙ্কলিন-মিলার রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দুজনেই মন্তব্য করেন যে, “সঠিকভাবে নিয়মিত স্ট্রেচিং ঘুমের মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
স্ট্রেচিং কীভাবে ঘুম ভালো করতে সাহায্য করে?
ঘুমের আগে কিছুটা সময় নিয়ে শরীরকে ধীরে ধীরে শিথিল করা হলে মন ও শরীর দুটোই ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়। স্ট্রেচিং শরীরের পেশিতে জমে থাকা টান দূর করে, রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং স্নায়ুতন্ত্রকে প্রশমিত করে।
ডা. ডেভিড রোজেন বলেন, “স্ট্রেচের ফলে রক্ত প্রবাহ বাড়ে, যা শরীরকে বিশ্রামের সংকেত দেয় এবং কোষগুলোতে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়।”
এছাড়া ধীরে ধীরে গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে স্ট্রেচ মিলিয়ে করলে শরীরের ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ বা শরীরের শান্ত করার স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়, যা আমাদের ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া কমিয়ে শরীরকে শান্ত করে।
ডা. অ্যান্ডি ফ্র্যাঙ্কলিন-মিলার বলেন, “নিয়মিত স্ট্রেচিংয়ের সঙ্গে মনোসংযোগ এবং ধীর শ্বাস-প্রশ্বাস মেলালে হৃদস্পন্দনের তারতম্য বাড়ে। এটি শরীরের মানসিক চাপ মোকাবিলা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং ঘুমের মান উন্নত করে।”
কতক্ষণ স্ট্রেচ করবেন?
ডা. ফ্র্যাঙ্কলিন-মিলার পরামর্শ দেন, ঘুমের আগে পাঁচ থেকে ১০ মিনিট সময় নিয়ে এই স্ট্রেচগুলো করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। প্রতিটি স্ট্রেচ ২০ থেকে ৬০ সেকেন্ড ধরে রাখতে হবে। তবে যন্ত্রণা যেন না হয়, সেই দিকে লক্ষ রাখতে হবে।
তিনি বলেন, “যন্ত্রণা হওয়ার দরকার নেই। আরামের মাত্রায়, এক থেকে ১০ স্কেলে তিন থেকে পাঁচ পর্যন্ত অনুভব হলেই যথেষ্ট।”
সিঙ্গেল নি রোটেশন বা হাঁটু ঘোরানো
এই স্ট্রেচ করতে হবে পিঠে শুয়ে। এক পা ভাঁজ করে বুকের দিকে টেনে আনতে হবে, তারপর সেই পা-টি আস্তে করে বিপরীত পাশে নিতে হবে শরীরের ওপর দিয়ে। এতে পিঠের নিচের অংশ ও নিতম্বের পেশিগুলো আরাম পায়। একই সঙ্গে পেটের পেশি ও হাঁটুর চারপাশের পেশিগুলোও শিথিল হয়।
ডা. ফ্র্যাঙ্কলিন-মিলার বলেন, “এই স্ট্রেচ ‘অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম’ বা স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে, যার ফলে হৃদস্পন্দনের তারতম্য বাড়ে ও ঘুম সহজ হয়।”
গলার ঘূর্ণন
ফোন দেখা, কাজ করা বা ব্যাগ বহনের কারণে গলার পেশি অনেক সময় অতিরিক্ত চাপে পড়ে। গলার ঘূর্ণন স্ট্রেচ করতে হবে চিবুক বুকে নামিয়ে আস্তে আস্তে মাথা বাম থেকে ডানদিকে ঘুরিয়ে। এতে গলার গভীর পেশি, কাঁধ ও ঘাড়ের পেশি শিথিল হয়।
ডা. ফ্র্যাঙ্কলিন-মিলার জানান, “এই স্ট্রেচ মাথা ও ঘাড়ের টান কমিয়ে পেশিতে রক্ত চলাচল বাড়ায়, ফলে মাথাব্যথা কমে।”
ফিগার ফোর স্ট্রেচ
এই স্ট্রেচ করতে হবে পিঠে শুয়ে। এক পা-কে আরেক পায়ের হাঁটুর ওপর ক্রস করে বসাতে হবে এবং নিচের পা-টি বুকে টেনে আনতে হবে। এতে নিতম্ব, পিঠের নিচের অংশ ও পাশের পেশিগুলোতে আরাম পাওয়া যায়।
ডা. ফ্র্যাঙ্কলিন-মিলার বলেন, “যাদের সায়াটিক নার্ভ’ বা পেছনের পেশিতে টান আছে, তারা এই স্ট্রেচ থেকে অনেক উপকার পান। এটি স্নায়ুর জটিলতা কমাতে সহায়তা করে।”
পাশ ফিরে কোয়াড স্ট্রেচ
বিছানায় পাশে শুয়ে ওপরের পা ভাঁজ করে নিজের পেছনের দিকে টেনে আনুন, পায়ের পাতা বা গোড়ালি হাতে ধরে রাখুন। এতে সামনের পায়ের পেশি (কোয়াড্রিসেপস) প্রসারিত হয়।
ডা. রোজেন জানান, “দিনভর হাঁটা-চলা, সিঁড়ি ভাঙা কিংবা চেয়ার থেকে ওঠা-বাসার কারণে এই পেশি অতিরিক্ত ব্যবহৃত হয়। ঘুমের আগে এই পেশি শিথিল না করলে রাতে পেশিতে টান পড়ে, যা ঘুম ভেঙে দিতে পারে।”
গোড়ালি নড়া ও ঘূর্ণন
এই স্ট্রেচে পিঠে শুয়ে পা সোজা রেখে এক পা ওপরে তুলে গোড়ালি ওপরে-নিচে নাড়াতে হবে। তারপর ঘড়ির কাঁটার মতো ও বিপরীত দিকে আস্তে করে ঘুরাতে হবে। এতে পায়ের নিচের পেশি ও গোড়ালির জোড়ার চলাচল উন্নত হয়।
ডা. রোজেন বলেন, “এই স্ট্রেচ ‘প্ল্যান্টার ফেসিয়া’ নামের পেশি ও টিস্যুর ওপর চাপ কমায় এবং রক্ত চলাচল উন্নত করে। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠে পায়ে ব্যথা অনুভব হয় না।”
পাশ ফিরে হিপ ফ্লেক্সার স্ট্রেচ
পাশে শুয়ে নিচের পা সোজা রাখুন, ওপরের পা ভাঁজ করে বুকের দিকে আনুন। এটি হিপ ফ্লেক্সার বা কোমরের সামনের দিকের পেশি প্রসারিত করে।
ডা. রোজেন বলেন, “দিনভর বসে কাজ করার ফলে এই পেশিগুলো শক্ত হয়ে যায়। এই স্ট্রেচ কোমরের সামঞ্জস্য বজায় রাখে এবং পিঠের চাপ কমিয়ে ঘুমানোর ভঙ্গি আরামদায়ক করে তোলে।”
পেলভিক টিল্ট
এই স্ট্রেচে পিঠে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে রাখতে হবে। এবার পেটের পেশি শক্ত করে নিচের পিঠ বিছানার সঙ্গে চেপে ধরতে হবে এবং পেলভিস বা কোমরের হাড় সামান্য ওপরে তোলার অনুভব তৈরি করুন।
ডা. রোজেন বলেন, “এই হালকা স্ট্রেচ পিঠের নিচের পেশি শিথিল করে এবং মেরুদণ্ড সঠিকভাবে সোজা রাখতে সাহায্য করে। এতে গভীর ‘কোর’ পেশি সক্রিয় হয়, যা শরীরের সামনের ও পেছনের পেশির ভারসাম্য বজায় রাখে।”
আরও পড়ুন