১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইবনে আরাবি: আগুনের ভেতর দেখেছিলেন উদ্যান

এক মানুষের হৃদয়ে কাবা, মঠ আর মন্দির একসঙ্গে কীভাবে বাস করল!

ইবনে আরাবি: আগুনের ভেতর দেখেছিলেন উদ্যান
ইবনে আরাবির প্রতিকৃতি, পুরো নাম মহিউদ্দিন ইবনে আরাবি (১১৬৫ – ১২৪০)।

রাব্বী আহমেদ রাব্বী আহমেদ

Published : 11 Jan 2026, 12:20 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:32 PM

ইবনে আরাবির পুরো নাম মহিউদ্দিন ইবনে আরাবি (১১৬৫ ১২৪০)। ইসলামের ইতিহাসে পৃথিবীব্যাপী তিনি ‘শেখ আল-আকবর’ বা ‘সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু’ হিসেবে স্মরণীয়। সুফিতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক দর্শনের ক্ষেত্রে আরাবি এক অক্ষয় নাম।

একাধারে তিনি ছিলেন দার্শনিক, আধ্যাত্মিক সাধক ও কবি। জন্ম নেন স্পেনের আন্দালুসিয়ার মারসিয়া শহরে, দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি। সেটা ছিল আন্দালুসিয়া বা মুসলিম স্পেনের এক সন্ধিক্ষণ; যা নানা রাজনৈতিক সংকট, অস্থিরতা আর জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। একদিকে তখন চলছিল উত্তর দিক থেকে খ্রিস্টান শক্তির পুনর্দখল অভিযান, অন্যদিকে মুওয়াহহিদিন রাজবংশের শাসনে ক্রমাগত বাড়ছিল সামাজিক ও ধর্মীয় কড়াকড়ি।

মুহাম্মদ ইবনে তুমার্ত (১০৭৭  ১১৩০) প্রতিষ্ঠিত এই রাজবংশটি ১১২১ সাল থেকে ১২৬৯ সাল পর্যন্ত মাগরেব দেশগুলো (মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া লিবিয়া ও আন্দালুস) শাসন করেছিল। অবশ্য পরে এটি ধর্মীয় আন্দোলনের দিকে মোড় নেয়।

গোঁড়ামি আর ধর্মকে আক্ষরিক ব্যাখ্যার সেই দুঃসহ সময়ে, আরাবি হৃদয়ের আধ্যাত্মিকতা ও স্রষ্টার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি তার রচনায় উপস্থাপন করেন, দৃঢ়ভাবে। ওই সময়ের যুদ্ধ-বিগ্রহের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, তিনি তার দর্শনে এক বিশ্বজনীন প্রেমের ধর্ম এবং অস্তিত্বের একত্বের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। ভাঙা আর গড়ার সেই রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশ-ই তার চিন্তা ও লেখনিতে আধ্যাত্মিক বিপ্লবের সূচনা ঘটায়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের চিন্তাধারায় এটি পরে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে।

আরাবির দর্শনের মূল কথা- ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ বা ‘অস্তিত্বের একত্ব’; যেখানে এক পরম প্রেমের সূত্রে তিনি স্রষ্টা আর সৃষ্টি, উভয়কে একই মালায় গাঁথেন। মূলত দার্শনিক হিসেবে পরিচিতি থাকলেও, কবিতা ইবনে আরাবির রচনার এক অপরিহার্য দিক। তার সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘তর্জুমান আল-আশওয়াক’ (তীব্র প্রেমের তরজমা) পুরোটা কবিতার ভাষায় রচিত।

এর বাইরে তার অন্যান্য লেখাপত্রেও প্রচুর পদ্যের উপস্থিতি রয়েছে। যেমন, ফরাসি ইসলামতত্ত্ববিদ, গবেষক ও অনুবাদক রজার ডেলাড্রিঁয়ের (১৯২১  ২০১২) গবেষণায় দেখা গেছে যে, তার সৃষ্টি ‘ফুতুহাত আল-মাক্কিয়া’ (মক্কার দিব্যজ্ঞান) বইয়ে সাত হাজারেরও বেশি পঙক্তি রয়েছে।

‘তর্জুমান আল-আশওয়াক’ বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন বিশ্রুত ব্রিটিশ প্রাচ্যতাত্ত্বিক ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর. এ. নিকোলসন (১৮৬৮  ১৯৪৫)। ২০১১ সালে দশ হাজারেরও বেশি পৃষ্ঠার এই বইটি প্রকাশের শতবর্ষ পালিত হয়। আরবি মূল পাঠের পাশাপাশি এই ইংরেজি অনুবাদটি ছিল পশ্চিমা কোনো ভাষায় প্রকাশিত ইবনে আরাবির প্রথম কাজ।

ভাষাগত, দার্শনিক আর ঐতিহাসিক কারণে প্রায় আট শতাব্দী ধরে আরাবির কাজ পৃথিবীর একটা বড় অংশের পাঠকদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। এই প্রকাশনা সেই সুযোগটি করে দেয়, এবং বিশ্বের জ্ঞানকাণ্ডে নতুন অনেক দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করে, যা নিয়ে আজও হইচই চলমান। গবেষকরা মনে করেন, ‘আরাবির কবিতা কেবল শব্দের ক্রীড়া নয়, বরং অতল অন্তর থেকে উৎসারিত এক আধ্যাত্মিক আর্তি, পাঠকদের যা টেনে নেয় অনন্ত-অসীমের পথে।’ এখানে আরাবির নির্বাচিত কয়েকটি কবিতা ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা হলো।

আগুনের শিখার মধ্যে এক উদ্যান

এ কী বিস্ময়!

আগুনের শিখার মধ্যে এক উদ্যান!

আমার হৃদয় তো নিতে পারে

যে-কোনো রূপ:

হরিণদের জন্য এক তৃণভূমি,

সন্ন্যাসীদের জন্য এক নির্জন আশ্রম।

মূর্তিদের জন্য, পবিত্র স্থান,

প্রদক্ষিণরত তীর্থযাত্রীর জন্য কাবা,

তাওরাতের বিধানফলক,

কুরআনের পাণ্ডুলিপি।

প্রেমের ধর্মকেই আমি ঘোষণা করি;

পথে যেতে যেদিকেই মোড় নিক না কেন তার কাফেলা,

সেটাই ধ্রুব বিশ্বাস, সেটাই ঈমান

যা আমি লালন করি।

মাইকেল এ. সেলসের ইংরেজি অনুবাদে, ইবনে আরাবির কবিতাবই ‘তর্জুমান আল-আশওয়াক’-এর ১১ নম্বর কবিতা থেকে সংগৃহীত। এটি আরাবির ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ বা ‘অস্তিত্বের একত্বে’র ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। কবিতায় ‘আগুনের শিখার মধ্যে উদ্যান’ রূপকটি মূলত কঠিন পরীক্ষার মধ্যেও ঐশ্বরিক প্রশান্তির প্রতীক। এখানে কবির হৃদয় কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা এতটাই প্রশস্ত যে- সেখানে মন্দির, মঠ, কাবা কিংবা পবিত্র বই, সবই সমান মর্যাদায় স্থান পায়। কবির কাছে ধর্মের মূল নির্যাস হলো ‘ইশক’ বা প্রেম। প্রথাগত বিভেদ-বিভাজনের ঊর্ধ্বে গিয়ে স্রষ্টার প্রতি এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই তার কাছে চূড়ান্ত ঈমান বা ধ্রুব বিশ্বাস।

তীর নেই এক সমুদ্র

আমি বিস্ময়ে দেখলাম এক সমুদ্র, যার তীর নেই,

আর এক তীর, যার সমুদ্র নেই;

আর এক সকালের আলো যার অন্ধকার নেই;

আর এক রাত্রি, যার ভোর নেই।

এবং এরপর এক গোলক, যার আধার নেই,

প্রাজ্ঞ বা মূর্খ কারো কাছেই যা চেনা নয়;

আর পৃথিবীর ওপর উত্থিত এক গাঢ় নীল গম্বুজ,

নিজ কেন্দ্রের চারদিকে ঘুরছে- অনিবার্য বাধ্যতায়;

আর এক বৈভবময় পৃথিবী,

যার ওপর খিলান-তোলা আচ্ছাদন নেই,

আর নেই নির্দিষ্ট অবস্থান, নিগূঢ় রহস্যে ঢাকা…

জেরাল্ড এলমোরের ইংরেজি অনুবাদে, ইবনে আরাবির প্রারম্ভের অন্যতম টিকে থাকা রচনা ‘কিতাব আনকা মুগরিব’ (রহস্যময় সেই ফিনিক্স পাখি) থেকে কবিতাটি সংগৃহীত ও সংক্ষেপিত। আরাবির এই বইটি সুফি-দর্শনের এক নিগূঢ় রূপক। এখানে ‘আনকা’ হলো এমন এক কাল্পনিক পাখি, যার নাম আছে ঠিকই, কিন্তু কোনো শরীর নেই। এটি মূলত পরম সত্য, পূর্ণ মানব বা ‘ইনসানে কামিল’-এর প্রতীক। বইটিতে তিনি সৃষ্টির রহস্য, আধ্যাত্মিক পূর্ণতা আর মানুষের খিলাফত বা ঐশ্বরিক প্রতিনিধিত্বের গূঢ় তত্ত্বগুলোকে উচ্চমার্গের কাব্যিক ভাষায় বর্ণনা করেছেন।

বিশেষ করে, এই কবিতায় আরাবি এমন এক জগতের চিত্র তুলে ধরেছেন, যেটা মানুষের সাধারণ যুক্তি বা ইন্দ্রিয় দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। ‘তীরহীন সমুদ্র’ বা ‘ভোরহীন রাত্রি’ এইসব রূপক দিয়ে তিনি মূলত স্রষ্টার অসীম সত্তা আর মহাবিশ্বের সেই রহস্যময় রূপটিকে সামনে এনেছেন, যেটা শুধু আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মাধ্যমে-ই অনুভব করা সম্ভব। জাগতিক সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যা তৈরি করে এক অপার্থিব বিস্ময়।

আমার ছোট্ট মেয়েটাকে শুইয়ে দিলাম চিরবিশ্রামে

আমার ছোট্ট মেয়েটাকে আমি শুইয়ে দিলাম চিরবিশ্রামে, নিজের হাতেই,

কেননা সে তো আমার-ই রক্তমাংস, তাই বিচ্ছেদের এই অমোঘ বিধান

আমি মেনে নিতে বাধ্য, ফলে আমার হাত এখন শূন্য আর কিচ্ছু ধরে নাই।

আমরা বন্দি এই বর্তমান মুহূর্তে; হারিয়ে যাওয়া গতকাল আর না-আসা

আগামীকালের মাঝখানে, আমরা আটকে গেছি। আমার এ শরীর যেন খাঁটি

রুপা, আর আমার অন্তরাত্মা বিশুদ্ধ সোনা। আমি যেন এক ধনুক হয়ে বেড়ে

উঠছি, আমার পাঁজরের মতোই- বক্র আজ আমার শরীরের বাচনভঙ্গি।

আমার প্রভু স্বয়ং বলেছেন, তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন যন্ত্রণা আর ক্ষতির

এক দশায়, তাহলে কী করে আমি বিশ্রামের আশা করতে পারি,

এমন বৈরী স্থান আর অবস্থানে থেকে?

শোনো, ও আমার পরম-প্রিয়

শোনো, ও আমার পরম-প্রিয়!

আমি এই পৃথিবীর প্রকৃত অবস্থা, বৃত্তের মধ্যস্থ কেন্দ্র,

আমি এর প্রতিটি অংশ, আর আমি সমগ্রও।

আমি সেই ইচ্ছা, বেহেশত ও জমিনের মাঝখানে প্রতিষ্ঠিত।

আমি তোমার ভেতর জন্ম দিয়েছি উপলব্ধি কেবল এ-জন্য যে

আমি যেন হই আমার-ই উপলব্ধির বিষয়।

তাই তুমি যখন আমাকে উপলব্ধি করো,

আদতে তুমি নিজেকেই উপলব্ধি করো।

আমার চোখ দিয়েই তুমি আমাকে দেখো আর দেখো নিজেকেও,

তোমার চোখ দিয়ে তুমি আমাকে দেখতে পাবে না।

ও পরম-প্রিয়!

কতবার যে আমি তোমাকে ডেকেছি আর তুমি সেটা শোনোনি,

কতবার যে আমি নিজেকে তোমায় দেখিয়েছি আর তুমি দেখোনি,

কতবার যে নিজেকে সুগন্ধী বানিয়েছি, আর তুমি আমার ঘ্রাণ শোঁকোনি।

সুস্বাদু খাবার হয়ে এসেছি, অথচ তুমি আমায় চেখে দেখনি।

যে বস্তু তুমি স্পর্শ করো, কেন তার মাধ্যমে আমাতে পৌঁছাতে পারনা?

কিংবা আমাকে নাও না নিঃশ্বাসে মিষ্টি সুগন্ধির মারফত?

কেন আমায় দেখো না তুমি?

কেন তুমি শোনো না আমায়?

কেন? কেন? কেন?

এই টেক্সটি মূলত আরবি ভাষায় লেখা হয়েছে; কিন্তু সেটা কবিতার আঙ্গিকে নয়। এটি আরাবির বই ‘কিতাব আল-তাজাল্লিয়াত’ (দিব্যপ্রকাশের গ্রন্থ)-এর একটি অধ্যায়ের অংশবিশেষ। কিন্তু ফরাসি দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ হেনরি করবিন (১৯০৩ ১৯৭৮) তার ‘ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন ইন দ্য সুফিজম অব ইবনে আরাবি’ বইয়ে একে কবিতার আকারে অনুবাদ করেছেন। এ কারণে কবিতা হিসেবেই বর্তমানে এটি জনপ্রিয়।

এই কবিতার মূল সুরে তিনটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। এক- অদ্বৈত সত্তা: দৃশ্যমান জগতের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশে আর সমগ্রের পূর্ণতায় এক ও অদ্বিতীয় পরম সত্য-ই বিরাজমান। দুই- আত্মউপলব্ধি: স্রষ্টা মানুষের মধ্যে বোধের জন্ম দিয়েছেন, যেন মানুষ নিজেকে চেনার মাধ্যমেই তার স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে। তিন- দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা: মানুষ তার পার্থিব চোখ বা অহং দিয়ে সত্যকে পায় না; বরং স্রষ্টার দেওয়া দৃষ্টিতে নিজেকে বিলীন করতে পারলেই তার অস্তিত্ব অনুভব করা সম্ভব।