Published : 07 Jul 2026, 01:53 AM
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, তাকে বিশ্ব চেনে ‘মাকোন্দোর জাদুকর’ হিসেবে। দাদির কাছে শোনা রূপকথা আর দাদার কাছে শোনা যুদ্ধের গল্পের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি গড়েছিলেন সাহিত্যের মায়াবী ভুবন।
১৯২৭ সালের ৬ মার্চ কলম্বিয়ার আরাকাতাকায় জন্ম নেওয়া এই লেখক ১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু বিশ্বখ্যাত কথাশিল্পী হওয়ার অনেক আগে তিনি ছিলেন একজন লড়াকু সাংবাদিক।
১৯৫০-এর দশকে কলম্বিয়ার বারানকিয়া শহরের সংবাদপত্রের দপ্তরে কাটানো দিনগুলোই ছিল তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার আসল আঁতুড়ঘর। তার সম্পাদক ক্রিস্টোবাল পেরার ভাষায়, মার্কেস ছিলেন মূলত ‘সাংবাদিকতা আর কাফকার এক অনন্য সংমিশ্রণ’।
ওই বছর জুন মাসের এক রোববার তরুণ সাংবাদিক মার্কেস তার নিবন্ধ শুরু করেছিলেন এক স্বীকারোক্তি দিয়ে, “তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, স্টেডিয়ামে যাব।” বারানকিয়া শহর তখন ফুটবল-উন্মাদনায় কাঁপছে। কলম্বিয়ান ফুটবলের সেই স্বর্ণযুগে স্থানীয় দল ‘আতলেতিকো জুনিয়র’ মুখোমুখি হচ্ছে বোগোতার শক্তিধর ‘মিলিওনারিওস’-এর।
মাঠে তখন বিশ্বফুটবলের নক্ষত্র আলফ্রেডো ডি স্টিফানো এবং ব্রাজিলের কিংবদন্তি হেলেনো দে ফ্রেইতাস, যিনি সেই ম্যাচে জুনিয়র দলের খেলোয়াড়-প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। মার্কেস সহজাতভাবে ফুটবল ভক্ত ছিলেন না, বরং তার বন্ধুদের জোরাজুরিতেই সেদিন জীবনে প্রথমবারের মতো গ্যালারিতে গিয়ে বসেন।
আর সেই ৯০ মিনিটই একজন সাংবাদিক হিসেবে তার দেখার চোখ বদলে দেয়। এরপর সেই অভিজ্ঞতা তাকে এতটাই আলোড়িত করে যে, এর ওপর ভিত্তি করেই তিনি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত নিবন্ধ ‘এল জুরামেন্তো’ বা ‘শপথ’, ইংরেজিতে ‘দ্য ওথ’।
গ্যালারিতে বসে মার্কেস লক্ষ্য করেছিলেন মানুষের অদ্ভুত রূপান্তর। তিনি দেখলেন, সমাজের মার্জিত আর গম্ভীর মানুষগুলোও প্রিয় দলের রঙিন টুপি মাথায় দেওয়া মাত্রই নিজেদের চেনা পরিচয় ভুলে উন্মাদ ভক্তে পরিণত হচ্ছেন। মার্কেসের কাছে ফুটবলকে মনে হয়েছিল এক ধরনের সংক্রামক রোগ বা মহামারির মতো, যা এক সমর্থক থেকে অন্য সমর্থকে ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত।
তার ১৯৮৫ সালের কালজয়ী উপন্যাস ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’-তে প্রেমকে তিনি যেভাবে চিত্রিত করেছিলেন, ফুটবলের উন্মাদনাকেও তার কাছে তেমনই মনে হয়েছিল। মার্কেজের মতে, ফুটবল কেবল ২২ জন মানুষের দৌড়াদৌড়ি নয়, এটি একটি মেটাফিজিক্যাল রূপান্তর।
যেমন রোজারিও থেকে আসা তরুণটি হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে কেবল ‘লিও’, কিন্তু মাঠে জার্সি পরে নামার সাথে সাথে তিনি হয়ে ওঠেন লাখো মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিরূপ ‘মেসি’। এই যে ব্যক্তি মানুষের আইডলে রূপান্তর, এটাই ছিল মার্কেসের কাছে ফুটবলের আসল জাদু।
নিবন্ধে সাংবাদিক মার্কেস মাঠের খেলোয়াড়দেরও বিশ্লেষণ করেছিলেন তার নিজস্ব শৈল্পিক ঢঙে। তার চোখে ফুটবলাররা ছিলেন একেকজন ‘লেখকের’ মতো। যেমন- জুনিয়র দলের হেলেনো দে ফ্রেইতাসকে তার মনে হয়েছিল একজন ‘গোয়েন্দা ঔপন্যাসিক’, যার প্রতিটি চাল ছিল রহস্যে ঘেরা। রক্ষণভাগের খেলোয়াড় দোস সান্তোসকে তার মনে হয়েছিল ‘নিষ্ঠুর শিল্প-সমালোচক’, যার কাজই হলো প্রতিপক্ষের সৃজনশীল আক্রমণগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া।
দে লাতুরকে তিনি দেখেছিলেন এক ‘ছন্দময় কবি’ হিসেবে, আর ডি স্টিফানোর খেলার মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন অলংকার শাস্ত্রের নিপুণ ব্যবহার। মার্কেস মনে করতেন, ফুটবল নিয়ে পুরোপুরি বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন লেখা অসম্ভব; কারণ এই খেলার বড় অংশই জুড়ে থাকে দর্শকের ব্যক্তিগত আবেগ আর কল্পনা। ঠিক যেমন তার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিটিউড’-এ মাকোন্দোর জগতটি ছিল বাস্তব আর কল্পনার এক মায়াবী মিশেল, ফুটবল মাঠও তার কাছে ছিল তেমনই এক জায়গা যেখানে ‘অদ্ভুত বিষয়গুলো স্বাভাবিকের সঙ্গে প্রতিদিন হাত মেলায়’।
তবে মার্কেসের এই ফুটবল-দর্শন কেবল মাঠের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না। লাতিন আমেরিকার ফুটবল আর তার রক্তক্ষয়ী ইতিহাস আসলে অবিচ্ছেদ্য। হার্নান কর্টেসের আদিবাসী নিধন থেকে শুরু করে একনায়কতন্ত্র আর যুদ্ধের ট্র্যাজেডি, সবই লাতিন ফুটবলের উন্মাদনার পেছনে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মার্কেস তার নোবেল ভাষণে বলেছিলেন, “লাতিন আমেরিকার মানুষ প্লেগ বা যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়েও ‘জীবন’ দিয়ে জবাব দেয়।” ফুটবল যেন সেই অপ্রতিরোধ্য জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। ইউরোপ বা আমেরিকায় খেলা আর রাজনীতিকে আলাদা করা হলেও, লাতিন আমেরিকায় সেই রেখাটি কখনো ছিল না।
১৯৭৮-এর আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তার প্রচারণা হোক বা ১৯৬৯-এর ফুটবল যুদ্ধ- সবই মার্কেসের সেই জাদুবাস্তবতার বাস্তব রূপ, যেখানে তুচ্ছ ঘটনাও মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়। বারানকিয়ার সেই গ্যালারি থেকে ফিরে আসা রিপোর্টার মার্কেস বুঝেছিলেন, ফুটবল মাঠ হলো সেই দর্পণ, যেখানে একটি মহাদেশের আনন্দ, বেদনা আর টিকে থাকার লড়াই প্রতিফলিত হয়।
২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল মেক্সিকো সিটিতে মার্কেজের জীবনাবসান ঘটে। তার সেই ‘শপথ’ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফুটবল কেবল গোল বা স্কোরবোর্ডের হিসাব নয়, এটি মানুষের হার না মানা প্রাণশক্তির চিরন্তন আখ্যান।
সূত্র: ইএসপিএন