Published : 05 Jul 2026, 01:19 PM
মিশরের প্রাচীন ও ধুলোমাখা কায়রো শহরের অলিগলি থেকে উঠে এসে বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ শিখর ছোঁয়া এক সাহিত্যিকের নাম নাগিব মাহফুজ। ১৯১১ সালের ১১ ডিসেম্বর কায়রোর আল-গামালিয়া এলাকায় জন্ম নেওয়া মাহফুজকে বলা হয় ‘আধুনিক আরবি কথাসাহিত্যের জনক’।
১৯৮৮ সালে তিনি প্রথম ও একমাত্র আরব লেখক হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তার সৃষ্টি ‘কায়রো ট্রিলজি’ (আল-কালাইয়িন, কাসর আল-শওক এবং আল-সুক্কারিয়া) বিশ শতকের মিশরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষের জীবনের এক অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
উপন্যাসের পাশাপাশি প্রায় সাড়ে তিনশ ছোটগল্প ও অসংখ্য চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন তিনি। তার লেখায় যেমন আছে সূক্ষ্ম বাস্তববাদ, তেমনই স্থান পেয়েছে রূপক, ব্যঙ্গ আর ইতিহাস। সারা জীবন কায়রো শহরকে ভালোবেসে এর অলিগলিতে হেঁটে বেড়ানো এই লেখক ২০০৬ সালের ৩০ অগাস্ট ৯৪ বছর বয়সে মারা যান।
কিন্তু মৃত্যুর বহু বছর পরও তার অবচেতন মনের কিছু মায়াবী আর বিষাদময় স্বপ্ন নতুন করে আলোড়ন তোলে তার শেষ সৃষ্টি ‘আই ফাউন্ড মাইসেলফ... দ্য লাস্ট ড্রিমস’ বইটির মাধ্যমে। আর এই স্বপ্নগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে মিশে আছে লেখকের জীবনের অন্যতম বড় এক আবেগ- ফুটবল।
সাহিত্যে বুঁদ হওয়ার আগে নাগিব মাহফুজের প্রথম প্রেম ছিল ফুটবল। শৈশবে কায়রোর আব্বাসিয়া অঞ্চলের ধুলোবালি মাখা রাস্তায়, যেখানে একদিকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিনের ইসলামিক উৎসবের প্যান্ডেল হতো, অন্যপাশে সেই খোলা মাঠেই বন্ধুদের সঙ্গে দাপিয়ে ফুটবল খেলতেন তিনি।
১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে মিশর যখন ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে নিষ্পেষিত, তখন এই ফুটবলই যেন ছিল মাহফুজের মতো তরুণদের জন্য প্রতিরোধের অস্ত্র। ব্রিটিশদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির সামনে যেখানে মিশরীয়রা ছিল অসহায়, সেখানে ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাসে ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীনতা।
মাহফুজ নিজেই কায়রো ভিত্তিক ইংরেজি ভাষার সাপ্তাহিক ‘আল-আহরাম উইকলি’-তে এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, “ফুটবল খেলাটা তখনকার দিনে আমাদের কাছে ছিল এক বিশেষ আকর্ষণের জায়গা, কারণ এটাই ছিল একমাত্র ক্ষেত্র যেখানে আমরা ব্রিটিশদের বুক ফুলিয়ে হারাতে পারতাম এবং এর বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পেত না।”
যদিও জীবনের একটা পর্যায়ে এসে ফুটবল মাঠের উন্মাদনা ছেড়ে তিনি বইয়ের পাতার শান্ত জগতে আশ্রয় নেন এবং নিজেই বলেন যে তিনি ফুটবল থেকে পড়ার জগতে চলে এসেছেন, তবুও মাঠের সেই ফুটবলারকে তিনি মন থেকে কখনো মুছে ফেলতে পারেননি। লেখালেখির চরম ব্যস্ততার মাঝেও কায়রোর দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল ক্লাব ‘জামালেক’ এবং ‘আল-আহলির’ মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচগুলো দেখার জন্য তিনি মাঠে বা টেলিভিশনের সামনে ছুটে যেতেন।
বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিতেন স্থানীয় এক ‘কাহওয়া’ বা কফি হাউজে, যার একমাত্র মূল বিষয়ই ছিল ফুটবল ও রাজনীতি। এমনকি ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত তার একটি গল্পসংকলনের নাম তিনি এই প্রিয় আড্ডাস্থলের নামানুসারেই রেখেছিলেন ‘কুশতুমুর’। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, মৃত্যুর মাত্র দুই বছর আগে ২০০৬ সালে, তিনি ২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের জন্য মিশরের ব্যর্থ চেষ্টাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
এমনকি জীবনের শেষ দিনগুলোতেও যখন শরীর ভেঙে পড়েছে, তখন মিশরের পঞ্চম আফ্রিকার কাপ অব নেশনস জয় তাকে শিশুর মতো আপ্লুত করেছিল। তিনি বলতেন, “ফুটবল এখন আমাদের কাছে আর কেবল খেলা নয়, বরং নিজেদের জীবনের সব দুঃখ-বেদনা আর রাজনৈতিক হতাশা ভুলে থাকার এক জাদুকরী উপায়।”
ফুটবলের প্রতি এই আজীবন টান এবং এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটেছে তার শেষ জীবনে দেখা স্বপ্নগুলোতে। ১৯৯৪ সালে এক উগ্রপন্থি হামলায় নাগিব মাহফুজের ঘাড়ের রগ কেটে যায়। প্রাণে বেঁচে গেলেও তার ডান হাত অবশ হয়ে পড়ে, ফলে যে হাত দিয়ে তিনি মহাকাব্যিক সব উপন্যাস লিখেছেন, সেই হাতে কলম ধরাটাই তার জন্য দুঃসহ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু যার মস্তিষ্ক ও মন জুড়ে গল্পের সমুদ্র, তাকে তো স্তব্ধ করা যায় না। জীবনের শেষ দশ বছরে যখন লেখার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে গেছে, তখন তিনি তার অবচেতন মনে দেখা স্বপ্নগুলোকে ছোট ছোট টুকরো লাইনে ডিকটেশন দিয়ে বা কষ্ট করে লিখে রাখতে শুরু করেন। লিবীয়-ব্রিটিশ লেখক হিশাম মাতারের অনুবাদ এবং তার স্ত্রী ডায়ানা মাতারের আলোকচিত্রে সাজানো এই বইটির স্বপ্নগুলোর মধ্যে মাহফুজের সেই হারানো ফুটবলার সত্তা আবার ফিরে আসে।
একটি স্বপ্নে ৯৪ বছরের বৃদ্ধ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত মাহফুজ নিজেকে আবিষ্কার করেন মিশরের জাতীয় দলের এক দুর্দান্ত তরুণ স্ট্রাইকার হিসেবে, যিনি তার অসাধারণ ড্রিবলিং আর গোল করার দক্ষতার জন্য পুরো স্টেডিয়াম মাতাচ্ছেন। মাঠের ভেতরে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা তাকে ফাউল করার জন্য তেড়ে আসছে।
কিন্তু ফুটবলটি যেন তাকে শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর বল এবং মাহফুজ- উভয়েই প্রতিপক্ষের নাগালের বাইরে চলে গিয়ে একসময় স্টেডিয়ামের গণ্ডি পেরিয়ে আকাশের মেঘের গভীরে অদৃশ্য হয়ে যান। এই স্বপ্নটি যেন কেবলই কল্পনা ছিল না, ছিল এক নোবেলজয়ীর নিজের অবশ শরীর থেকে মুক্ত হয়ে আবার সেই শৈশবের মুক্ত বাতাসে বল পায়ে ডানা মেলার আকুতি।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস