Published : 06 Jul 2026, 11:24 AM
প্রচণ্ড দাবদাহে যখন মধ্যপ্রাচ্যের প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে ওঠে, যখন মরুভূমির তপ্ত বালু আর আগুনের হলকায় জনজীবন ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই ওমানের দক্ষিণ প্রান্তে ধোফার প্রদেশের সালালাহ সেজে ওঠে অলৌকিক সাজে। রাজধানী মাস্কাটে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা যখন ৪৮ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, তখন রাজধানী থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার দূরের সালালাহতে তাপমাত্রা নেমে আসে ১৬ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
একই দেশের দুই অঞ্চলের এমন আকাশ-পাতাল বৈপরীত্য প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কেবল বিস্মিতই করে না, বরং সালালাহকে পরিচিতি দিয়েছে ‘মধ্যপ্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে। জুনের শেষভাগ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত মহাসাগর থেকে আসা মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এখানে শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত ‘খারিফ’ মৌসুম। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে শুষ্ক পাহাড়, উপত্যকা ও ধূসর মরুভূমি ঘন সবুজের গালিচায় আচ্ছাদিত হয়ে মনোমুগ্ধকর রূপ ধারণ করে। মেঘের লুকোচুরি, কুয়াশার মায়াবী চাদর আর অবিরাম গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি সালালাহকে মায়াবী রূপ দেয়।
সালালাহর এই জাদুকরী রূপান্তর কেবল প্রকৃতির খেলা নয়, এটি এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। খারিফ মৌসুমে সালালাহর পাহাড়, ঝরনা আর শীতল আবহাওয়া উপভোগ করতে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ওমানের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনসহ আশপাশের দেশগুলো থেকে ছুটে আসেন।
অনেক পরিবার পুরো গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে কয়েক সপ্তাহের জন্য এখানে আস্তানা গাড়েন। পর্যটকদের এই বিপুল পদচারণায় ধোফার প্রদেশের হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় বাজারগুলোতে সৃষ্টি হয় কর্মচাঞ্চল্য। আর এই কর্মচাঞ্চল্যের এক বড় অংশ জুড়ে আছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ধোফার অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছেন। খারিফ মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন, পর্যটনসেবা ও খুচরা ব্যবসা খাতে নিয়োজিত বাংলাদেশিদের আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়।
ওমানের পরিচিত কমিউনিটি ব্যক্তি এস এম হারুনুর রশিদ বলেন, “খারিফ শুধু একটি পর্যটন মৌসুম নয়, এটি ধোফারের অর্থনীতির প্রাণভ্রমরা। পর্যটকদের আগমনে যে বিপুল চাহিদার সৃষ্টি হয়, তাতে আমাদের বাংলাদেশি প্রবাসীরা অতিরিক্ত কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ পান, যা দেশে থাকা তাদের পরিবারের জন্য এক বড় সহায় সম্বল।”

নারী উদ্যোক্তা রীমা শীলের মতে, “এই মৌসুমটি নারী উদ্যোক্তাদের নিজেদের উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারণের বড় সুযোগ করে দেয়।” বাংলাদেশি শ্রমিক শহিদুল ইসলাম জানান, সারা বছর তারা এই তিন মাসের অপেক্ষায় থাকেন, কারণ এই সময়ের বাড়তি আয় তাদের সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে সালালাহ কেবল সবুজের সমারোহ আর শীতল আবহাওয়ার জন্যই বিখ্যাত নয়; এর মাটির পরতে পরতে মিশে আছে ৫ হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস। সালালাহ বা ধোফার অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের ‘সুগন্ধি রাজধানী’ বা ‘পারফিউম ক্যাপিটাল অব অ্যারাবিয়া’ হিসেবে পরিচিত। এই খ্যাতির মূলে রয়েছে ‘লোবান’ বা ফ্রাঙ্কিনসেন্স। ‘বোসওয়েলিয়া স্যাক্রা’ নামক গাছ থেকে সংগৃহীত এই রাজকীয় সুগন্ধি এক সময় স্বর্ণের চেয়েও মূল্যবান ছিল।
প্রাচীন সিল্ক রোডের যুগে সালালাহ ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখান থেকে লোবান বোঝাই করা কাফেলাগুলো মরুভূমি পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যেত মিশর, ভারত, আফ্রিকা ও ইউরোপের রাজদরবারে। এমনকি রোমান সাম্রাজ্য ও প্রাচীন গ্রিসের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও সালালাহর লোবান ছিল অপরিহার্য। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া ৫ হাজার বছরের পুরনো পাথর ও মৃৎশিল্পের নিদর্শন প্রমাণ করে যে, লিখিত ইতিহাসের বহু আগে থেকেই এখানে উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।
সালালাহর ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে নাবাতীয় ও রোমানদের বাণিজ্যের স্মৃতি। সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আবির্ভাব এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনে। মন্দিরের স্থলে নির্মিত হয় নয়নাভিরাম মসজিদ, যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আজও সালালাহর প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে দৃশ্যমান। ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের আগমনে উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় দুর্গ নির্মাণ ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপনের মাধ্যমে সালালাহ এক কৌশলগত সামরিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। ভারত মহাসাগরের তীরে অবস্থানের কারণে স্থানীয় নাবিকেরা ওমানি ‘ধো’ (এক ধরনের বিশেষ জাহাজ) নিয়ে ভারত ও চীন পর্যন্ত পাড়ি দিতেন।
আধুনিক ওমানের রূপকার সুলতান কাবুস বিন সাইদের জন্ম ১৯৪০ সালে এই সালালাহ শহরেই। ১৯৭০ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি সালালাহকে আধুনিক ও গতিশীল একটি শহরে রূপান্তর করার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের ‘ধোফার বিদ্রোহ’ ছিল ওমানের ইতিহাসের এক অগ্নিঝরা অধ্যায়, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই সালালাহ। সেই রাজনৈতিক উত্তাল সময় পেরিয়ে আজ সালালাহ শান্তি ও উন্নয়নের এক অনন্য মডেলে পরিণত হয়েছে।

সালালাহর এই গৌরবময় ইতিহাসকে জানতে হলে পর্যটকদের প্রথম গন্তব্য হওয়া উচিত ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘আল বালিদ প্রত্নতাত্ত্বিক পার্ক’ এবং এর ভেতরে অবস্থিত ‘মিউজিয়াম অব দ্য ফ্রাঙ্কিনসেন্স ল্যান্ড’ (সালালাহ মিউজিয়াম)। ২০০৭ সালে সুলতান কাবুস বিন সাইদের পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্বোধন হওয়া এই জাদুঘরটি ওমানের সামুদ্রিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।
জাদুঘরটি দুটি প্রধান গ্যালারিতে বিভক্ত। প্রথমটি হলো ‘হিস্ট্রি হল’, যেখানে ওমানের প্রাচীন মানচিত্র, পাণ্ডুলিপি এবং খনন করে পাওয়া বিরল নিদর্শনগুলো রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো ‘মেরিটাইম হল’, যা ওমানের কিংবদন্তি নৌ-ইতিহাসের প্রতি উৎসর্গ করা। এখানে প্রাচীন ওমানি জাহাজগুলোর বিশাল মডেল এবং আদিম যুগের নেভিগেশনাল যন্ত্রপাতি দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হন। জাদুঘরটি এমনভাবে নির্মিত হয়েছে যা ধোফার অঞ্চলের প্রাচীন দুর্গগুলোর স্থাপত্যশৈলীকে মনে করিয়ে দেয়।
সালালাহকে ঘিরে আছে অসংখ্য ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কিংবদন্তি। শহরের অদূরে জাবাল আল কার পাহাড়ে রয়েছে নবী আইয়ুব (আ.)-এর মাজার বা সমাধি, যা ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম- তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র। এছাড়া জনশ্রুতি আছে যে, রানি শেবা বা রানি বিলকিসের একটি প্রাসাদও এই অঞ্চলেই ছিল। আধুনিক ওমানকে উপস্থাপন করছে ‘পোর্ট অব সালালাহ’, যা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ভারতের বাণিজ্যের অন্যতম প্রবেশপথ হিসেবে বিবেচিত।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সালালাহ মানেই ওয়াদি দরবাত, জাবাল ইত্তিন, মুগসাইল বিচ আর সারি সারি নারিকেল ও কলা বাগান। খারিফ মৌসুমে যখন পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মেঘেরা ভেসে বেড়ায়, তখন মনে হয় যেন আকাশ মাটিতে নেমে এসেছে। সালালাহর পাহাড়ি ঝরনাগুলো থেকে কলকল রবে বয়ে চলা শীতল জলধারা মরুভূমির তপ্ত স্মৃতিকে মুছে দেয়।
প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতা আর সুপ্রাচীন ইতিহাসের আভিজাত্য সালালাহকে দিয়েছে এক অনন্য গভীরতা। খারিফ মৌসুমের সেই কয়েক মাস কেবল ওমানের অর্থনীতিকেই সচল করে না, বরং হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মুখেও হাসি ফোটায়।